আগস্টের রক্তাক্ত ইতিহাস: শোকের মহাসমুদ্র ও অশ্রুঝরা ট্র্যাজেডি
মোঃ আব্দুল্লাহ আল মামুন লাভলু
বাঙালির রাজনৈতিক ইতিহাস ও মানচিত্রে আগস্ট মাস কেবল পঞ্জিকার একটি সাধারণ সময় নয়; এটি রক্ত, ত্যাগ, চরম বিশ্বাসঘাতকতা এবং অপার বেদনার এক অন্তহীন মহাসমুদ্র। যে দূরদর্শী ও কালজয়ী নেতা হাজার বছরের পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে একটি ভূখণ্ডকে স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের মানচিত্রে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, সেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান—বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত কান্ডারি, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি ও আমাদের স্বাধীনতার মহাকাব্যিক রূপকার।
১৯২০ সালের ১৭ই মার্চ টুঙ্গিপাড়ার কাদামাটিতে জন্ম নেওয়া সেই অবোধ শিশু 'খোকা' নিজের প্রজ্ঞা, অনমনীয় নেতৃত্ব, অতুলনীয় ভালোবাসা ও জীবনের সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ দিয়ে রূপান্তরিত হয়েছিলেন সমগ্র বাঙালি জাতির পরম পিতায়। ১৯৪৮ সালের বাংলা ভাষার দাবির প্রথম আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৪৯ সালে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা, ৫২-এর রক্তঝরা রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম, ৫৪-এর যুক্তফ্রন্টের ঐতিহাসিক বিজয়, ৫৬-এর শাসনতন্ত্র আন্দোলন, ৫৮-এর আইয়ুব খানের সামরিক শাসনবিরোধী সংগ্রাম, ৬২-এর শরীফ শিক্ষা কমিশন আন্দোলন, ৬৪-এর 'সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধ কমিটি' গঠন ও স্বাধিকার চেতনা, ৬৬-এর ঐতিহাসিক ৬ দফা (বাঙালির মুক্তির সনদ), ৬৮-এর আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ৬৯-এর উত্তাল গণঅভ্যুত্থান এবং ৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ের ঐতিহাসিক মাইলফলক অতিক্রম করে তিনি বাঙালিকে পৌঁছে দিয়েছিলেন মুক্তির মহান মোহনায়। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে যাঁর মহাকাব্যিক ও বজ্রকণ্ঠ বিশ্বকে কাঁপিয়ে তুলে ঘোষিত হয়েছিল—
"এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম" তাঁরই এক আহ্বানে জীবন বাজি রেখে ১৯৭১-এর রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদের মহান আত্মত্যাগ ও ২ লাখ মা-বোনের অসীম সম্ভ্রমের বিনিময়ে আমরা পেয়েছিলাম আমাদের পরম কাঙ্ক্ষিত স্বাধীন মানচিত্র ও লাল-সবুজের পতাকা।
কিন্তু রক্তে অর্জিত সেই স্বাধীনতার মাত্র চার বছরের মাথায়, যখন একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে পরম মমতায় গড়ে তুলে আত্মনির্ভরশীল 'সোনার বাংলা' বিনির্মাণের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করছিলেন পিতা বঙ্গবন্ধু, ঠিক তখনই ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের কালরাতে নেমে আসে মানবইতিহাসের সবচেয়ে পৈশাচিক, জঘন্য ও কলঙ্কিত কালো আঁধার। ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক বাসভবনে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক দেশদ্রোহী চক্রান্তকারী, খুনি ও ইতিহাসের চরম ধিক্কৃত ঘাতকদের বুলেটের আঘাতে সপরিবারে রক্তে ভেসে যান জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বুকফাটা কান্না ও আরতি সত্ত্বেও সেই কালরাতে নৃশংস ও বিবেকহীন ঘাতকদের বুলেটে রেহাই পাননি বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী মহীয়সী বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, জ্যেষ্ঠ পুত্র বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ কামাল, বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ জামাল, দুই অন্তঃসত্ত্বা বধূ সুলতানা কামাল ও রোজি জামাল, এবং বঙ্গবন্ধুর ছোট ভাই শেখ আবু নাসেরসহ সুজন-পরিজন।
ঘাতকদের বুলেট এমনকি ১০ বছরের নিষ্পাপ শিশু শেখ রাসেলের বুকেও বিদ্ধ হতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেনি। মৃত্যুর আগে আকুল আকুতি জানিয়েছিল ছোট্ট রাসেল—"আমাকে আমার মায়ের কাছে নিয়ে চলো!"—সেই পরম করুণ আর্তনাদকে নির্মমভাবে উপেক্ষা করে ঘাতকেরা শিশুটির বুক ঝাঁজরা করে মায়ের মৃতদেহের ওপরই ফেলে দিয়েছিল। রক্তে ভেসে গিয়েছিল ৩২ নম্বরের প্রতিটি সিঁড়ি ও দেয়াল। সে রাতে খুনিদের মূল উদ্দেশ্য কেবল একজন বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা ছিল না; বরং মূল উদ্দেশ্য ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনা, হাজার বছরের সংস্কৃতি এবং মুক্তিযুদ্ধের মহান মূল আদর্শকে চিরতরে বিলুপ্ত করা। প্রবাসে থাকার কারণে অলৌকিকভাবে সেদিন বেঁচে যান বঙ্গবন্ধুর দুই এতিম কন্যা—শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। কিন্তু ১৫ আগস্টের সেই বিষাদময় গণহত্যা কেবল একটি পরিবারের ওপর আঘাত ছিল না; তা ছিল সমগ্র জাতির হৃদয়ে চিরস্থায়ী এক বিষাক্ত ক্ষত ও চিরন্তন কান্নার সূচনা। এই ঘৃণ্য ও পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের অপরাধীরা ইতিহাসের পাতায় চিরকালের জন্য নিকৃষ্ট, অভিশপ্ত ও ধিক্কৃত হয়ে রইল।
আগস্টের এই নির্মম রক্তপাত কেবল ১৫ আগস্টেই থেমে থাকেনি; ঘাতকের বিষাক্ত নজর বারবার ঘুরেফিরে এসেছে এই আগস্ট মাসেই। কালপঞ্জির পাতা উল্টালে বুক চিরে বেরিয়ে আসে অসীম হাহাকার। ২০০৪ সালের ২১শে আগস্ট—১৫ আগস্টের সেই অসম্পূর্ণ পৈশাচিক মিশন সম্পন্ন করার চক্রান্ত নিয়ে ঘাতকচক্র আবারও রক্তলোলুপ হয়ে ওঠে। ঢাকার বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী জনসভায় বঙ্গবন্ধুর রক্তের উত্তরাধিকার, তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে চালানো হয় পাকিস্তান-নির্মিত আর্জেস গ্রেনেডের নারকীয় বৃষ্টি। একের পর এক বিভীষিকাময় বিস্ফোরণে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় শত শত মানুষের শরীর, রাজপথ প্লাবিত হয় তাজা রক্তে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের নেত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ জন নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষকে অকালে প্রাণ দিতে হয় এবং বাকরুদ্ধ হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয় হাজারও মানুষকে। নেতাকর্মীদের জীবনের বিনিময়ে গড়ে তোলা মানবঢালে শেখ হাসিনা অলৌকিকভাবে বেঁচে গেলেও চিরতরে হারিয়ে ফেলেন শোনার ক্ষমতা এবং বয়ে বেড়াতে থাকেন সেই বিষাদময় স্মৃতি।
এরপরের বছরই, ২০০৫ সালের ১৭ই আগস্ট সারা দেশের ৬৩টি জেলায় একযোগে মাত্র আধ ঘণ্টার ব্যবধানে ৫০০টি স্থানে সিরিজ বোমা হামলা চালিয়ে পুরো দেশের নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব ও কোটি মানুষের শান্তিকে আবার তছনছ করে দেওয়া হয়। এটি ছিল বাংলাদেশকে একটি ব্যর্থ ও চরমপন্থী রাষ্ট্রে পরিণত করার আরেক কুৎসিত আঘাত।
একই রক্তভেজা বিষাদময় আঘাতের ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট দেখা যায় ইতিহাসের আরেক বিভীষিকাময় ও নিগৃহীত অধ্যায়। অস্থিতিশীল পরিবেশ, চরম নৈরাজ্য ও অস্থিরতার মুখে স্থান ত্যাগ করতে বাধ্য হন বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনা। কিন্তু এই ক্ষমতার পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দুষ্কৃতকারীরা যে তাণ্ডব চালায়, তা সমগ্র দেশবাসীকে হতবাক ও অশ্রুসিক্ত করে তোলে। স্বাধীনতার মূল আশ্রয়স্থল ও বাঙালি জাতির পরম আবেগের কেন্দ্রবিন্দু ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক স্মৃতি জাদুঘরটিতে আগুন জ্বালিয়ে ছাই করে দেওয়া হয়। যে বাড়িতে বসে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন, যে বাড়িতে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের মূল নকশা আঁকা হয়েছিল এবং যে বাড়িতে বঙ্গবন্ধুর রক্তের দাগ লেগে ছিল, সেই স্মৃতিচিহ্নকে ভস্মীভূত করার দৃশ্য প্রতিটি দেশপ্রেমিক মানুষের হৃদয়কে চুরমার করে দেয়। শুধু তাই নয়, সারাদেশে স্বাধীনতার স্থপতি জাতির পিতার ভাস্কর্য, ম্যুরাল ও স্মৃতিস্তম্ভ ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে চালানো হয় উন্মত্ত অপপ্রচার ও বিকৃত তাণ্ডব। পাশাপাশি বঙ্গবন্ধুর গড়ে তোলা ঐতিহাসিক দল আওয়ামী লীগের ওপর নেমে আসে অবর্ণনীয় আঘাত। সারাদেশে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যালয়, সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের বাড়িঘর, দোকানপাট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হয় এবং অগণিত নেতাকর্মীকে নির্মমভাবে হত্যা ও নির্যাতন করা হয়। দেশের স্বাধীনতার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও মুক্তিযুদ্ধের স্থপতির স্মৃতি এভাবে পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়ার দৃশ্য পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশকে চরমভাবে লজ্জিত ও কলঙ্কিত করেছে।
১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের সপরিবারে গণহত্যা, ২০০৪-এর ২১শে আগস্টের গ্রেনেড হামলা, ২০০৫-এর ১৭ই আগস্টের দেশব্যাপী সিরিজ বোমা হামলা এবং ২০২৪-এর ৫ই আগস্টের ধানমন্ডির ৩২ নম্বর ছাই করে দেওয়া ও নজিরবিহীন তাণ্ডব—সব মিলিয়ে আগস্ট মাস বাঙালির জন্য পরম শোক, অঝোর কান্না ও এক অনন্ত রক্তক্ষরণের নাম।
তবে ইতিহাস সাক্ষী, ঘাতকের বুলেটের আঘাত কিংবা উগ্র উন্মাদনার আগুনে ইট-পাথরের ভবন পুড়িয়ে ছাই করা যায়, কিন্তু কোটি বাঙালির হৃদয় থেকে জাতির পিতাকে মুছে ফেলা অসম্ভব। বিশ্ববাসীকে স্পষ্ট বুঝে নিতে হবে-বঙ্গবন্ধু মানেই বাংলাদেশ, আর বাংলাদেশ মানেই বঙ্গবন্ধু! পিতা মুজিবের রক্তের ঋণ শোধ করার শক্তি কোনো ষড়যন্ত্রের নেই; তাঁরই আদর্শের ওপর দাঁড়িয়ে আছে আমাদের প্রিয় জন্মভূমির প্রতিটি ইঞ্চি মাটি। আগস্টের এই শোকের মহাসমুদ্র থেকে জন্ম নেওয়া রক্তশপথ ও গণজাগরণের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ যুগ যুগ ধরে অন্যায়ের বিরুদ্ধে বাঙালিকে অবিচল রাখবে। রক্তে অর্জিত স্বাধীন মানচিত্র, অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও জাতির পিতার রেখে যাওয়া এই বাংলাদেশ চিরকাল মাথা উঁচু করে বিজয়ের গৌরবে বিশ্বমঞ্চে স্বমহিমায় ভাস্বর থাকবে!
লেখক : একজন কবি।
