স্টাফ রিপোর্টার : জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার বিচার আগামী এক বছরের মধ্যে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে কাজ করছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন। বিচার প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রাখা হবে এবং কোনোভাবেই তাড়াহুড়ো করে বিচার করা হবে না বলে জানিয়েছেন ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম।

মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) রাজধানীর বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) আয়োজিত ‘জুলাই-আগস্টে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার: রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা ও করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ২০২৪ সালের আগস্টে ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠনের পর এ পর্যন্ত ছয়টি মামলার বিচার সম্পন্ন হয়েছে।

বিচার আরও দ্রুত শেষ করা সম্ভব হলেও তাতে বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। তাই আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করেই বিচার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

আমিনুল ইসলাম জানান, বর্তমানে ট্রাইব্যুনালে জুলাই গণঅভ্যুত্থান সংশ্লিষ্ট ২৬-২৭টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। পাশাপাশি সারা দেশে জুলাই সংশ্লিষ্ট ১০৯টি ঘটনার তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে।
তদন্ত শেষ হওয়া ঘটনাগুলো ধাপে ধাপে ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন করা হচ্ছে।

বাছাই করে আসামি করা হচ্ছে– এমন অভিযোগ নাকচ করে তিনি বলেন, তদন্তকারী কর্মকর্তারা স্বাধীনভাবে তদন্ত পরিচালনা করেন এবং প্রসিকিউশন তদন্তে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করে না। কোনো তদন্তে ঘাটতি বা অসংগতি পাওয়া গেলে তা পুনঃতদন্তের জন্য ফেরত পাঠানো হয়।

একটি ‘সভ্য রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার জন্য মানবাধিকারের চর্চাকে অপরিহার্য বলে উল্লেখ করেন চিফ প্রসিকিউটর। তিনি বলেন, মানবাধিকার লঙ্ঘন কেবল জুলাই মাসেই হয়নি, এটি স্বাধীনতার পর থেকেই বিভিন্ন রূপে (গুম, ক্রসফায়ার) চলে আসছে। একটি রাষ্ট্র ফ্যাসিস্ট হয়ে ওঠার পেছনে কেবল সরকার প্রধান নয়, বরং শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী ও সুশীল সমাজের এক অংশেরও দায় থাকে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচার প্রক্রিয়ায় তিনি ‘সুপিরিয়র কমান্ড রেসপন্সিবিলিটি’ বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দায়ের বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন, যেখানে নিষ্ক্রিয় থাকাও অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে। তিনি স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে মানবাধিকার কমিশনকে তদন্ত প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করার প্রস্তাব দেন।

এইচআরএসএস আয়োজিত এই গোলটেবিল আলোচনায় জুলাই আন্দোলনে নিহত ও আহতদের পরিবারের সদস্য, মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী, শিক্ষক, গবেষক ও সাংবাদিকরা অংশ নেন।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম। পরে জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং নিহত ও আহতদের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে এইচআরএসএসের গবেষণা ও কার্যক্রম উপস্থাপন করেন সংস্থাটির প্রোগ্রাম অফিসার সাইফুল ইসলাম।

আলোচনায় জুলাই আন্দোলনে দুই চোখের দৃষ্টিশক্তি চিরতরে হারানো সাব্বির আহমেদ এবং শহীদ শাহরিয়ার খান আনাসের বাবা সাহরিয়ার খান পলাশ ও মা সানজিদা খান দীপ্তি বক্তব্য দেন। তারা আন্দোলনের সময়ের অভিজ্ঞতা, স্বজন হারানোর বেদনা, পরবর্তী সময়ে তাদের নানা ধরনের সংকট এবং ন্যায়বিচারের প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেন।

‘বিচার, রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা, তদন্ত ও জবাবদিহিতা: করণীয় কী?’ শীর্ষক মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন সপ্রাণ-এর রিসার্চ ডিরেক্টর জারিফ রহমান, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরোসার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. রুহুল কুদ্দুস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তানজিমুদ্দিন খান, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সিনিয়র সাংবাদিক আবু সাঈদ খান, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ও ব্লাস্টের অনারারি এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর সারা হোসেন এবং মানবাধিকারকর্মী, গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশন ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য নূর খান লিটন।

আলোচনায় বক্তারা বলেন, জুলাই-আগস্টে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার কোনোভাবেই রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা পক্ষপাতের হাতিয়ার হওয়া উচিত নয়। বরং স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ, প্রমাণনির্ভর ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডসম্মত তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে।

একইসঙ্গে ঘটনাগুলোর পূর্ণাঙ্গ তথ্য ও প্রমাণ সংরক্ষণ, প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, দায়ী ব্যক্তিদের যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিচারের আওতায় আনা এবং বিচারপ্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

অনুষ্ঠানে জুলাই-আগস্টের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার, ভুক্তভোগীদের প্রতিকার এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে করণীয় বিষয়ে এইচআরএসএস ১০ দফা সুপারিশ উপস্থাপন করে। তার মধ্যে রয়েছে– ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের জন্য কার্যকর প্রতিকার, ক্ষতিপূরণ ও প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা করা জরুরি। একইসঙ্গে ভবিষ্যতে যাতে কোনো রাষ্ট্রীয় বা অরাষ্ট্রীয় পক্ষ মানবাধিকার লঙ্ঘন করে দায়মুক্তি না পায়, সেজন্য কার্যকর জবাবদিহিতার কাঠামো শক্তিশালী করতে হবে।

(ওএস/এএস/আগস্ট ০৫, ২০২৬)