এবার নারী কেলেঙ্কারি, তোপের মুখে ফিফা সভাপতি
স্পোর্টস ডেস্ক : ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর সময়টা একেবারেই ভালো যাচ্ছে না। ৪.২ বিলিয়ন ডলারের এক বিতর্কিত বিনিয়োগ পরিকল্পনা নিয়ে গত এক সপ্তাহ ধরে এমনিতেই প্রবল সমালোচনার মুখে ছিলেন তিনি।
এবার তার সঙ্গে যুক্ত হলো উয়েফায় দায়িত্ব পালনকালীন এক নারী সহকর্মীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক এবং তাকে মোটা অঙ্কের অর্থ দিয়ে বিদায় করার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ। সব মিলিয়ে ফিফার এই শীর্ষ কর্তার পদত্যাগের দাবি এখন বেশ জোরালো হয়ে উঠেছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম 'দ্য টেলিগ্রাফ' এর এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, উয়েফার সাধারণ সম্পাদক থাকার সময় এক জুনিয়র নারী সহকর্মীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন ইনফান্তিনো। অভিযোগ রয়েছে, ইনফান্তিনো প্রভাব খাটিয়ে ওই কর্মীকে ম্যানেজমেন্ট পদে পদোন্নতি দিয়েছিলেন এবং তার বেতন ৩০ শতাংশ বাড়িয়ে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার সুইস ফ্রাঁ (২ লাখ ৮০ হাজার ডলারের বেশি) করেছিলেন।
পরবর্তীতে বিষয়টি জানাজানি হলে ওই নারীকে ছয় অঙ্কের বড় অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দিয়ে বিদায় করা হয়। এমনকি তার এমবিএ পড়ার খরচও বহন করেছিল উয়েফা।
অভিযোগ আছে, ওই নারী প্রতিষ্ঠান ছাড়ার পর ইনফান্তিনো তার প্রভাব ব্যবহার করে তাকে অন্য জায়গায় লোভনীয় চাকরির ব্যবস্থাও করে দিয়েছিলেন।
সাবেক সহকর্মীদের বরাত দিয়ে টেলিগ্রাফ জানিয়েছে, এই ঘটনা ইনফান্তিনোর ক্যারিয়ার প্রায় ধ্বংস করে দিচ্ছিল। তৎকালীন উয়েফা সভাপতি মিশেল প্লাতিনিকে অনেকেই ইনফান্তিনোকে বরখাস্ত করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। এক সূত্র জানায়, প্লাতিনি তখন ইনফান্তিনোকে ডেকে সরাসরি বলেছিলেন, 'সিদ্ধান্ত নাও, তুমি থাকবে, নাকি সে?' ইনফান্তিনো জবাবে বলেছিলেন, 'সে চলে যাবে', এবং এরপর ওই নারী উয়েফা ছাড়েন।
এদিকে, উয়েফা এক বিবৃতিতে ওই নারীকে অর্থ দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছে। তারা জানিয়েছে, তৎকালীন নিয়ম মেনেই ওই কর্মীকে বিদায়কালীন অর্থ এবং স্থানীয় একটি বিজনেস স্কুলে এমবিএ কোর্সের ফি দেওয়া হয়েছিল।
তবে ফিফা এসব অভিযোগ পুরোপুরি ভিত্তিহীন ও মানহানিকর বলে উড়িয়ে দিয়েছে ফিফা। ফিফার এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, 'সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো এই অভিযোগগুলো দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন। উয়েফা বা ফিফায় কখনোই তার আচরণ নিয়ে কোনো কর্মী অভিযোগ করেননি, কারণ এমন কোনো ঘটনাই ঘটেনি।'
বয়কটের হুমকি ও পদত্যাগের চাপ
সম্প্রতি ‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ নামে একটি বাণিজ্যিক সাবসিডিয়ারি গঠনের মাধ্যমে ৪.২ বিলিয়ন ডলারের তহবিল সংগ্রহের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছিল ফিফা। কিন্তু ইউরোপিয়ান ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফার তীব্র বিরোধিতার মুখে সেই পরিকল্পনা স্থগিত করতে বাধ্য হন ইনফান্তিনো।
উয়েফা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, ইনফান্তিনোর ওপর তাদের আর কোনো 'আস্থা' নেই। এমনকি পরিস্থিতি না বদলালে তারা বিশ্বকাপ বয়কটের মতো কঠোর পদক্ষেপে যাওয়ারও হুমকি দিয়েছে। উয়েফা বয়কট করলে আগামী মাসে অনুষ্ঠিতব্য ফিফা অনূর্ধ্ব-২০ নারী বিশ্বকাপ এবং আগামী বছর ব্রাজিলে অনুষ্ঠেয় নারী বিশ্বকাপ বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বে।
ইংল্যান্ডের তারকা ফুটবলার লুসি ব্রোঞ্জ উয়েফার এই বয়কটের হুমকিকে সমর্থন জানিয়ে বলেছেন, ফুটবলের বৃহত্তর স্বার্থে প্রয়োজনে বয়কটের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। এটা শুধু আজকের জন্য নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য।
এর মধ্যেই নরওয়ে ফুটবল ফেডারেশনের (এনএফএফ) সভাপতি লিজ ক্লাভেনেস অবিলম্বে ইনফান্তিনোর পদত্যাগ দাবি করেছেন। অনেকেই মনে করছেন, ইনফান্তিনো সরে দাঁড়ালে বিশ্ব ফুটবলের প্রথম নারী প্রধান হিসেবে ক্লাভেনেস দায়িত্ব নিতে পারেন। তবে তিনি জানিয়েছেন, ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে নয়, ফুটবলের স্বার্থেই তিনি এই দাবি তুলছেন।
এত সমালোচনার পরও আগামী মার্চে মরক্কোর রাবাতে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে চতুর্থবারের মতো ফিফা সভাপতি হওয়ার দৌড়ে এখন পর্যন্ত একমাত্র প্রার্থী ৫৬ বছর বয়সি ইনফান্তিনো।
নিজের ক্ষমতা ধরে রাখতে তিনি এখন মিত্রদের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছেন। গত এক সপ্তাহ ধরে তিনি মরক্কোয় অবস্থান করছেন। অভিযোগ রয়েছে, ২০৩০ বিশ্বকাপের অন্যতম আয়োজক মরক্কোর সমর্থন পেতে তিনি কাসাব্লাঙ্কায় নির্মিতব্য ১ লাখ ১৫ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার নতুন স্টেডিয়ামে ফাইনাল আয়োজনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
উয়েফা, কনকাকাফ এবং এএফসি বিনিয়োগ পরিকল্পনা নিয়ে ইনফান্তিনোর সমালোচনা করলেও, কনফেডারেশন অব আফ্রিকান ফুটবল এবং মেক্সিকান ফুটবল ফেডারেশন তার প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেছে। দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রীড়ামন্ত্রী গ্যাটন ম্যাকেঞ্জি তো ইনফান্তিনোর এই সমালোচনাকে প্রকাশ্য হয়রানি বলে আখ্যা দিয়ে আফ্রিকান ফুটবলকে এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
চারদিক থেকে ধেয়ে আসা এই চাপ আর বিতর্কের ঝড় সামলে ইনফান্তিনো শেষ পর্যন্ত ফিফার শীর্ষ পদ ধরে রাখতে পারেন কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
(ওএস/এএস/আগস্ট ০৮, ২০২৬)
