মো. ইমদাদুল হক সোহাগ


বঙ্গোপসাগরের সম্পদের আরেকটি দীর্ঘ তালিকা তৈরি করে বাংলাদেশের সুনীল অর্থনীতি গড়ে ওঠে না। আগে চাই কঠিন প্রশ্নগুলোর উত্তর—কোন সম্পদ কে ব্যবহার করবে, কোথায় করবে, কী শর্তে এবং প্রকৃতির কতটা মূল্য দিয়ে।

মৎস্য, নৌপরিবহন, জ্বালানি, পর্যটন, সংরক্ষণ, গবেষণা ও নিরাপত্তা এখন পৃথক প্রতিষ্ঠানের অধীনে। অথচ তাদের সিদ্ধান্তের পরিণতি গিয়ে মেলে একই সমুদ্রে। প্রকল্প যাচাই হয় আলাদাভাবে। অনুমোদন ও অর্থায়নও চলে বিচ্ছিন্ন পথে। ফল না এলে দায় কার, সেটিই অস্পষ্ট হয়ে পড়ে।

এই ঘাটতি এখন রাষ্ট্রের আলোচনায়। ২০২৬ সালের ১৫ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংসদে জানান, সরকার ২০২৬–২৭ অর্থবছরে সুনীল অর্থনীতির জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গঠনের বিষয় সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছে। জুনে উপস্থাপিত বাজেট বক্তৃতায় গবেষণা ও উদ্ভাবনে ১০০ কোটি এবং সুনীল অর্থনীতির উন্নয়নে আরও ১০০ কোটি টাকা রাখার কথা বলা হয়। সুযোগটি বাস্তব। আরেকটি প্রশাসনিক স্তরে অর্থ ঢেলে দেওয়ার ঝুঁকিও ততটাই বাস্তব।

বাংলাদেশের সামনে আগের অভিজ্ঞতা রয়েছে। সরকার ২০১৭ সালে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অধীনে ব্লু ইকোনমি সেল গঠন করেছিল। বিশ্বব্যাংকের স্বাধীন মূল্যায়ন বিভাগের ২০২৪ সালের পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১৬ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাংক ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তায় এগোনো বৃহত্তর সুনীল অর্থনীতি প্রক্রিয়া পরে থমকে যায়। খাতগুলোর মধ্যে সমন্বয় সীমিত ছিল। সামুদ্রিক স্থানের ব্যবহারও পরিকল্পনার কেন্দ্রে আসেনি। নেতৃত্ব কার হাতে থাকবে, সে বিষয়েও ঐকমত্য তৈরি হয়নি। শিক্ষা স্পষ্ট—সিদ্ধান্তের ক্ষমতা, অভিন্ন তথ্যভিত্তি ও বাজেটের সঙ্গে সংযোগ না থাকলে সমন্বয় টেকে না।

আইন প্রণয়নের শুরু সাংগঠনিক ছক দিয়ে নয়, পূর্ণাঙ্গ হিসাব দিয়ে। চূড়ান্ত কাঠামোর আগে সরকারের প্রথম কাজ বিদ্যমান দায়িত্ব, কর্মসূচি ও সরকারি ব্যয়ের মানচিত্র প্রকাশ। তাতে ব্লু ইকোনমি সেল, মহেশখালী সমন্বিত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, জাতীয় মেরিটাইম কাউন্সিল, খাতভিত্তিক মন্ত্রণালয়, বন্দর কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, পরিবেশ নিয়ন্ত্রক ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থার ভূমিকা স্পষ্ট থাকবে।

১৬ জুলাই সংসদে পাস হওয়া ইনভেস্ট বাংলাদেশ বিলও এই হিসাবের বাইরে থাকতে পারে না। বিলটি কার্যকর হলে বিডা, বেজা ও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব কর্তৃপক্ষের বিনিয়োগ-সংশ্লিষ্ট দায়িত্ব একটি কাঠামোয় আসবে। ফলে নতুন সুনীল অর্থনীতি কর্তৃপক্ষকে আলাদা বিনিয়োগ-প্রচারক বানালে শুরুতেই আরেকটি পুনরাবৃত্তি তৈরি হবে।

প্রতিটি কাজের ক্ষেত্রে চারটির একটি সিদ্ধান্ত জরুরি—দায়িত্বটি আগের প্রতিষ্ঠানে থাকবে, হস্তান্তর হবে, একীভূত হবে, নাকি বন্ধ হবে। একই কাজের অনুমোদন বা একই গবেষণা একাধিক প্রতিষ্ঠান করতে পারলে আইনে প্রধান সংস্থার নাম স্পষ্ট করতে হবে। না হলে পুরোনো বিভ্রান্তি শুধু নতুন ঠিকানা পাবে।

খাতভিত্তিক মন্ত্রণালয়গুলো নিজ নিজ আইনি, নিয়ন্ত্রক ও পরিচালনাগত দায়িত্ব ধরে রাখবে। বৈদেশিক নীতি ও আঞ্চলিক মান নির্ধারণের কাজ চলবে বিদ্যমান কূটনৈতিক ও আন্তমন্ত্রণালয় ব্যবস্থায়। ৪ আগস্ট প্রথম বৈঠক করা জাতীয় মেরিটাইম কাউন্সিলের পরিসরেই জাতীয় নীতির বিস্তৃত দিকনির্দেশনা রাখা উচিত। আর নজরদারি, আইন প্রয়োগে সহায়তা ও জরুরি সাড়া এই ধারাবাহিকের তৃতীয় পর্বে প্রস্তাবিত ন্যাশনাল মেরিটাইম কো-অর্ডিনেশন সেন্টারের বিষয়। সুনীল অর্থনীতি কর্তৃপক্ষ এসবের কোনোটি দখল করবে না।

তার পরিসর দেশের সমুদ্রভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা। সামুদ্রিক স্থানের প্রতিযোগী দাবি মেলানো, সরকারি ব্যয় সামঞ্জস্য করা, বড় প্রকল্পের ক্রম নির্ধারণ, পরিবেশগত সীমা প্রয়োগ, আন্তসংস্থা বিরোধ নিষ্পত্তি এবং ফল প্রকাশ—এই তার মূল দায়িত্ব। আইনে কাজের পুনরাবৃত্তি নিষিদ্ধ থাকবে। যৌথ সিদ্ধান্তের সময়সীমা নির্ধারিত থাকবে। অমীমাংসিত বিরোধ মন্ত্রিসভায় পাঠানোর পথও চাই। সংসদ স্পষ্টভাবে হস্তান্তর না করলে কর্তৃপক্ষ কোনো প্রতিষ্ঠানের আইনি দায়িত্ব নিতে পারবে না।

প্রথম বাস্তব পরীক্ষা সামুদ্রিক স্থানিক পরিকল্পনা। বাংলাদেশ এ কাজ শুরু করেছে। এখন পরিকল্পনাটি শেষ করা, আইনি ভিত্তি দেওয়া এবং নির্দিষ্ট সময় পরপর পর্যালোচনা করা দরকার। মাছ ধরার ক্ষেত্র, নৌপথ, সমুদ্রের জ্বালানি ব্লক, সাবমেরিন কেবল, পর্যটন এলাকা, সংরক্ষিত অঞ্চল ও নিরাপত্তা স্থাপনা একই সীমিত পরিসরের জন্য প্রতিযোগিতা করছে। মানচিত্রের উদ্দেশ্য বঙ্গোপসাগরকে স্থির রঙে ভাগ করা নয়। অনুমোদন, অর্থায়ন ও নির্মাণের আগে বিরোধ এবং পরিবেশগত মূল্য দৃশ্যমান করাই এর কাজ।

পরিকল্পনার পাশে চাই একটি সমুদ্র-হিসাব। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে জাতীয় সমুদ্র হিসাব প্রকাশের নেতৃত্ব দিতে পারে। উৎপাদন, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও পরিবারের আয়ের পাশে সেখানে ধরা পড়বে মাছের মজুত, আবাসস্থল এবং অন্য প্রাকৃতিক সম্পদের পরিবর্তন। রাজস্ব গুনে প্রাকৃতিক ক্ষয় বাদ দিলে সম্পদ বিক্রিকে প্রবৃদ্ধি বলে ভুল করা হয়।

বাংলাদেশের আরেকটি স্বতন্ত্র তথ্যভান্ডার দরকার নেই। প্রয়োজন অভিন্ন সংজ্ঞা, ব্যবহারযোগ্য বিন্যাস ও নিয়ন্ত্রিত প্রবেশবিধি। পরিসংখ্যান ব্যুরো হিসাবের নেতৃত্ব দেবে। খাতভিত্তিক সংস্থা নিজের তথ্যের হেফাজতকারী। নিরাপত্তাসংক্রান্ত গোপন তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থার ভেতরেই থাকবে। তবে গোপনীয় নয়—এমন বৈজ্ঞানিক, পরিবেশগত ও বাণিজ্যিক তথ্য খুঁজে পাওয়া এবং পুনর্ব্যবহার করা সহজ হতে হবে।

ভালো তথ্য বিনিয়োগকেও শৃঙ্খলায় আনে। গভীর সমুদ্রে মাছ ধরা, সামুদ্রিক চাষ, মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, সামুদ্রিক শৈবাল, পর্যটন, জাহাজ নির্মাণ, সমুদ্রের নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও জীবপ্রযুক্তি—সম্ভাবনার তালিকা দীর্ঘ। কিন্তু তালিকাই বিনিয়োগ কর্মসূচি নয়।

প্রকল্প প্রস্তুতির জন্য ইনভেস্ট বাংলাদেশের ভেতরে বা তার সঙ্গে আইনগতভাবে যুক্ত একটি বিশেষ সুনীল অর্থনীতি উইন্ডো থাকা উচিত। প্রস্তাবিত কর্তৃপক্ষ স্থানিক, পরিবেশগত ও আন্তখাত মূল্যায়ন দেবে। আর বিনিয়োগ-সেবা, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব ও প্রকল্প প্রস্তুতির কাজ চলবে বিদ্যমান বিনিয়োগ কাঠামোয়। কারিগরি সম্ভাব্যতা, বাণিজ্যিক কার্যকারিতা, রাজস্বঝুঁকি, পরিবেশ ও সমাজের ওপর প্রভাব এবং নিরাপত্তার প্রশ্ন যাচাইয়ের আগে কোনো প্রকল্প সরকারি অর্থ, করসুবিধা বা সার্বভৌম সহায়তা পাবে না। দেশি ও বিদেশি প্রকল্পের জন্য ক্রয়স্বচ্ছতা, তথ্যের মালিকানা এবং দেশের ভেতরে মূল্য সংযোজনের মান একই হবে।

বাজেটে উল্লিখিত ২০০ কোটি টাকা এই নীতির প্রথম পরীক্ষা। অর্থটি আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠান, বিচ্ছিন্ন গবেষণা কিংবা প্রদর্শনী প্রকল্পে শেষ হতে পারে না। উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা, স্বাধীন কারিগরি মূল্যায়ন, বাছাইয়ের মানদণ্ড, স্বার্থের সংঘাত, কাজের ধাপ ও চূড়ান্ত ফল প্রকাশ জরুরি। সরকারি অর্থে করা প্রতিটি গবেষণার শেষে চাই যাচাইযোগ্য জনসম্পদ—তথ্যসেট, পরীক্ষিত প্রযুক্তি, নিয়ন্ত্রক সমাধান অথবা সিদ্ধান্ত নেওয়ার উপযোগী প্রকল্প।

শুধু রাজস্ব দিয়ে সাফল্য মাপা যাবে না। উপকূলের মানুষ, বিশেষত ক্ষুদ্র মৎস্যজীবীরা, সিদ্ধান্তের আগেই প্রক্রিয়ার অংশ হবেন। তাঁরা অর্থনৈতিক অংশীজন, অধিকারধারী এবং প্রজন্মের অভিজ্ঞতায় গড়া বাস্তব জ্ঞানের ধারক। মাছ ধরার ক্ষেত্র ও অবতরণস্থলে প্রবেশাধিকার রক্ষা, লাভের ন্যায্য বণ্টন এবং ক্ষতি এড়ানো না গেলে ক্ষতিপূরণ ও জীবিকা পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে। উপকূলের মানুষ ব্যয় বহন করবেন আর দূরের বিনিয়োগকারী মুনাফা নেবেন—এমন নীতি প্রথম রপ্তানি হিসাবের আগেই ব্যর্থ।

প্রথম ১৮০ দিনের মধ্যে চারটি কাজ শেষ করা জরুরি। চলমান সরকারি প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ তালিকা; সমুদ্র অর্থনীতি ও প্রতিবেশব্যবস্থার ভিত্তিমূল্যায়ন; অভিন্ন তথ্যবিধি; এবং স্থানিক পরিকল্পনা, সমুদ্র হিসাব ও বিনিয়োগ প্রস্তুতির তারিখভিত্তিক কর্মসূচি। পরবর্তী সাফল্যের দাবি যাচাইয়ের ন্যূনতম ভিত্তি এগুলোই।

জবাবদিহির শর্ত প্রকাশ। কর্তৃপক্ষের বার্ষিক প্রতিবেদন সংসদের সামনে তুলে ধরবে কত বিনিয়োগ এসেছে, যৌথ সিদ্ধান্তে কত সময় লেগেছে, কত কর্মসংস্থান ও রপ্তানি আয় তৈরি হয়েছে, কোন গবেষণা কাজে লেগেছে, প্রতিবেশের অবস্থা কী এবং উপকূলীয় মানুষের কাছে সুবিধার কতটা পৌঁছেছে। বাংলাদেশের মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক আর্থিক নিরীক্ষা করবেন। পাঁচ বছর পর চাই স্বাধীন মূল্যায়ন। বিভাজন থেকে গেলে প্রতিষ্ঠানকে অভ্যাসের জোরে বাঁচিয়ে না রেখে আইন সংশোধনই সঠিক পথ।

কর্তৃপক্ষ কত বড়, তা দিয়ে তার মূল্য বোঝা যাবে না। আসল প্রশ্ন—সে বিরোধ মেটাতে পেরেছে কি না, বিলম্ব কমিয়েছে কি না, দুর্বল প্রকল্প ঠেকিয়েছে কি না এবং পরিবেশগত ক্ষতি রোধ করেছে কি না। ক্ষমতা জমা নয়; বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোকে একসঙ্গে ফল দিতে বাধ্য করাই তার সাফল্য।

একটি কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোকে একই পথে আনতে পারে। কিন্তু প্রয়োজনীয় জ্ঞান, দক্ষতা ও পেশাগত সংস্কৃতি তৈরি করতে পারে না। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার সুযোগকে সংগঠিত করে; জাতীয় সক্ষমতাই নির্ধারণ করে সেই ব্যবস্থা টিকবে কি না।

লেখক: ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক ও নীতি গবেষক।