রঘুনাথ খাঁ, সাতক্ষীরা : একটি নারী ঘটিত ভিডিও ফুটেজ ফেইসবুকে ছড়িয়ে দেওয়াকে কেন্দ্র করে সাতক্ষীরা জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহবায়ক মঞ্জুরুল আলম বাপ্পী সমর্থক ও ইউপি সদস্য শাহীনুর রহমান লাল্টু সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে উভয়পক্ষের কমপক্ষে ১৫জন আহত হয়েছে। গত শনিবার রাত ৯টার দিকে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ঘোনা গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। আহতদের কয়েকজনকে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। পুলিশ ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে।

এদিকে ছাত্রদল নেতা মঞ্জুরুল আলম বাপ্পী আহত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর শনিবার দিবাগত রাত সোয়া একটার দিকে ছাত্রদলের নেতা কর্মীরা সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শাহীনুর রহমান ওরফে লাল্টু মেম্বর ও সামছুর সরদারের উপর হামলা চালানোর চেষ্টা করলে তারা পিছনের দরজা দিয়ে ওয়ার্ডের বাইরে এলে মসজিদের সামনে থেকে পুলিশ তাদেরকে ধরে নিয়ে তাদের বেডে ঢুকিয়ে দেয়। এ সময় ছাত্রদল ও বিএনপির সহযোগী সংগঠণের কয়েকজন খুলনা রোডের মোড়ে ১১ মিনিটের মত সড়ক অবরোধ করে লাল্টু মেম্বর ও জাহাঙ্গীর আলমকে গ্রেপ্তারের দাবি জানায়। পুলিশ তাদেরকে আশ^স্ত করলে অবরোধ প্রত্যাহার করা হয়। রাত দুটোর দিকে পুলিশ হাসপাতাল থেকে লাল্টু মেম্বর ও জাহাঙ্গীর আলমকে গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে যায়। পরে ছাত্রদল ও বিএনপির অঙ্গ সংগঠণের নেতৃবৃন্দ থানার সামনে পথসভা করে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তারের দাবি জানায়।

ঘোনা ইউনিয়নের ৪ নং ওয়ার্ডের সদস্য শাহীনুর রহমান লাল্টু জানান, প্রায় এক বছরেরও বেশি সময় আগে তার মেয়েকে কলেজে ও প্রাইভেট পড়তে যাওয়া- আসার পথে বিরক্ত করতো একই গ্রামের রুহুল আমিনের ছেলে ইমন। এনিয়ে রুহুল আমিন ও তার পরিবারের সাথে তার সম্পর্কের অবনতি হয়। এ ছাড়া তার ভাই লাভলু সরদারের সঙ্গে একই গ্রামের ইদ্রিস আলীর ছোট স্ত্রী সোয়াদা খাতুনের অনৈতিক সম্পর্ক আছে মর্মে প্রচার রয়েছে। গত বৃহষ্পতিবার রাত ১১টার দিকে ইদ্রিম আলী ফোন করে তাকে জানায় যে, তার ভাই লাভলু তার বাড়ির উঠানে টর্চ লাইট মেরেছে বলে ছোট স্ত্রী সোয়াদা তাকে জানিয়েছে। এ নিয়ে গত শনিবার দুপুরে সোয়াদা খাতুন ও চাচা লাভলুকে নিয়ে ইমন ও রাশেদ এর ফেইসবুকে ছড়ানো একটি ভিডিও ভাইরাল হওয়াকে কেন্দ্র করে মোবাইল ফোনে ইমনের সঙ্গে কথাকাটাকাটি হয় তার ছেলে নাজমুলের। ইমন বিএনপি করে বলে তাকে হুমকি দিলে ফল ভাল হবে না মর্মে নাজমুলকে জানিয়ে দেয়। এতে নাজমুল ক্ষিপ্ত হয়ে ইমনকে যথেচ্চোভাবে গালিগালাজ করে। বিষয়টি ইমন জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহবায়ক মঞ্জুরুল আলম বাপ্পিসহ কয়েকজনকে জানায়। পরবর্তীতে তিনি জানতে পারেন যে বাপ্পি ও তার লোকজন নাজমুলকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাবে।

শাহীনুর রহমান লাল্টু আরো জানান, শনিবার রাত ৯টার দিকে তিনি ঘোনা শ্রীডাঙ্গার মোড়ে বসে ছিলেন। এ সময় তিনি খবর পান যে, মোবারকের মোড় থেকে মঞ্জুরুল আলম বাপ্পির নেতৃত্বে ৫০/৬০ জন হাতে লাহার রড, হাতুড়ি ও লাঠি নিয়ে তাদের বাড়ির দিকে যাচ্ছে। তার ছেলে নাজমুলকে তুলে আনার হুমকি দিয়েছে তারা। রাত সাড়ে ৯টার দিকে তারা শীডাঙ্গার মোড়ে পৌঁছালে তিনি বাপ্পির সাথে কথা বলতে জান। এতে বাপ্পি ও তার সহযোগিরা তাকে লোহার রড ও হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে জখম করে। এ সময় খবর পেয়ে ছুঁটে আসা তার ছেলে নাজমুল,জাহাঙ্গীর আলম, সামছুর রহমান, আশরাফুল আলম, আব্দুর রকিব ঝণ্টু, খালিদ হোসেন, তার বড় ভাই ৪ নং ওয়ার্ড জামায়াতের সভাপতি জহিরুল হামলাকারিদের থামানোর চেষ্টা করলে তাদেরকে পিটিয়ে জখম করা হয়। পরবর্তীকে আব্দুর রকিব ঝণ্টুকে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও তাকে ও জাহাঙ্গীরকে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে খবর পেয়ে শহরের ছাত্রদল, তাঁতীদল ও বিএনপির অঙ্গ সংগঠণের লোকজন সদর হাসপাতালের ১ নং ওয়ার্ডে যেয়ে তাকে ও জাহাঙ্গীরকে বেড থেকে তুলে আনার চেষ্টা করলে তারা কৌশলে থানায় খবর দিয়ে পিছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে মসজিদের সামনে আসেন।

পুলিশ তাদেরকে আবারো হাসপাতালের ওয়ার্ডে ঢুকিয়ে দিলে বিএনপি তার অঙ্গ সংগঠেণের লোকজন তাদেরকে গ্রেপ্তারের দাবিতে খুলনা রোডের মোড়ে অবস্থান নিয়ে যান চলাচল বন্ধ করে দেয়। পরে পুলিশ তাদের দুইজনকে হাসপাতালের বেড থেকে গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে যায়। রাত আড়াইটার দিকে বিএনপির অঙ্গ সংগঠণের নেতা কর্মীরা থানার সামনে এক প্রতিবাদ সমাবেশ করে। সমাবেশ থেকে তাদেরকে আওয়ামী লীগের লোক হিসেবে মন্তব্য করে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তারের দাবি করে। বক্তব্য দেন জেলা ছাত্রদলের সহসভাপতি আসিফ ইকবাল, রিজভি আহম্মেদ, সাংগঠণিক সম্পাদক শাহীন ইসলাম, পৌর বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহবায়ক এম্রে রাজ্জাক, মৎস্যজীবী দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহবায়ক সাইফুল আলম. তাঁতিদলের সাংগঠণিক সম্পাদক সাহেব আলী।

তবে ঘোনা গ্রামের কয়েকজন জানান, সম্প্রতি ঘোনা ঘোষপাড়ায় নামযজ্ঞ থেকে বাড়ি ফেরার সময় পরিতোষের বাড়ির সামনে ঘোনা ইউপি’র সাবেক চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান মুসাকে চড় থাপ্পড় মারে মঞ্জুরুল আলম বাপ্পি। এতে স্থানীয়রা ক্ষুব্ধ ছিল। সেকারণে সূযোগ বুঝে বাপ্পির ও তার সহযোগীরা লাল্টু মেম্বরদেও মারপিট করে চলে যাওয়ার সময় গ্রামবাসির মারপিটের শিকার হয়েছে। যে কারণে বাপ্পির দায়েরকৃত মামলায় ফজলুর রহমান মুসা ঘটনাস্থলে না থাকার পরও তাকে আসামী করা হয়েছে।
এ ব্যাপারে জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহবায়ক মঞ্জুরুল আলম বাপ্পি বলেন, ইমন ও বিএনপির নামে কটুক্তি করাকে কেন্দ্র করে কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে তাদের উপর হামলা চালিয়েছে লাল্টু মেম্বর ও তার লোকজন। এতে তার বাবা বকুল হায়দার, জাহিদসহ ৬/৭ জন আহত হয়।

সাতক্ষীরা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ হাসানুর রহমান জানান, এ ঘটনায় মঞ্জুরুল আলম বাপ্পি বাদি হয়ে ইউপি সদস্য শাহীনুর রহমান লাল্টু ও সাবেক চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান মুসাসহ ১৪ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরো ১২ জনকে আসামী করে রবিবার থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে লাল্টু মেম্বর, জাহাঙ্গীর ও সামছুরকে গ্রেপ্তার করে রবিবার বিকেলে আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে পাঠানো হয়েছে।

(আরকে/এসপি/আগস্ট ০৯, ২০২৬)