বিশেষ প্রতিবেদক : একটি ব্যাংকঋণের নথি আর বঙ্গোপসাগরের একটি মানচিত্র—দুটি যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন জগতের বিষয়। অথচ মো. ইমদাদুল হক সোহাগের বিশ্লেষণে এগুলো অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও কৌশলগত নীতির পরস্পরসংযুক্ত দুটি দিক।

একটি দেখায়, কোনো উদ্যোক্তা বা প্রতিষ্ঠানের কাছে পুঁজি কীভাবে পৌঁছায় কিংবা পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়; অন্যটি তুলে ধরে, বাণিজ্যপথ, জ্বালানি প্রবাহ ও ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা কীভাবে একটি দেশের বহির্বিশ্বের অবস্থানকে প্রভাবিত করে। এই দুই ক্ষেত্র মিলিয়ে সোহাগের কাজের কেন্দ্রে যে প্রশ্নটি বারবার ফিরে আসে, তা হলো: বাংলাদেশ কীভাবে তার অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত সীমাবদ্ধতাকে শক্তিশালী জাতীয় সক্ষমতা ও অধিকতর কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনে রূপ দিতে পারে?

ব্যবসার ক্ষেত্রে অর্থায়নের সুযোগ অনেক সময় নির্ধারণ করে উৎপাদন চলবে কি না, কর্মসংস্থান বাড়বে কি না এবং কোনো প্রতিষ্ঠান বাণিজ্যিকভাবে টিকে থাকবে কি না। একইভাবে, জ্বালানি সরবরাহে ব্যাঘাত শিল্প ও কৃষিকে প্রভাবিত করে; এর বিস্তৃত প্রভাব পড়ে মূল্যস্ফীতি, উৎপাদনশীলতা ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর। অন্যদিকে, বন্দর ও অর্থনৈতিক করিডরের গুরুত্ব কেবল অবকাঠামোয় সীমাবদ্ধ নয়; এগুলো বাণিজ্যকে জাতীয় নিরাপত্তা, কূটনীতি এবং সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে যুক্ত করে।

অর্থায়ন, উৎপাদন, শাসনব্যবস্থা, জ্বালানি, বাণিজ্য ও কৌশলের এই পারস্পরিক সম্পর্কই সোহাগের কাজের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য।

বাস্তব ভিত্তি: বাণিজ্য ও সীমাবদ্ধতা

ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে শিকড় গেড়ে থাকা সোহাগের পেশাগত পথচলা শুরু হয় বাণিজ্যের বাস্তব জগৎ থেকে। অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি তাকে ব্যবস্থাপনায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা দেয়। অন্যদিকে, ব্যবসায় প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা তাকে পরিচয় করিয়ে দেয় উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন বাস্তব সংকটের সঙ্গে।

ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত প্রায়ই অনিশ্চয়তার মধ্যে নিতে হয়। অর্থায়নে বিলম্ব, কাঁচামালের অস্থির মূল্য, নিয়ন্ত্রণমূলক চাপ এবং সরবরাহব্যবস্থার বিঘ্ন অল্প সময়ের মধ্যেই একটি সম্ভাবনাময় পরিকল্পনাকে দুর্বল করে দিতে পারে। দীর্ঘ ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতায় সোহাগ এসব সীমাবদ্ধতার নানা দিক প্রত্যক্ষভাবে দেখেছেন।

বর্তমানে তিনি আয়াত মতিন গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, সোহাগ ট্রেডার্স ও ইয়াফাত ফিলিং স্টেশনের স্বত্বাধিকারী এবং নলডাঙ্গা রাজবাড়ি পার্ক অ্যান্ড রিসোর্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। একই সঙ্গে তিনি সেনা লুব্রিক্যান্টসের প্রধান পরিবেশক হিসেবেও যুক্ত আছেন।

এই অভিজ্ঞতা তাকে একটি বিস্তৃত উপলব্ধির দিকে নিয়ে যায়: কোনো একক প্রতিষ্ঠানের সংকট সব সময় বিচ্ছিন্ন ব্যবসায়িক সমস্যা নয়। কঠোর ঋণশর্ত, দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় এবং নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার অদক্ষতা অনেক সময় আর্থিক শাসন ও বৃহত্তর নীতিপরিবেশের গভীরতর দুর্বলতার প্রতিফলন।

বাজারের বাস্তবতা থেকে নীতি-বিশ্লেষণে

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাণিজ্যক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা সোহাগকে নীতি-বিশ্লেষণ ও জনপরিসরের আলোচনায় আরও সক্রিয় করে তোলে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের টিকে থাকা, ব্যাংকিং ব্যবস্থার দুর্বলতা, মূল্যস্ফীতি, ঋণপ্রাপ্তির সুযোগ এবং জ্বালানি নিরাপত্তা ক্রমে তার লেখালেখির গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে।

দৈনিক অবজারভারের পাঠকদের কাছে তিনি একজন কলামলেখক, ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গবেষক হিসেবে পরিচিত। তার লেখার বিষয় ব্যাংকিং ও উদ্যোগ উন্নয়ন থেকে শুরু করে নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ এবং আঞ্চলিক কৌশল পর্যন্ত বিস্তৃত।

সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণা নেটওয়ার্কে প্রকাশিত তার গবেষণাপত্রগুলোর মধ্যে জামানতের ফাঁদ: বাংলাদেশের ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি উদ্যোগের ঋণব্যবস্থার পুনর্গঠন উল্লেখযোগ্য। এ গবেষণায় তিনি অর্থায়ন ব্যবস্থার কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা বিশ্লেষণ করেছেন এবং বিদ্যমান অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কীভাবে অধিক উৎপাদনশীল সক্ষমতায় রূপ দেওয়া যায়, সে প্রশ্ন অনুসন্ধান করেছেন।

তার বিশ্লেষণের একটি ধারাবাহিক বৈশিষ্ট্য হলো—তিনি কেবল তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক ফলাফল দেখেন না; বরং সেই ফলাফলকে গড়ে তোলা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকেও বিশ্লেষণের কেন্দ্রে রাখেন।

কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন ও ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল

বিষয়ের বৈচিত্র্য থাকা সত্ত্বেও ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান সোহাগের ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষণের একটি প্রধান ক্ষেত্র।

মহাশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তিনি বিবেচনা করেন, যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের পারস্পরিক স্বার্থ ও অগ্রাধিকারের মধ্যে বাংলাদেশ কীভাবে নিজের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করতে পারে। এই আলোচনায় বঙ্গোপসাগর একটি কেন্দ্রীয় স্থান দখল করে আছে—যেখানে বাণিজ্য, যোগাযোগ, জ্বালানি নিরাপত্তা, জলবায়ু ঝুঁকি ও কূটনীতি ক্রমেই একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হচ্ছে।

ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল ও বঙ্গোপসাগর নিয়ে তার বিভিন্ন প্রবন্ধে একক কোনো ভূরাজনৈতিক বলয়ের সঙ্গে একচেটিয়া সংযুক্তির পরিবর্তে ‘সক্ষমতাভিত্তিক ভারসাম্যনীতি’র ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান নিয়ে তার আরেকটি বিশ্লেষণে তিনি যুক্তি দেন, দেশের উচিত শুধু বহিরাগত প্রতিযোগিতার প্রতিক্রিয়াশীল অবস্থানে সীমাবদ্ধ না থেকে নিজস্ব সার্বভৌম অগ্রাধিকার বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সক্ষমতা শক্তিশালী করা।

অর্থাৎ, তার বিশ্লেষণে মূল বিষয় কেবল বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা নয়; বরং জটিল আঞ্চলিক ব্যবস্থার মধ্যে বাংলাদেশের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানো।

একাডেমিক পরিসর ও জনপরিসরে প্রভাব

সোহাগের কাজ সংবাদপত্রের কলামের গণ্ডি পেরিয়ে একাডেমিক গবেষণা ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার পরিসরেও পৌঁছেছে।

শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ নিয়ে তার একটি প্রবন্ধ কানাডার ম্যানিটোবা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডক্টরাল গবেষণায় উদ্ধৃত হয়েছে। এটি তার জনপরিসরের লেখালেখি একাডেমিক গবেষণায় ব্যবহৃত হওয়ার একটি উদাহরণ।

ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল ও কৌশলগত ভারসাম্য নিয়ে তার বিভিন্ন লেখাও বিসিএসসহ প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতিমূলক সামগ্রীতে স্থান পেয়েছে বা অভিযোজিত হয়েছে। এর মাধ্যমে তার নীতিভিত্তিক যুক্তি সরকারি চাকরিপ্রার্থী, শিক্ষার্থী, গবেষক এবং জননীতি ও উন্নয়নবিষয়ক পাঠকদের কাছেও পৌঁছেছে।

এই বিস্তারের তাৎপর্য কেবল পরিচিতি বৃদ্ধিতে নয়; বরং সাংবাদিকতা, গবেষণা, পরীক্ষাভিত্তিক পাঠ্যসামগ্রী এবং বৃহত্তর জনআলোচনার মধ্যে নীতিগত চিন্তার প্রবাহে।

ইতিহাসচর্চা ও নাগরিক সম্পৃক্ততা

সোহাগের গবেষণার আরেকটি ক্ষেত্র আঞ্চলিক ইতিহাস। এখানে তিনি সমসাময়িক শাসনব্যবস্থার প্রশ্নকে অতীতের রাজনৈতিক ও রাজস্ব কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করে দেখার চেষ্টা করেন।

নলডাঙ্গা নিয়ে তার গবেষণা প্রচলিত জমিদারি ও রাজবাড়িকেন্দ্রিক ব্যাখ্যার বাইরে গিয়ে অঞ্চলটিকে মুঘল ও ঔপনিবেশিক বাংলার বৃহত্তর প্রাতিষ্ঠানিক প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করে। মুঘল বাংলায় আঞ্চলিক কর্তৃত্ব পুনর্মূল্যায়নবিষয়ক তার গবেষণা প্রচলিত বয়ানকে নতুনভাবে পর্যালোচনা করার পাশাপাশি আঞ্চলিক ক্ষমতা ও প্রশাসনিক কাঠামোর সম্পর্ক অনুসন্ধান করে।

এই ইতিহাসচর্চার সঙ্গে তার সমসাময়িক নীতি-বিশ্লেষণেরও একটি স্পষ্ট যোগসূত্র রয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই মূল প্রশ্ন প্রাতিষ্ঠানিক: কর্তৃত্ব কীভাবে সংগঠিত হয়, সম্পদ কীভাবে বণ্টিত হয় এবং শাসন কাঠামো সামাজিক ও অর্থনৈতিক ফলাফলকে কীভাবে প্রভাবিত করে।

নাগরিক সম্পৃক্ততাও তার পেশাগত পরিচয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সোহাগ নলডাঙ্গা ইব্রাহিম মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটিতে নেতৃত্বের দায়িত্ব পালন করেছেন এবং স্থানীয় জনসম্পৃক্ত পুলিশি কার্যক্রমেও যুক্ত ছিলেন।

এই নির্বাচনী অভিজ্ঞতা তাকে স্থানীয় শাসন, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, রাজনৈতিক সংগঠন এবং নাগরিক প্রত্যাশার সঙ্গে সরাসরি পরিচিত হওয়ার সুযোগ দেয়—যেসব বিষয় নীতি-বিশ্লেষণে প্রায়ই তাত্ত্বিকভাবে আলোচিত হলেও স্থানীয় পর্যায়ে ভিন্ন বাস্তবতায় প্রকাশ পায়।

মো. ইমদাদুল হক সোহাগের পেশাগত পথচলা—উদ্যোক্তা থেকে নীতি-গবেষক ও ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক হয়ে ওঠা—পেশা পরিবর্তনের চেয়ে বরং চিন্তা ও বিশ্লেষণের পরিসর বিস্তারের এক ধারাবাহিক প্রক্রিয়া।

ব্যবসা তাকে অর্থায়ন ও উদ্যোগের বাস্তবতা দেখিয়েছে। নাগরিক সম্পৃক্ততা দিয়েছে তৃণমূল শাসনব্যবস্থার অভিজ্ঞতা। গবেষণা দিয়েছে পদ্ধতিগত অনুসন্ধানের কাঠামো, আর জনপরিসরের লেখালেখি তার চিন্তাকে বৃহত্তর জাতীয় আলোচনায় পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে।

বাংলাদেশ যখন স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পথে এগোচ্ছে, পরিবর্তিত জ্বালানি বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে এবং ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে তীব্রতর প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হচ্ছে, তখন অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক নীতি ও বৈদেশিক কৌশলগত নীতিকে সম্পূর্ণ আলাদা করে দেখা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।

আর্থিক স্থিতিশীলতা উৎপাদন সক্ষমতাকে প্রভাবিত করে। উৎপাদন সক্ষমতা জাতীয় প্রতিযোগিতাশক্তি গড়ে তোলে। জ্বালানি নিরাপত্তা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় প্রভাব ফেলে। বন্দর ও করিডর একই সঙ্গে বাণিজ্য ও কৌশলগত যোগাযোগ নির্ধারণ করে। আর এসব চাপ মোকাবিলায় একটি দেশের সাফল্য শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে তার প্রাতিষ্ঠানিক শক্তির ওপর।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, ব্যবসার হিসাবখাতা এবং ভূরাজনীতির মানচিত্র আলাদা কোনো বিশ্লেষণী বিষয় নয়। এগুলো একই বৃহত্তর প্রশ্নের দুটি ভিন্ন প্রকাশ: একটি রাষ্ট্র কীভাবে তার অর্থনৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও কৌশলগত সক্ষমতা গড়ে তোলে, যাতে সে নিজের স্বার্থ রক্ষা করতে পারে এবং স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিসর প্রসারিত করতে পারে।

সোহাগের কাজের কেন্দ্রে এই প্রশ্নটিই বারবার ফিরে আসে—বাংলাদেশের বিদ্যমান শক্তি শনাক্ত করা, সেই শক্তিকে সীমিত করে রাখা প্রতিবন্ধকতাগুলো বিশ্লেষণ করা এবং সেগুলোকে কীভাবে টেকসই জাতীয় সক্ষমতা ও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনে রূপ দেওয়া যায়, তার সম্ভাব্য পথ অনুসন্ধান করা।

(একে/এসপি/আগস্ট ১০, ২০২৬)