তুষার বিশ্বাস, গোপালগঞ্জ : গোপালগঞ্জে ঘন ঘন লোডশেডিংকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য অপ্রীতিকর ঘটনা ও নাশকতা এড়াতে বিদ্যুৎ স্থাপনা ও উপকেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তা জোরদারে পুলিশের সহযোগিতা চেয়েছে ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ওজোপাডিকো)।

গতকাল মঙ্গলবার গোপালগঞ্জ বিদ্যুৎ সরবরাহ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাঈন উদ্দিন স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে পুলিশ সুপারের কাছে এ অনুরোধ জানানো হয়।

চিঠিতে বলা হয়, গোপালগঞ্জ পাওয়ার হাউজ ক্যাম্পাস ও চরপাথালিয়ায় অবস্থিত ওজোপাডিকোর দুটি ৩৩/১১ কেভি উপকেন্দ্রের মাধ্যমে পৌর এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়া এবং জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদার তুলনায় কম বরাদ্দ পাওয়ায় ঘন ঘন লোডশেডিং করতে হচ্ছে। এতে গ্রাহকদের মধ্যে অসন্তোষ ও ক্ষোভ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি দপ্তর, বৈদ্যুতিক স্থাপনা ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ বা অন্য কোনো অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে।

সম্ভাব্য নাশকতা প্রতিরোধ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ওজোপাডিকোর দপ্তর ও ৩৩/১১ কেভি উপকেন্দ্রগুলোকে নিয়মিত পুলিশ টহলের আওতায় আনা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর বিশেষ নজরদারির অনুরোধ জানানো হয়েছে। চিঠির অনুলিপি জেলা প্রশাসক, এনএসআইয়ের যুগ্ম পরিচালক, গোপালগঞ্জ সদর থানার ওসিসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।

এদিকে তীব্র লোডশেডিংয়ে দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। এছাড়া জরুরী সেবা ব্যাহত হচ্ছে।

গোপালগঞ্জ শহরের বড় বাজারের চাল ব্যবসায়ী অনুপ সাহা বলেন, “পৌর মার্কেটের আন্ডারগ্রাউন্ডে চালের ব্যবসা করি। লোডশেডিং হলে এখানে গরমের মাত্রা বেড়ে যায়। শ্বাস প্রশ্বাস নিতে কষ্ট হয়। ক্রেতাদেরও গরমে হাঁসফাঁস করতে হয়। বিদ্যুৎ চলে গেলে কেনাবেচা করতে পারি না। দিনে ঘন্টায় ঘন্টায় লোডশেডিং করা হচ্ছে।”

তিনি বলেন, “আমরা দ্রুত এর সমাধান চাই। দিনে প্রায় ১০ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না।”

শহরের মৌলভী পাড়ার বাসিন্দা গোপালগঞ্জ সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী হাসিবুল হাসান শান্ত বলেন, “আমাদের দৈনন্দিন জীবন স্থবির হয়ে যাচ্ছে। পড়াশোনার সময় বিদ্যুৎ থাকছে না।খাওয়ার সময় বিদ্যুৎ নেই, ঘুমানোর সময়ও বিদ্যুৎ বিভ্রাটে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটছে। কখনো আধা ঘণ্টাও বিদ্যুৎ থাকছে না। প্রযুক্তির এই সময়ে বিদ্যুৎ এখন আশীর্বাদের বদলে অভিশাপ মনে হচ্ছে। আমরা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ চাই।”

লোডশেডিংয়ের প্রভাব পড়েছে ব্যবসায়ও। কলেজ রোডের প্রিয়াঙ্কা অফসেট প্রিন্টিং প্রেসের ম্যানেজার আল আমিন শেখ বলেন, “লোডশেডিংয়ের কারণে ব্যবসা প্রায় বন্ধ হওয়ার মতো অবস্থা। গরমে অতিষ্ঠ হয়ে বাসায়ও থাকতে পারি না। প্রায় এক মাস ধরে পরিস্থিতি খারাপ, তবে সম্প্রতি লোডশেডিং আরও বেড়েছে।”

তিনি বলেন, “কম্পিউটারে ডিজাইনের কাজ করতে গিয়ে বিদ্যুৎ চলে গেলে কাজটি আবার শুরু থেকে করতে হয়। ফলে সারাদিনেও একটি কাজ শেষ করা সম্ভব হয় না। সময়মতো কাজ বুঝিয়ে দিতে না পারায় কাস্টমারদের চাপও সামলাতে হচ্ছে। শুধু আমাদের প্রেস নয়, এলাকার অন্য প্রেস ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোও একই সমস্যায় পড়েছে।”

শহরের বটতলা এলাকার বাসিন্দা রহমত আলী বলেন, এখন সব সেবায় প্রায় ডিজিটাল। তাই বিদ্যুতের লোডশেডিং এ চিকিৎসা, অপারেশন, অনলাইন সেবা, পাসপোর্ট, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ক্লিনিক , সফটওয়্যার, টিকিট কাটা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। বিদ্যুৎ ছাড়া জীবন অচল। তাই দ্রুত এ অবস্থার নিরসন ঘটাতে হবে।

গোপালগঞ্জ বিদ্যুৎ সরবরাহ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মইনুদ্দিন আহমেদ বলেন, “আমরা কোনো নির্দিষ্ট হুমকি পাইনি। তবে দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিদ্যুৎ সেবাকে কেন্দ্র করে নাশকতামূলক বা আক্রোশমূলক ঘটনা ঘটছে। তাই সতর্কতামূলকভাবে পুলিশ সুপারের কাছে অতিরিক্ত নিরাপত্তা চেয়েছি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অনেকে আক্রমণের আশঙ্কা প্রকাশ করে নানা কথা বলছেন।”

লোডশেডিংয়ের বিষয়ে তিনি বলেন, “আজ সকালে আমাদের চাহিদা ছিল ১৫ মেগাওয়াট, সেখানে পেয়েছি ৯ মেগাওয়াট। দুপুরে চাহিদা ছিল ১৭ মেগাওয়াট, সরবরাহ ছিল ৯ মেগাওয়াট। উৎপাদনের সঙ্গে পরিস্থিতি সম্পর্কিত হওয়ায় লোডশেডিং কতদিন থাকবে তা বলা সম্ভব নয়। তবে গত এক সপ্তাহ ধরে দিন-রাত মিলিয়ে গড়ে প্রায় আট ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে।”

তিনি বলেন, “গত দুই দিন লোডশেডিং কিছুটা বেশি হয়েছে। টাউন ফিডারের আওতায় সরকারি কলেজ ও মহিলা কলেজে ডিগ্রি পরীক্ষা চলায় ওই এলাকায় সরবরাহ বন্ধ করা যাচ্ছে না। ফলে অন্য এলাকায় বেশি সময় লোডশেডিং দিতে হচ্ছে।”

এ বিষয়ে গোপালগঞ্জের পুলিশ সুপার মোঃ হাবীবুল্লাহ বলেন, গোপালগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বলেন, বিদ্যুতের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো কেপিআই (গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা) হিসেবে নিয়মিতই নিরাপত্তার আওতায় থাকে। বিদ্যুৎ বিভাগ এ ধরনের নিরাপত্তার বিষয়ে প্রায়ই পুলিশকে চিঠি দেয়। আজও তারা একটি চিঠি দিয়েছে।

তিনি বলেন, “এটা নতুন কোনো বিষয় নয়। গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা হিসেবে এসব জায়গায় নিরাপত্তা দেওয়া আমাদের দায়িত্ব। লোডশেডিংয়ের কারণে এবারও তারা চিঠি দিয়েছে। আমাদের মোবাইল টিম ও টহল দলগুলোকে এসব স্থাপনার দিকেও নিয়মিত নজর রাখতে বলা হয়েছে।”

(বি/এসপি/আগস্ট ১২, ২০২৬)