আবদুল হামিদ মাহবুব


বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য নাম। এ দেশের মানুষের ভালোবাসা, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে তাঁর নাম গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস তিনি পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী ছিলেন। তাঁর অনুপস্থিতিতে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আলী, এএইচএম কামারুজ্জামান খন্দকার মোস্তাক আহমদসহ জাতীয় নেতারা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে রাষ্ট্রের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। ইতিহাসের এই অধ্যায়গুলো আমাদের গর্বের, আমাদের আত্মপরিচয়ের অংশ।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঘাতকদের হাতে বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকাণ্ড জাতির ইতিহাসে এক গভীর ক্ষত। এরপর দীর্ঘদিন ধরে ১৫ আগস্ট তাঁর শাহাদত দিবস হিসেবে পালিত হয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক সরকারের আমলেও দিবসটি নানা মাত্রায় পালিত হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই ধারাবাহিকতায় যে ছেদ পড়েছে, তা কেবল একটি রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা হিসেবে দেখলে হয়তো বিষয়টির গভীরতা বোঝা যাবে না।

আমার কাছে সবচেয়ে বেদনাদায়ক প্রশ্ন হলো; বঙ্গবন্ধু কি অশ্রদ্ধার পাত্র হয়ে গেলেন? আমার বিশ্বাস, বঙ্গবন্ধুকে অশ্রদ্ধার পাত্রে পরিণত করার সবচেয়ে বড় দায় তাঁর নিজের কন্যা শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলের ওপরই বর্তায়। একজন ঐতিহাসিক নেতাকে যখন একটি দলের রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে অতিরিক্তভাবে একীভূত করে ফেলা হয়, তখন তাঁর সার্বজনীন মর্যাদাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বঙ্গবন্ধু কেবল আওয়ামী লীগের নন; তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসের অংশ, স্বাধীনতার ইতিহাসের অংশ।
বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীরা তাঁর দেহকে মাটির নিচে সমাহিত করেছিল। কিন্তু পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাঁকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যে, তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারও মানুষের একাংশের কাছে বিতর্ক, ক্ষোভ ও প্রত্যাখ্যানের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। এটাই সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি।

ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের স্মৃতিবিজড়িত বাড়ির ওপর বুলডোজার চলার দৃশ্য তাই শুধু একটি স্থাপনা ধ্বংসের দৃশ্য নয়; এটি আমাদের ইতিহাসের প্রতি গভীর সংকেত। বঙ্গবন্ধুর প্রতি ভালোবাসা আর শেখ হাসিনার শাসনের মূল্যায়ন; এই দুটিকে এক করে দেখা উচিত নয়।

যারা বঙ্গবন্ধুকে ভালোবাসেন, তাঁদের উচিত বঙ্গবন্ধুকে কোনো ব্যক্তি বা দলের ঊর্ধ্বে, বাংলাদেশের মানুষের নেতা হিসেবে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করা। আর শেখ হাসিনার শাসনামলের ভুল-অন্যায়ের বিচার হওয়া উচিত ইতিহাস ও আইনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায়।

আজ বঙ্গবন্ধুর শাহাদত দিবসে তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। একই সঙ্গে আমাদের প্রত্যাশা; রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে বঙ্গবন্ধুকে আবার মানুষের বঙ্গবন্ধু হিসেবেই ফিরে পাওয়া যাবে। আমি ব্যক্তিগতভাবে শ্রদ্ধা জানিয়ে পুরনো লেখার স্ক্রিনশট আমার ফেসবুকের টাইমলাইনে পোস্ট দিলাম।আমার এই লেখা পড়ে যারা গালাগালি করবে, তাদের উদ্দেশ্যে আমার একটাই বক্তব্য; 'বঙ্গবন্ধুকে যারা অস্বীকার করেন, তারা বাংলাদেশকেই অস্বীকার করেন।' বঙ্গবন্ধুকে বাদ দিলে বাংলাদেশের অস্তিত্বও নাই।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশু সাহিত্যিক।