কালিগঞ্জে ৬টি হিন্দু পরিবারকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ২৫ শতক জমি দখল সাইফুল বাহিনীর
রঘুনাথ খাঁ, সাতক্ষীরা : সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়নের ফতেপুর গ্রামের গ্রামপুলিশ সাইফুল ইসলামের নেতৃত্বে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা ছয়টি হিন্দু পরিবারের সদস্যদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে তাদের তিনটি কাঠঘর, তিনটি শৌচাগার ও বাঁশবাগানসহ ২৫ শতকের বেশি জমি দখল করে নিয়েছে। বানানো হয়েছে একটি খুপড়ি ঘর।
শুক্রবার দিবাগত রাত দেড়টা থেকে সাড়ে তিনটা পর্যন্ত এ জবরদখল কার্যক্রম চালানো হয়। দরজা খুলে বাহিরে এলে রাম দা দিয়ে তাদেরকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে।
ফতেপুর গ্রামের মৃত অরুন রজকের ছেলে জয়দেব রজক জানান, কালিগঞ্জ উপজেলার ফতেপুর মৌজার এসএ ৩৮৫ দাগের ৬০ শতক জমি তিনিসহ চার সহোদর ও দুই কাকা মিলে মোট সাতটি পবিার শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস ও ভোগদখলে আছেন। ওই জমির মধ্যে ৫১ শতক জমি তাদেও নামে রেকর্ড হলেও বর্তমান মাঠ জরিপে বিআরএস ৮০১ নং খতিয়ানের ২৮৭ দাগে সাত শতক ও ৬১৫ খতিয়ানের ২৮৭ দাগে দুই শতক জমি মোট নয় শতক জমি একই এলাকার গ্রাম পুলিশ সাইফুল ইসলামের বাবা সাবেক দফাদার গোলাম রসুল ও তার শরীকদের নামে হয়ে যায়। ভুল রেকর্ডকে কাজে লাগিয়ে সাইফুল ইসলাম ও তার সাতটি ভাইসহ অন্য শরিকগণ সম্প্রতি ওই জমি দখলের চেষ্টা করলে তিনিসহ (জয়দেব) পাঁচ ভাই ও দ্ইু কাকা বাদি হয়ে গোলাম রসুলসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে গত ২১ মে কালিগঞ্জ সিভিল জজ আদালতে দেঃ ১৫৫/২৬ নং মামলা দায়ের করেন।
আদালতের নোটিশ পাওয়ার পরও গত ৪ জুলাই গ্রাম পুলিশ সাইফুল ইসলাম স্থানীয় ইউপি সদস্য আল মামুনের কাছে রেকর্ড মূলে জমি দখলের কথা প্রকাশ করে। সেখানে সুবিধা না করতে পেরে গত ৬ জুলাই সাইফুল ইসলাম দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়ন পরিষদে বিরোধপূর্ণ জমি দাবি করে তা ফিরে পেতে অভিযোগ করে। পরদিন স্থানীয় বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা ও সুশীল সমাজের নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে ইউনিয়ন পরিষদে শালিসি বৈঠকে সাইফুল কোন দলিল না দেখাতে না পারলে পরবর্তী দিন ধার্য করা হয়। ওই দিন সাইফুল ১৯৯৬ সালের ২৯ ডিসেম্বর ৭৩২৮ নং রেজিষ্ট্রি কোবালা দলিলের একটি ফটোকপি নিজের হাতে রেখে ওই দলিল মূলে জমি দাবি করেন। ফটোকটি দলিল ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহম্মদ শাহজি চাইলে সাইফুল দিতে অস্বীকার করলে পরবর্তী ১১ আগষ্ট দিন ধার্য করা হয় মূল দলিলের জন্য। ১১ আগষ্ট সাইফুল ১৯৯৬ সালের ১৩ মে ১৯৭৯ নং দলিলের ফটোকপি মূলে সাত শতক জমি দাবি করলে মূল দলিল নিয়ে আসার জন্য আগামি ৫ সেপ্টেম্বর দিন ধার্য করা হয়। একইসাথে ওই জমি জবরদখলের চেষ্টা না করার জন্য সাইফুল ও তার লোকজনদের নির্দেশ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে সাইফুলের উল্লেখিত ফটোকপি দলিলের নাম্বার তুলে সেই দলিল তুলে দেখা যায় সেটি জিরেনগাছা মৌজার। মালিকানা জিরেনগাছার এক ব্যক্তির।
জয়দেব রজক আরো জানান, সাইফুল ইসলাম জমি জবরদখল করতে পারে তার এমন আশঙ্কা হওয়ায় গত ১৪ জুলাই তিনি আদালতে স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা চান। আদালত সাইফুলসহ সকল বিবাদীকে এক সপ্তাহের মধ্যে কারণ দর্শানোর নির্দেশ দেন। এরপরও সাইফুল ও তার শরীকরা আদালতে কারণ দর্শায়নি।
জয়দেব রজক অভিযোগ করে বলেন, শুক্রবার জমি দখল হতে পারে এমন খবর পেয়ে তিনি বিষয়টি স্থানীয় বিএনপি নেতা, জামায়াত নেতা ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যনকে অবহিত করেন। একপর্যায়ে শুক্রবার দিবাগত রাত দেড়টার দিকে রাম দা, শাবল, লাঠি, লোহার রড হাতে সাইফুল, তার ভাই আজিবর , জামির আলী, আব্দুর রহমান, আশরাফুল, ফারুক, তাদের স্ত্রী ও সন্তানসহ শতাধিক ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসী তাদের বাড়িতে আসে। তাদের উপস্তিতি জানতে পারলে ডাকাত- ডাকাত বলে চিৎকার শুরু করলে সন্ত্রাসীরা জানালা দিয়ে তাদের হাতের অস্ত্র দেখিয়ে দরজা খুলে বাইলে এলে খুন করার হুমকি দেয়। একপর্যায়ে তারা তারা বাসুদেব, শুকদেব, ও প্রদীপের তিনটি বাথরুম, তার (জয়দেব), বাসুদেব ও শুকদেব এর কিনটি কাঠঘর, বাঁশবাগানসহ প্রায় ২৫ শতক জমির পশ্চিম ও উত্তর পার্শে বাঁশ ও কারেণ্ট জাল দিয়ে ঘিরে দখলে নেওয়ার চেষ্টা করে। ওই জয়িগায় তারা টিন ও বাঁশ দিয়ে একটি ছোট টোং ঘর বানিয়ে চলে যায়। বিষয়টি পুলিশ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সাবেক জনপ্রতিনিধি ও ভারপ্রাপ্ত ইউপি চেয়ারম্যানকে অবহিত করা হয়। উপপরিদর্শক মল্লিক মনিরুজ্জামানের নেতৃত্বে পুলিশ ভোর চারটার দিকে প্রথমে জবরদখলকারি সাইফুলের চায়ের দোকানে এসে চা পান করে ঘটনাস্থলে আসে। পরে উভয়পক্ষকে শনিবার বিকেলে কাগজপত্রসহ থানায় যেতে বলে যান।
দক্ষিণশ্রীপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নুরুজ্জামান পাড়, সাবেক ইউপি সদস্য আনারুল মীর, জামায়াত নেতা ওমর ফারুকসহ কয়েকজন জানান, অরুন রজক ও তাদের শরিকদের ওয়ারেশ হিসেবে জয়দেব রজকসহ সাতটি পরিবার বংশপরম্পরায় ওই জমিতে ঘরবাাড়ি বানিয়ে বসবাস করে আসছে। বিষয়টি নিয়ে দেওয়ানী আদালতে মামলা থাকলেও গ্রাম পুলিশ সাইফুলের আবেদনের ভিত্তিতে তিন দিন শালিসি বৈঠকে সাইফুল কোন দলিল দেখাতে পারেনি। একপর্যায়ে আগামি ৫ সেপ্টেম্বর উভয়পক্ষের আইনজীবী ও একজন নিরপেক্ষ আইনজীবীর উপস্থিতিতে জমির সমস্যা সমাধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কোন পক্ষকে জমিতে কোন প্রকার নির্মাণ কাজ না করার জন্য বলা হয়। এরপরও শুক্রবার দিবাগত রাত দেড়টা থেকে ভোর সাড়ে তিনটা পর্যন্ত সাইফুলের নেতৃত্বে তার সশস্ত্র ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসীরা ভুয়া কাগজপত্রের মূলে দাবিকৃত সাত শতক জমির বিপরীতে ২৫ শতকের মত জমি নেট দিয়ে ও ছোট খুপড়ি ঘর বানিয়ে দখলের চেষ্টা করা হয়েছে। এ ঘটনায় এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
স্থানীয়রা জানান, এসএসসি ও এইচএসসির শিক্ষাগত যোগ্যতার ভুয়া কাগজপত্র তৎকালিন ইউপি চেয়ারম্যান প্রশান্ত সরকারের মাধ্যমে সত্যায়িত করে মোটা অংকের আর্থিক সুবিধা দিয়ে ২০১৮ সালের ১১ জুলাই গ্রামপুলিশ হিসেবে সাইফুল দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়ন পরিষদে যোগদান করে। তার কাগজপত্র যাঁচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সম্প্রতি সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসকের কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
সাতক্ষীরা জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. এমদাদুল হক জানান, নিষাধাজ্ঞা প্রাপ্তির আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালতের শোকজ নোটিশ পাঠানোর পর ও বিবাদী পক্ষ জমি জবরদখলের চেষ্টা চালানো বেআইনি। বিষয়টি আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হবে।
দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহম্মদ শাহজি জানান, দেওয়ানী আদালতে চলমান মামলা থাকলেও স্থানীয়ভাবে শান্তি বজায় রাখতে তিনি সুধীজনদের নিয়ে তিনবার পরিষদের বসেছেন। গ্রামপুলিশ সাইফুল তাদের আদেশ অমান্য করে গভীর রাতে সন্ত্রাসী ভাড়া করে রজকদের জমি জবরদখল করেছে। বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনের সাথে কথা বলা হয়েছে।
গ্রাম পুলিশ সাইফুল ইসলামের কাছে জমি জবরদখলের চেষ্টা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি অস্বীকার না করেই কোথায় আছেন তা না বলে সাক্ষাতে ছাড়া কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
কালিগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক মল্লিক মনিরুজ্জামান গ্রাম পুলিশ সাইফুলের নেতৃত্বে রাতের আঁধারে রজক পরিবারের দীর্ঘদিনের ভোগদখলীয় জমি জবরদখল করার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ঘটনাস্থলে যাওয়ার আগে নিকটবর্তী একটি চায়ের দোকানে তারা গিয়েছিলেন। সেটা সাইফুলের কিনা তা তিনি জানেন না।
কালিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ শহীদুল ইসলাম জানান, খবর পেয়ে ফতেপুরে পুলিশ পাঠানো হয়। বিরোধ নিষ্পত্তি করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।
(আরকে/এসপি/আগস্ট ১৫, ২০২৬)
