আত্মহত্যার ঝুঁকিতে মার্কিন রণতরির ৫ হাজার নাবিক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক : প্রায় নয় মাস ধরে সমুদ্রে অবস্থান করছে মার্কিন রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন। দীর্ঘ এই সময়ে কোনো বড় ধরনের বন্দরে ভিড়তে পারেনি জাহাজটি। এর ফলে রণতরিতে কর্মরত প্রায় পাঁচ হাজার নাবিকের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মার্কিন নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও সামরিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
দীর্ঘ মেয়াদে সাগরে, বাড়ছে মানসিক চাপ
গত ২১ নভেম্বর সান দিয়েগো বন্দর ছাড়ে রণতরিটি। প্রাথমিকভাবে প্যাসিফিক অঞ্চলের দিকে যাওয়ার কথা থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরু হওয়ায় সেটিকে ওই অঞ্চলে পাঠানো হয়। এরপর থেকে রণতরিটি টানা ২৫০ দিনের বেশি সময় সাগরে কাটানোর রেকর্ড গড়েছে।
বারবার তাদের মোতায়েনের সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে। দীর্ঘ সময় স্বজনদের থেকে দূরে থাকা এবং ভূমিতে নামতে না পারার ফলে নাবিকদের মধ্যে মানসিক অবসাদ দেখা দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
নাবিকদের জীবনযাত্রায় চরম সংকট
স্থানীয় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রণতরিতে পানির সরবরাহ ও খাবার নিয়ে সংকট তৈরি হয়েছে। সেই সঙ্গে পয়োনিষ্কাশন বা প্লাম্বিং সমস্যার কারণে নাবিকদের দৈনন্দিন জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। নাবিকদের মনোবল কমে যাওয়া এবং মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ার মতো খবরও আসছে।
এমনকি কয়েকজন নাবিক জাহাজ থেকে সাগরে ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের কাছে জবাব চেয়েছেন কয়েকজন ডেমোক্র্যাটিক আইনপ্রণেতা।
কী বলছে নৌবাহিনী?
নৌবাহিনীর এক কর্মকর্তা ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানকে জানিয়েছেন, দীর্ঘ সময় মোতায়েন থাকলে নাবিক ও তাদের পরিবার যে চাপের মুখে পড়ে, তা নিয়ে তারা সচেতন। রণতরির নাবিকদের স্বাস্থ্য ও সুস্থতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
সেই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘আমরা যতদূর জানি, আত্মহত্যার প্রবণতা বা আত্মহত্যার চেষ্টার খবর বাড়েনি।’ তবে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ঐতিহ্যবাহী সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার কথা স্বীকার করেছেন তিনি।
এ কর্মকর্তা দাবি করেছেন, জাহাজে পরিষ্কার পানি ও স্বাস্থ্যকর খাবারের সরবরাহ চলমান রয়েছে।
এদিকে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ দাবি করেছেন, রণতরির অবস্থা সম্পর্কে যেসব প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে, তা ‘সম্পূর্ণ ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে’। তিনি দাবি করেন, নাবিকদের সাধ্যমতো সব সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হচ্ছে।
দীর্ঘ মোতায়েনের মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব
অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন নৌবাহিনীর ভাইস অ্যাডমিরাল রবার্ট মুররেট বলেন, সাধারণত বিমানবাহী রণতরি ছয় মাসের বেশি সময় মোতায়েন থাকে না। নিয়মিত বিরতিতে বন্দরে ভেড়ার ফলে নাবিকরা বিশ্রামের সুযোগ পান। কিন্তু আব্রাহাম লিংকনের ক্ষেত্রে তা হয়নি।
সামরিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাগরে দীর্ঘ সময়ের অনিশ্চয়তা সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে। কখন বাড়ি ফিরতে পারবেন, তা না জানার কারণে নাবিকদের মানসিকভাবে ভেঙে পড়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। বিশেষ করে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে একঘেয়েমি ও উচ্চ সতর্কতায় কাজ করাটা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ।
মার্কিন নৌবাহিনীর দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কর্মকর্তারা বলছেন, সামরিক বাহিনীর নাবিকরা অত্যন্ত ধৈর্যশীল ও শক্তিশালী। কিন্তু সেই ধৈর্যকে পুঁজি করে তাদের ওপর অমানবিক চাপ সৃষ্টি করা ঠিক নয়। বাড়ি ফেরার একটি স্পষ্ট লক্ষ্যমাত্রা থাকাটা একজন নাবিকের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য।
তথ্যসূত্র : দ্য গার্ডিয়ান
(ওএস/এএস/আগস্ট ১৬, ২০২৬)
