ফরিদপুরে সরকারি জমি দখল, পর্ব : ৪
তাম্বুলখানা কৃষি ফার্মের সরকারি অধিগ্রহণকৃত দুই একরেরও বেশি জমি দুর্বৃত্তদের দখলে
রিয়াজুল রিয়াজ, বিশেষ প্রতিনিধি : ফরিদপুরের সদর উপজেলার কৈজুরী ইউনিয়নের তাম্বুলখানা গ্রামে অবস্থিত 'কৃষি খামার' হিসেবে খ্যাত 'তাম্বুলখানা বীজ উৎপাদন খামার'টি বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) নিয়ন্ত্রিত দেশের অন্যতম প্রধান এবং শীর্ষস্থানীয় মানসম্মত বীজ উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে সুখ্যাতি রয়েছে। উচ্চমানের কৃষি বীজ উৎপাদনের পাশাপাশি এর চোখ জুড়ানো প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে এটি ফরিদপুরের একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় পর্যটন ও বিনোদন স্পটও বটে।
কিন্তু স্থানীয় কিছু দখলবাজ দুর্বৃত্ত ও কৃষি খামারটির দায়িত্বে থাকা অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে এ খামারটি হারাতে বসেছে তার নিজস্ব ঐতিহ্য, বেদখল হয়েছে এ ফার্মের জন্য জেলা প্রশাসনের অধিগ্রহণকৃত প্রায় দুই একর জমি। এছাড়া, সরকারি এ প্রতিষ্ঠানটির রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে সীমাহীন অনিয়ম ও দুর্নীতি। যা ওখানে কর্মরত শ্রমিক সর্দার থেকে অফিসের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা পর্যন্ত বিস্তৃত। আর এসব যেনো দেখার কেউ নেই নেই। এ বিষয়ে নিরব থাকতেই বেশি পছন্দ ফরিদপুরের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের। তারা এ বিষয়ে বিএডিসির ঢাকার হেড অফিসে কথা বলতে পরামর্শ দিয়েছেন।
সম্প্রতি তাম্বুলখানা কৃষি ফার্মের সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করার উদ্যোগ নেওয়ার পর সংবাদ সংগ্রহে গিয়ে প্রথমে উত্তরাধিকার ৭১ নিউজএর নজরে আসে এ কৃষি ফার্মের জন্য ফরিদপুর জেলা প্রশাসন তথা সরকারের অধিগ্রহণ করা প্রায় ১ একর জমি বাদ দিয়ে ফার্মের সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করা হয়েছে। স্থানীয় দুর্বৃত্তদের দখল করা ওই জমি উদ্ধারের কোনো পদক্ষেপ নেননি স্থানীয় ওই কৃষি ফার্মের দায়িত্বে থাকা আসাবিক কর্মকর্তা (অফিস প্রধান) বিএডিসি'র সিনিয়র সহকারি পরিচালক শামীম রেজা।
উত্তরাধিকার ৭১ নিউজ এর অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ওই ফার্মের সর্বমোট প্রায় ২ একর জমি দীর্ঘদিন যাবত বেদখল হয়ে আছে। অবাক করার বিষয় হলো, কৃষি ফার্মের ভিতরেই বেদখল অবস্থায় রয়েছে প্রায় ৮০ শতাংশ থেকে ১ একর জমি যা আবার বংশ পরম্পরায় দুর্বৃত্তরা নিজেদের মনে করে উপভোগ করে চলেছেন দখলদার বাহিনী। বর্তমান কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে ওই ফার্মে কাজ করা সাবেক এক দিনমজুর আরশাদ আলী বেপারি ওই সময়ে পতিত পড়ে থাকা জমির কিছু অংশ সবজি চাষ করতে চেয়ে নেন ফার্মটির বড় সাহেব থেকে। পরে ওই কর্মকর্তা বদলি হলে তিনি আর ওই জমি ছাড়েন নাই। তিনি মারা গেলে আস্তে আস্তে পরবর্তী প্রজম্ম তা দখলে নিয়েছেন এবং আস্তে আস্তে ওই জমি দখলের সীমানা বাড়িয়েছেন তারা। নিরবতা পালন করেছেন ফার্মটির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারাও। এখনও তা বংশ পরম্পরায় ভোগ দখল করে চলেছেন। বর্তমান ওই ফার্মের কৃষি কর্মকর্তা শামীম রেজার মতে 'ওইখানে ৮০ বা ১০০ শতাংশ নয় এটি মাত্র ৬০-৭০ শতাংশ হতে পারে'।
ফার্মের ভিতরের বেদখল হওয়া জমি ৬০, ৭০, ৮০ নাকি ১০০ শতাংশ; সেটি সরকার কাগজপত্র দেখে মাঠ জরিপ করলেই নির্নয় করতে পারবে। তবে, সেটি যে ফার্মের বেদখল হওয়া সরকারি জমি তা কারোর অস্বীকার করার সুযোগ নাই।
এদিকে, সম্প্রতি গড়ে উঠা সীমানা প্রাচীরের বাইরে এ ফার্মের কি পরিমান সরকারি জমি বেদখলে আছে তার দিকে একটু আলোপাত করা যাক। স্থানীয়দের মতে, তাম্বুলখানা বীজ উৎপাদন খামারটির মেইনগেট থেকে দক্ষিণে জনৈক সালাউদ্দিন মাস্টারের বাড়ির আঙিনায় মোট জায়গা ৪২ শতাংশ (কারো কারো মতে ৪৪ শতাংশ) ফার্মের জায়গা রয়েছে । তবে, কৃষি কর্মকর্তা শামীম রেজার মতে, 'ওই জমির পরিমান হতে পারে ২৫, ২৬ থেকে ৩০ শতাংশ, এর বেশি নয়'। এছাড়া, ফার্মের মেইনগেট থেকে দক্ষিণ-পূর্ব পাশে আলম পালোয়ানের বাড়ির আঙ্গিনা মোট ফার্মের জায়গা রয়েছে ২৬ শতাংশ। এসব জমি বাইরে রেখেই দেওয়া হয়েছে সীমানা প্রচীর। মেইন গেট থেকে উত্তর-পূর্ব পাশের গাব গাছ তলার ভিটা, অথবা মৃত আরশাদ আলী বেপারীর বেনামি ভিটা হিসেবে পরিচিত সরকারের বেদখল হওয়া জমির পরিমান প্রায় ৮০ থেকে ১০০ শতাংশ বা প্রায় এক একরের মতো হবে বলে ধারণা স্থানীয়দের। তবে, এটির ক্ষেত্রেও ফার্মটির দায়িত্বে থাকা সিনিয়র সহকারি পরিচালক শামীম রেজার নিকট সঠিক তথ্য নেই। তার তার ধারণা এখানে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ হবে হয়তো। অংকের সংখ্যা কম বললেই বেদখল হওয়া সরকারি এসব জমির কোনোটিই অস্বীকার করেন নাই শামীম রেজা।
জমির পরিমান হিসেব মেলাতে বিএডিসির এ কৃষি কর্মকর্তা রুমে টাঙানো ফার্মটির সর্বশেষ জরিপের চার্টে মোট সরকারের অধিগ্রহণকৃত এ ফার্মের জমির পরিমান উল্লেখ রয়েছে ১০৫ একর ১৬ শতাংশ। কৃষি কর্মকর্তা শামীম রেজার মতে বর্তমানে তার কাছে ওই ফার্মের জমির যে হিসেব রয়েছে তা ১০৩ একর ০৬ শতাংশ। যার মধ্যে আবাদ যোগ্য জমি রয়েছে ৮০ একরের কিছু বেশি।
কৃষি কর্মকর্তা শামীম রেজার রুমে টাঙানো জমির পরিমাপের ওই চার্ট অনুযায়ী হিসেবের পার্থক্য নির্ণয় করলে ফলাফল স্থানীয়দের হিসেবের সাথে সম্পুর্ণ মিলে যায়। অর্থাৎ ফার্মের প্রায় দুই একরেরও বেশি জমি যে প্রতিষ্ঠানটির বেদখলে আছে, তা স্পষ্ট বোঝা যায়। যা উপরোক্ত দুর্বৃত্তরা দখল করে খাচ্ছে।
এদিকে, দখলদার দূর্বৃত্তরা ইনিয়ে বিনিয়ে অগ্রহণযোগ্য কথাবার্তা বললেও দখলের কথা অস্বীকার করেননি কেহই।
তারা ফার্মের বড় সাহেবকে (ওই ফার্মের অধিকর্তা) ম্যানেজ করেই দিনের পর দিন দখলে রেখেছেন। এসব জমির বাইরেই বদরপুর-সালথা সড়কের কোল ঘেষে গড়ে উঠা কিছু দোকান ও বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে এ ফার্মের জায়গায়, সেসব আবার ফার্মের কর্মকর্তাদের থেকে একটি নির্দিষ্ট অর্থের অবৈধ বা অনৈতিক লেনদেনের মাধ্যমে গড়ে তোলা হয়েছে বলে জনশ্রুতি রয়েছে। তবে যে কেউ এসব দোকান উঠাতেও পারেন না। তারাই পারেন যাদের সাথে ফার্মের বড় সাহেবের লিংক আছে, প্রভাবশালীদের আশির্বাদ আছে। স্থানীয়দের অনেকেরই অভিযোগ সরকারি এসব জমি দীর্ঘদিন যাবত এভাবেই কিছু নিদিষ্ট লোকজন দখল করে খাচ্ছে। আর ফার্মের কোনো কর্মকর্তাই তা উদ্ধারের উদ্যোগ নেয়নি। স্থানীয়রা আরও জানান, আসলে ওনাদের (কর্মকর্তাদের) কারোরই নৈতিক শক্তি বা ইচ্ছে নেই এ জমি উদ্ধারের। কারণ হিসেবে তারা জানান, কোন বড় সাহেব (অফিস প্রধান) চেঞ্জ হলে ফার্মে কাজ করা নারী শ্রমিকদের সর্দার খোরশেদ মিয়াজি ওরফে 'লেটিস খোরশেদ' সেই নতুন বড় সাহেবকে তার অদৃশ্য যাদু শক্তি দিয়ে হাত করে ফেলেন। এরপর সর্দার খোরশেদ ও মেইন রোডের এক অবৈধ দোকানদার জনৈক বাবুর মাধ্যমে দখলবাজরা তাদের জমি দখলে রাখতে বা এ ব্যাপারে বড় সাহেবের চোখ-মুখ বন্ধ রাখতে মোটা অংকের অর্থের অবৈধ লেনদেন করেন। এমনিভাবে অবৈধ লেনদেনের মাধ্যমে দখলবাজরা বছরের পর বছর অবৈধভাবে ফার্মের ওসব জমি ভোগ করে চলেছেন অবলীলায়।
বিএডিসির অধীনে থাকা তাম্বুলখানা বীজ উৎপাদন খামারের বর্তমান সীমানা প্রাচীরের বাইরে ও ভেতরে বেদখল থাকা সরকারি জমির পরিমাণের ক্ষেত্রে কিঞ্চিত মতপার্থক্য থাকলেও, ফার্মটির দায়িত্বে থাকা সিনিয়র সহকারি পরিচালক শামীম রেজা অকটপটেই স্বীকার করে নিয়েছেন তাদের জমি বেদখলের কথা। সেই সাথে প্রকাশ করেছেন নিজের অসহায়ত্ব বা সীমাবদ্ধতার কথাও। এসময় 'দৈনিক বাংলা ৭১' এর এক প্রশ্নের জবাবে শামীম রেজা জানান, আসলে আমার জানা ছিলো না যে, সীমানা প্রাচীরের বাইরেও আমাদের এতো জমি রয়েছে। পুরাতন স্টাফরা যেভাবে দেখিয়েছে ওইভাবেই প্রাচীর তৈরি করেছি। পরে আপনাদের থেকে শুনে কাগজপত্র দেখে কনফার্ম হয়েছি যে জমি রেখেই প্রাচীর করে ফেলেছি।' তাৎক্ষণিক এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে শামীম রেজা আরও জানান, আমি এ জমি উদ্ধারের জন্য আমার উর্ধতন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি ফরিদপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কে এ বিষয়ে অবগত করেছি। সবার সহযোগিতা পেলে আশাকরি ফার্মের সমস্ত বেদখল জমি উদ্ধার করতে পারবো।'
তবে, কৃষি কর্মকর্তা শামীম রেজা তাঁর সাথে এ বিষয়টি নিয়ে কোনো প্রকার যোগাযোগ করেননি জানিয়ে ফরিদপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মেশকাতুল জান্নাত রাবেয়া উত্তরাধিকার ৭১ নিউজকে জানান, 'শামীম রেজা তাম্বুলখানা কৃষি ফার্মের বেদখল থাকা জমি সম্পর্কে আমাকে কিছুই জানাননি। আমি আপনার থেকেই এ বিষয়ে প্রথম জানলাম। এমনটি হয়ে থাকলে ওই জমি উদ্ধারে সমস্ত উদ্যোগ বিএডিসিকেই নিতে হবে। আমার নিকট জমি উদ্বারের ব্যাপারে সহযোগিতা চাইলে, আমি হয়তো ডিসি (জেলা প্রশাসক) স্যারের সাথে এ ব্যাপারে কথা বলে স্যারের মাধ্যমে ম্যাজিস্ট্রেট সাপোর্টের ব্যবস্তা করতে পারবো। রাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষায় ডিসি স্যারের পরামর্শক্রমে বিএসিডিকে তাদের জমি উদ্ধারে অবশ্যই ফরিদপুর জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসন সহযোগিতা করবে বলেও জানান ইউএনও রাবেয়া।
উপরোক্ত বিষয়গুলো অবগত করে ফরিদপুর বিএডিসির যুগ্ম পরিচালক ফয়সাল হোসেনের সাথে কথা বললে তিনি এসবের কোনো উত্তর না দিয়ে তাম্বুলখানা ফার্মের বর্তমান দায়িত্বে থাকা সিনিয়র সহকারি পরিচালক শামীম রেজা ও ঢাকায় বিএডিসি'র ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলতে পরামর্শ দেন।
যুগ্ম পরিচালক ফয়সাল হোসেনের পরামর্শ আমলে নিয়ে উত্তরাধিকার ৭১ নিউজ এর এ প্রতিবেদক এসব বিষয়ে যাবতীয় তথ্য তুলে ধরে খোলামেলা কথা বলেন বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) এর (হেড অফিসে কর্মরত) মনিটরিং বিভাগের যুগ্ম প্রধান তাহমিনা বেগম এর সাথে। সব শুনে তাহমিনা বেগম উত্তরাধিকার ৭১ নিউজকে জানান, 'আমি এসব তথ্য বিএডিসির সংশ্লিষ্ট সকল ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে অবগত করবো। তিনি আরও জানান, বিএডিসি সারাদেশে তাদের বেদখল হওয়া সকল জমি উদ্ধারের পদক্ষেপ নিয়েছে। ইতিমধ্যে অনেক জমি উদ্ধার হয়েছে, ফরিদপুর তাম্বুলখানা ফার্মের জমি'র ব্যাপারে তিনি বলেন, ওই অফিসের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা পদক্ষেপ নিলে বিএডিসি অবশ্যই তাকে সহযোগিতা করবে।
এদিকে, এ রিপোর্টের লেখার শেষের দিকে তাম্বুলখানা কৃষি ফার্মের দায়িত্বে থাকা বিএডিসির সিনিয়র সহকারি পরিচালক শামীম রেজা উত্তরাধিকার ৭১ নিউজকে জানান, বিএডিসি ও স্থানীয় জেলা প্রশাসন আমার নিরাপত্তা নিশ্চিত করলে আমি বেদখল হওয়া সরকারি জমি উদ্ধারে পদক্ষেপ নিতে পারি। ইতিমধ্যে আমাকে অনেক হুমকির মোকাবেলা করে আমাকে প্রতিটি দিন অতিবাহিত করতে হচ্ছে। এ অফিসে আমি ও আমার পরিবার ছাড়া সবাই স্থানীয়। সুতরাং এ জমি উদ্ধারে ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহন করতে হলে- স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও সাংবাদিকদের তাঁর পাশে থেকে নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি ইতিবাচক সহযোগিতা কামনা করেছেন কৃষি কর্মকর্তা শামীম রেজা।
চলবে...
(আরআর/এএস/আগস্ট ১৬, ২০২৬)
