স্টাফ রিপোর্টার : যাত্রীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যে চলাচলের জন্য রেল স্টেশনে সকলের প্রবেশের সমান সুযোগ থাকা জরুরি। এটি কোনো বিশেষ সুবিধা নয়; বরং রেল কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব ও সেবার অংশ। কিন্তু স্টেশনে চলাচলের নানা বাধা, প্রয়োজনীয় তথ্য ও ডিজিটাল সেবা ব্যবহারে সমস্যা এবং কর্মীদের অসহযোগিতা বা সচেতনতার অভাবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিসহ সহায়তা প্রয়োজন রয়েছে, এমন যাত্রীরা নিয়মিত নানা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন।

‘সবার জন্য প্রবেশগম্যতা : বাংলাদেশ রেলওয়ে’ শীর্ষক কর্মশালায় অংশগ্রহণকারীরা এসব কথা বলেন। আজ মঙ্গলবার রাজধানীর একটি হোটেলে রেলপথ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ রেলওয়ে ও ব্র্যাক যৌথভাবে এ কর্মশালার আয়োজন করে। কর্মশালায় রেল স্টেশনের অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা পর্যালোচনা করা হয়। পাশাপাশি নীতিমালা পরিবর্তন, কর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং সেবার মান নির্ধারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ বলেন, রেলযাত্রা তখনই সবার জন্য প্রবেশগম্য হবে, যখন একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি নিজে থেকে স্টেশনে গিয়ে টিকিট কাটতে, প্ল্যাটফর্মে যেতে, ট্রেনে উঠতে, নিজের আসনে পৌঁছাতে, শৌচাগার ব্যবহার করতে এবং নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবেন।

তিনি আরও বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য কোনো পরিকল্পনা করার সময় তাঁদের শুধু সুবিধা নেওয়া মানুষ হিসেবে দেখলে হবে না। পরিকল্পনা, নকশা তৈরি, বাস্তবায়ন ও মূল্যায়নের প্রতিটি ধাপে তাঁদের মতামত ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বলেন, রেলসেবা সবার জন্য নিরাপদ, স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ ও সহজে ব্যবহারযোগ্য করাই আমাদের মূল লক্ষ্য। অবকাঠামোগতসহ নানা সীমাবদ্ধতা থাকলেও প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী যাত্রীদের নির্বিঘ্নে চলাচল নিশ্চিত করতে নতুন মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সভাপতির বক্তব্যে রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন বলেন, বাংলাদেশ রেলওয়ে এখন যাত্রীবান্ধব সেবার ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত নানা সীমাবদ্ধতা থাকলেও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিসহ সব যাত্রীর জন্য সহজে ব্যবহারযোগ্য ও সবার উপযোগী রেলসেবা নিশ্চিত করতে তাঁরা কাজ করছেন।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ব্র্যাকের সড়ক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিচালক আহমেদ নাজমুল হুসেইন বলেন, ব্র্যাক সবসময় প্রান্তিক মানুষের জন্য কাজ করে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরাও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ। এই কর্মশালায় অংশীজনদের দেওয়া পরামর্শ ও মতামত পর্যালোচনা করে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সহজ ও প্রবেশগম্য সেবা নিশ্চিত করতে ব্র্যাক কাজ করে যাবে।

ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক শাশ্বতী বিপ্লব বলেন, দেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার নিয়ে অনেক আইন ও নীতিমালা রয়েছে। কিন্তু এর বেশিরভাগই ঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয় না। এসব আইন ও নীতিমালার কিছুটা হলেও বাস্তবায়ন করা গেলে অনেক সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হতো।

ব্র্যাকের অ্যাডভোকেসি ফর সোশ্যাল চেঞ্জ কর্মসূচির সহযোগী পরিচালক নাফিউল হাসান বলেন, প্রবেশাধিকার কোনো বিশেষ সুযোগ বা অনুগ্রহ নয়, এটি অধিকার। ইতিমধ্যে দেশের চারটি রেল স্টেশনের প্রবেশের সুযোগ পর্যালোচনা করে কিছু সমস্যা চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিসহ সবার জন্য সহজ ও বাধামুক্ত রেলসেবা নিশ্চিত করতে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।

বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিঃ মহাপরিচালক (অপারেশন) মোহাম্মদ নাজমুল ইসলাম স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন। তিনি বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবান্ধব রেলওয়ে গড়ে তুলতে আমরা সচেষ্ট। এরই মধ্যে বেশকিছু উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। নতুন রেলস্টেশন নির্মাণ ও নতুন কোচ কেনার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির কথা চিন্তা করা হচ্ছে। মহাপরিকল্পনা সংশোধনেও বিষয়টি গুরুত্ব পাবে বলেও তিনি জানান।

রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. রূপম আনোয়ার ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে বক্তব্য দেন। এ ছাড়া রেলওয়ের প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তা প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলাম, সেন্টার ফর ডিজঅ্যাবিলিটি ইন ডেভেলপমেন্ট (সিডিডি)-এর সহকারী পরিচালক আনিকা রহমান লিপি এবং ব্র্যাকের প্রতিবন্ধী ও উন্নয়নবিষয়ক পরামর্শক ডা. নাফিসুর রহমান রেলসেবায় প্রবেশাধিকার নিয়ে করা সমীক্ষার ফলাফল ও তথ্য তুলে ধরেন।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও তাঁদের সংগঠনের প্রতিনিধিরাও কর্মশালায় অংশ নিয়ে মতামত তুলে ধরেন। তাঁরা বলেন, প্রবেশগম্যতাকে কোনো অতিরিক্ত সুবিধা হিসেবে নয়, বরং রেলসেবার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে নিশ্চিত করতে হবে।

তাঁরা আরও বলেন, দৃষ্টি, শ্রবণ, শারীরিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধিতার ধরন অনুযায়ী মানুষের প্রয়োজনও ভিন্ন। সেজন্য রেলস্টেশন, প্ল্যাটফর্ম, ট্রেনের কোচ, টিকিট কাউন্টার, তথ্যব্যবস্থা ও অন্যান্য সেবা তৈরির সময় এসব বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে। নতুন অবকাঠামো নির্মাণ ও নকশার শুরু থেকেই সবার জন্য প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করার দাবি জানান তাঁরা।

অনুষ্ঠানে সরকারি ও বাংলাদেশ রেলওয়ের কর্মকর্তা, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, তাঁদের প্রতিনিধি, দেশি-বিদেশি উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধি, উন্নয়নকর্মী, গবেষক, প্রকৌশলী, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন।

(পিআর/এসপি/আগস্ট ১৮, ২০২৬)