স্টাফ রিপোর্টার : দীর্ঘ ৩৫ বছর পর সংসদ সদস্যদের সরাসরি ভোটে ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) জাতীয় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষে এ ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলবে।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) প্রেসিডেন্ট কর্নেল (অব.) অলি আহমদ।

নির্বাচনী কর্তা হিসেবে সিইসি, সচিবসহ ২০ সহায়ক কর্মকর্তা
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দীন নির্বাচনী কর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তার সঙ্গে নির্বাচন কমিশন সচিবসহ মোট ২০ জন সহায়ক কর্মকর্তা ভোটগ্রহণের কাজে দায়িত্ব পালন করছেন।

নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত ব্যবস্থাপনায় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ভোটগ্রহণ থেকে শুরু করে ব্যালট গণনা ও ফলাফল প্রস্তুতের পুরো প্রক্রিয়ায় এসব কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করবেন।

ভোটগ্রহণকালে প্রচার-প্রচারণা নিষিদ্ধ
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটগ্রহণ চলাকালে কোনো প্রার্থী বা তার পক্ষে প্রচার-প্রচারণা চালানো যাবে না। ভোটকেন্দ্রের ভেতরে কিংবা নির্ধারিত এলাকার মধ্যে প্রার্থীর পক্ষে ভোট চাওয়া, প্রচার চালানো বা কোনো ধরনের নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনা নিষিদ্ধ।

ভোটগ্রহণের পরিবেশ শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষ রাখতে এ সময় প্রার্থীদের সমর্থকদেরও কোনো ধরনের প্রচারণা থেকে বিরত থাকতে হবে। ভোটার সংসদ সদস্যরা যাতে কোনো ধরনের প্রভাব বা চাপ ছাড়াই গোপন ব্যালটে ভোট দিতে পারেন, সে বিষয়েও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

দলের সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দিলে এমপি পদ হারানোর শঙ্কা
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর বাইরে গিয়ে ভোট দিলে সংসদ সদস্যের সদস্যপদ নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো রাজনৈতিক দলের মনোনয়নে নির্বাচিত সংসদ সদস্য দল থেকে পদত্যাগ করলে কিংবা সংসদে দলের বিপক্ষে ভোট দিলে তার সংসদ সদস্য পদ শূন্য হবে।

তবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট প্রকাশ্য ব্যালটে হওয়ায় কোন সংসদ সদস্য কোন প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন, তা সরাসরি শনাক্ত করার যাবে। ফলে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট পড়েছে কি না, তা ভোটের ফলাফলে জানা যাবে।

৩৫ বছর পর আবার ব্যালটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন
৩৫ বছর পর এবারই প্রথম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটগ্রহণ হচ্ছে। ১৯৯১ সালের নির্বাচনের পর অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী না থাকায় সংসদ সদস্যদের ভোট দেওয়ার প্রয়োজন হয়নি।

১৯৯১ সালে বিএনপির প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস ও আওয়ামী লীগের প্রার্থী বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরীর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছিল। ওই নির্বাচনে আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৭২ ভোট পেয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী বদরুল হায়দার চৌধুরী পেয়েছিলেন ৯২ ভোট।

ভোটার ৩৪৯ সংসদ সদস্য
এবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দেওয়ার কথা রয়েছে ৩৪৯ জন সংসদ সদস্যের। জাতীয় সংসদের মোট ৩৫০টি আসনের মধ্যে একটি আসন শূন্য থাকায় ভোটার সংখ্যা ৩৪৯ জনে দাঁড়িয়েছে।

সংসদ সদস্যরাই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের নির্বাচকমণ্ডলী। সংবিধান অনুযায়ী, সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।

মির্জা ফখরুলের পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা
সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার দিক থেকে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এগিয়ে রয়েছেন। বিএনপির রয়েছে ২৪৭ জন সংসদ সদস্য। অন্যদিকে অলি আহমদকে সমর্থন করছে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। এই জোটের সংসদ সদস্য সংখ্যা ৯০।

ফলে সংসদীয় ভোটের হিসাব অনুযায়ী মির্জা ফখরুলের জয়ের সম্ভাবনাই বেশি। তবে ভোটগ্রহণের মধ্য দিয়ে দুই প্রার্থীর প্রকৃত ভোটসংখ্যা জানা যাবে।

কেন প্রার্থী অলি আহমদ
জয়ের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকলেও অলি আহমদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেনি ১১ দলীয় জোট। জোটের নেতারা বলছেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করা এবং সংসদে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির অবস্থান তুলে ধরাই তাদের অন্যতম উদ্দেশ্য।

তাদের মতে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিরোধী পক্ষের প্রার্থী থাকা গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অলি আহমদ কত ভোট পান, সেটিও জোটের রাজনৈতিক অবস্থান ও সংসদীয় শক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হবে।

ভোট শেষে ফল ঘোষণা
ভোটগ্রহণ শেষে ব্যালট গণনা করা হবে। এরপর নির্বাচনী কর্তা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করবেন।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে যে প্রার্থী মোট নির্বাচকমণ্ডলীর সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পাবেন, তিনিই নির্বাচিত হবেন। এবার ৩৪৯ জন ভোটারের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন হবে অন্তত ১৭৫ ভোট। এরপর রাতের মধ্যে গেজেটও প্রকাশ করা হবে।

ফলের দিকে রাজনৈতিক মহলের নজর
সংখ্যার হিসাবে মির্জা ফখরুল এগিয়ে থাকলেও এবারের নির্বাচনের বিশেষ গুরুত্ব ভোটের ফলাফলে। দীর্ঘ ৩৫ বছর পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদ সদস্যরা ভোট দিচ্ছেন। ফলে কে কত ভোট পেলেন, বিশেষ করে অলি আহমদ ১১ দলীয় জোটের নির্ধারিত ৯০ ভোটের বাইরে কোনো ভোট পান কি না-সেদিকেও রাজনৈতিক মহলের নজর রয়েছে।

১৯৯১ সালের পর আবারও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটের মধ্য দিয়ে দেশের সংসদীয় রাজনীতিতে একটি দীর্ঘ বিরতির অবসান ঘটছে। এখন দেখার বিষয়, ২০২৬ সালের এই নির্বাচনে দুই প্রার্থীর ভোটের ব্যবধান কত হয় এবং ৩৫ বছর পর অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ফলাফল কী দাঁড়ায়।

২৪ জুলাই ২২তম রাষ্ট্রপতি অসুস্থতা দেখিয়ে পদত্যাগ করলে ৬ আগস্ট শূন্য পদে নির্বাচনের জন্য ২০ আগস্ট ভোটের তারিখ রেখে তফসিল ঘোষণা করে ইসি। বিএনপি ও সমমনাদের প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী এবং লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি)-এর প্রেসিডেন্ট অলি আহমদ মনোনয়নপত্র জমা দেন। বাছাইয়ে বৈধ হলে কোনো প্রার্থীই প্রার্থিতা প্রত্যাহার না করায় ভোটগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি হয়।

(ওএস/এএস/আগস্ট ২০, ২০২৬)