ইমরান হোসাইন, সিরাজগঞ্জ : প্রত্যন্ত গ্রামের মাটির ঘর থেকে উঠে আসা একদল তরুণী। কারও জীবনে অভাব-অনটন, কারও সামনে সামাজিক বাধা, আবার কারও জন্য সুযোগ-সুবিধার সংকট। তবুও কোনো কিছুই থামাতে পারেনি তাদের। জাতীয় দলের জার্সি গায়ে দেশের হয়ে মাঠে নামার স্বপ্নে প্রতিদিন ভোরেই ফুটবল নিয়ে মাঠে ছুটে আসে তারা। সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার নিমগাছি হাই স্কুল মাঠে প্রতিদিন সকাল হলেই দেখা মেলে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রমিলা ফুটবল একাডেমির মেয়েদের। প্রচণ্ড রোদ কিংবা ক্লান্তি—কোনো কিছুই তাদের অনুশীলন থেকে সরাতে পারে না। দৌড়, শরীরচর্চা, বল নিয়ন্ত্রণ, পাসিং, ড্রিবলিং, শুটিং ও গোলকিপিংসহ নানা কৌশলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলে কঠোর অনুশীলন। তাদের কাছে ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়; এটি স্বপ্ন দেখার সাহস, নিজের পরিচয় তৈরি এবং সমাজের চোখে নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণের লড়াই। রায়গঞ্জের বিভিন্ন প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে প্রতিদিন মাঠে ছুটে আসে এসব তরুণী। অনেকের নেই উন্নতমানের ক্রীড়া সরঞ্জাম, নেই পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবারের নিশ্চয়তা। তারপরও স্বপ্নের কাছে এসব সীমাবদ্ধতা যেন তুচ্ছ।

খেলোয়াড়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, লেখাপড়ার পাশাপাশি নিয়মিত অনুশীলন করে নিজেদের দক্ষ করে তুলছেন তারা। তাদের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা, এই একাডেমি থেকেই উঠে আসা কয়েকজন খেলোয়াড়ের জাতীয় ও বড় পর্যায়ের দলে খেলার সাফল্য। খেলোয়াড় নিবেদিতা রানী মাহাতো ও বর্ষা মাহাতো বলেন, ফুটবল তাদের কাছে শুধু খেলা নয়, এটি তাদের স্বপ্ন। ভালো প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা পেলে একদিন বড় পর্যায়ে খেলতে চান তারা। দেশের হয়ে মাঠে নামার স্বপ্নও রয়েছে তাদের।

প্রিথা মাহাতো ও মোহনা উরাও জানান, তাদের একাডেমি থেকে অয়ন্ত বালা মাহাতো ও তিথী রানী মাহাতো জাতীয় পর্যায়ে সুযোগ পেয়েছেন। এছাড়া অনামিকা উরাও ফুটসাল লিগে খেলছেন। তাদের মতো তারাও জাতীয় পর্যায়ে নিজেদের জায়গা করে নিতে চান। তাদের ভাষ্য, প্রতিদিন মাঠে ঘাম ঝরিয়ে নিজেদের আরও ভালো খেলোয়াড় হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন তারা। সুযোগ পেলে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মেয়েরাও দেশের ক্রীড়াঙ্গনে অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারে এটাই তারা প্রমাণ করতে চান।
তবে প্রতিভা থাকলেও সুযোগ-সুবিধার ঘাটতিই তাদের সবচেয়ে বড় বাধা।

খেলোয়াড় সুষমিতা রানী মাহাতো ও সঞ্চীতা উরাও বলেন, নিয়মিত প্রশিক্ষণের পাশাপাশি উন্নতমানের ক্রীড়া সরঞ্জাম, অনুশীলনের উপযোগী মাঠ, পুষ্টিকর খাবার এবং বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগ প্রয়োজন। তাদের প্রত্যাশা, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ক্রীড়ানুরাগী ও সমাজের বিত্তবানরা এগিয়ে এলে তাদের স্বপ্নের পথ আরও সহজ হবে।

এই মেয়েদের স্বপ্নপূরণের পেছনে নীরবে কাজ করে যাচ্ছেন প্রশিক্ষক ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী প্রমিলা ফুটবল একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা-পরিচালক নিহারঞ্জন। তিনি জানান, ২০১০ সাল থেকে বিনা পারিশ্রমিকে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মেয়েদের ফুটবল প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছেন তিনি। বর্তমানে তার একাডেমিতে প্রায় ৬০ জন মেয়ে খেলোয়াড় রয়েছে। প্রতিদিন সকাল ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত নিমগাছি হাই স্কুল মাঠে চলে প্রশিক্ষণ।

নিহারঞ্জন বলেন, মেয়েদের মধ্যে যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। তার কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে অনেক মেয়ে জাতীয় দলসহ দেশের বড় বড় দলে খেলছে। সরকারি সহায়তায় নিয়মিত প্রশিক্ষণ, সঠিক দিকনির্দেশনা, প্রয়োজনীয় ক্রীড়া সামগ্রী ও বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগ পেলে এদের অনেকেই আরও বড় পর্যায়ে যেতে পারবে।

রায়গঞ্জের এই তরুণী ফুটবলারদের কারও স্বপ্ন জেলা পর্যায়ে সুনাম অর্জন, কারও লক্ষ্য বিভাগীয় পর্যায়ে জায়গা করে নেওয়া। আবার কারও চোখে আরও বড় স্বপ্ন—জাতীয় দলের জার্সি গায়ে দেশের হয়ে মাঠে নামা। প্রতিদিন মাঠে তাদের প্রতিটি দৌড়, প্রতিটি পাস আর প্রতিটি শট যেন সেই স্বপ্নপূরণের একেকটি ধাপ। প্রতিভা, পরিশ্রম ও অদম্য ইচ্ছাশক্তি—সবই আছে তাদের। এখন প্রয়োজন শুধু সঠিক প্রশিক্ষণ, প্রয়োজনীয় ক্রীড়া সরঞ্জাম, পুষ্টি এবং নিয়মিত প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ।

সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও সুযোগ পেলে রায়গঞ্জের এই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রমিলা ফুটবলাররাই একদিন শুধু রায়গঞ্জ নয়, সিরাজগঞ্জের নামও জাতীয় ক্রীড়াঙ্গনে উজ্জ্বল করবে।

(আইএইচ/এসপি/আগস্ট ২০, ২০২৬)