পার্বতীপুর প্রতিনিধি : দেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলা ও কয়লা আমদানিনির্ভরতা কমাতে কয়লাখনি থেকে উন্মুক্ত বা ওপেন-পিট পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের আলোচনায় এগোচ্ছে সরকার। অর্থ ও বাণিজ্যমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের দিকে যেতে হচ্ছে সরকার বিষযটি নিয়ে আলোচনায়।

উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের বিরুদ্ধে ২০০৬ সালে গড়ে ওঠা আন্দোলনে কয়লা খনি এলাকার স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠন অংশ নেয়া আন্দোলনকারীদের প্রধান আশঙ্কা ছিল—উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন করা হলে বিপুল পরিমাণ কৃষিজমি, বসতভিটা ও প্রাকৃতিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং বহু মানুষকে স্থানান্তরিত হতে হবে।

জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, দেশে তাপভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য বছরে প্রায় ২০ মিলিয়ন টন বা দুই কোটি টন কয়লা আমদানি করা হয়। উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন করা হলে পূর্ণ সক্ষমতায় বছরে প্রায় ১৫ মিলিয়ন টন কয়লা এর বেশী উত্তোলন করা সম্ভব হলে আমদানিনির্ভর কয়লার প্রায় ৭৫ শতাংশ স্থানীয় উৎস থেকে পূরণ করা সম্ভব হবে। আমদানিকৃত কয়লা বর্তমানে দেশের ছয়টি বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত হচ্ছে। অন্যদিকে দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি থেকে উত্তোলিত কয়লার পুরোটাই ওই এলাকায় স্থাপিত তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহার করা হয়।

সম্প্রতি আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (অ্যামচেম) আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মিশ্রণ নিয়ে সরকার মোটামুটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পূর্ণাঙ্গ জ্বালানি নীতি প্রকাশ করা হবে বলেও তিনি জানান।

বাংলাদেশে খনিতে বিপুল পরিমান কয়লার মজুদ রয়েছে, দেশে মোট পাঁচটি কয়লা খনি রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কয়লা মজুদ রয়েছে জয়পুরহাটের জামালগঞ্জে, এ খনিতে কয়লার মজুদ রয়েছে ৫ হাজার ৪৫০ মিলিয়ন টন। রংপুরের খালাশপীরে মজুদ রয়েছে ৬৮৫ মিলিয়ন টন। দিনাজপুরের দিঘিপাড়ায় ৭০৬ মিলিয়ন টন এবং বড়পুকুরিয়ায় ৪১০ মিলিয়ন টন। ফুলবাড়ী কয়লা খনিতে ৫৭২ মিলিয়ন টন কয়লার মজুদ রয়েছে। এ খনি থেকে ৪৭২ মিলিয়ন টন কয়লা উত্তোলন করা যাবে, এ খনিতে ২৪০ মিটার মাটির নিচেই কয়লা, যা খুব কাছাকাছি। দেশের বিপুল পরিমাণ এ কয়লা সম্পদ উত্তোলন নিয়ে বিভিন্ন সরকার কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি।

উন্মুক্ত পদ্ধতিতে (ওপেন-পিট) কয়লা উত্তোলনের আলোচনা নতুন করে সামনে আসায় ২০০৬ সালের ঐতিহাসিক কয়লাখনি বিরোধী আন্দোলনের প্রসঙ্গ আবারও আলোচনায় এসেছে। সম্প্রতি অর্থ ও বাণিজ্যমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ফুলবাড়ীসহ অন্যান্য স্থানে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের দিকে যাওয়ার কথা বলার পর স্থানীয়ভাবে বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

প্রায় দুই দশক পর আবারও দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের আলোচনা সামনে আসায় স্থানীয় পর্যায়ে নতুন করে উদ্বেগ, ক্ষোভ ও আলোচনা শুরু হয়েছে। সরকারের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় ফুলবাড়ীসহ দেশের কয়লাখনিগুলো থেকে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের বিষয়টি আলোচনায় আসার পর স্থানীয় বাসিন্দা ও বিভিন্ন রাজনৈতিক-সামাজিক সংগঠন বিষয়টি নিয়ে সরব হয়ে উঠেছে।

সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী দেশের জ্বালানি ও গ্যাস–সংকট মোকাবিলায় দিনাজপুরের ফুলবাড়ী কয়লা খনি থেকে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের ঘোষণা দিয়েছেন। বিষয়টি উল্লেখ করে আনু মুহাম্মদ বলেন, এর প্রতিবাদে দেশের জ্বালানি–সংকট সমাধান, রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানা ও জ্বালানি খাতের বেসরকারীকরণ বন্ধ, ওষুধের সরকারি মূল্যনিয়ন্ত্রণ কার্যকর এবং মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি বাতিলসহ ছয় দফা দাবিতে গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি ২৪ আগস্ট ঢাকা থেকে ফুলবাড়ীর উদ্দেশে ‘প্রচার যাত্রা’ শুরু করবে এবং ২৬ আগস্ট ফুলবাড়ীতে গণসমাবেশ করবে। ফলে ২৬ আগস্ট কয়লা উন্মুক্ত পদ্ধতিতে উত্তোলনের ইস্যুতে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে আরও বড় ধরনের আলোচনা ও কর্মসূচির সম্ভাবনা আছে।

সর্বশেষ গত বুধবার (১৯ আগস্ট) রাতে ফুলবাড়ী পৌর শহরের নিমতলা মোড়ে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লাখনি করার প্রস্তাবের প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে গণসংহতি আন্দোলন। সংগঠনের নেতা-কর্মীরা প্রথমে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। পরে নিমতলা মোড়ে প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

(আর/এসপি/আগস্ট ২০, ২০২৬)