মোঃ আব্দুল্লাহ আল মামুন লাভলু


২০০৪ সালের ২১শে আগস্টের সেই অপরাহ্ণ। রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগ আয়োজিত সন্ত্রাসবিরোধী শান্তি সমাবেশের শেষ বিকেলের বিষণ্ণ আলো তখনো মেলায়নি; ঠিক তখনই আকস্মিক ও বিকট বিস্ফোরণে থমকে গিয়েছিল পুরো দেশ। খোলা ট্রাকে নির্মিত মঞ্চে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনা বক্তব্য শেষ করে নামার ঠিক নিভু নিভু ক্ষণটিতে, চতুর্দিক থেকে পৈশাচিক হুঙ্কারে আছড়ে পড়ে সামরিক বাহিনীর ১৩টি বিধ্বংসী আর্জেস গ্রেনেড। মাত্র দেড় মিনিটের সেই নারকীয় তাণ্ডবে এক শান্ত ও কোলাহলমুখর রাজপথ মুহূর্তে পরিণত হয় ধোঁয়া, তাজা রক্ত আর ছিন্নভিন্ন মানবদেহের রক্তস্নাত এক মৃত্যুপুরীতে। ঘাতকদের প্রধান নিশানা থেকে শেখ হাসিনাকে বাঁচাতে জ্যেষ্ঠ নেতারা নিজেদের শরীরকে বাজি রেখে তৈরি করেছিলেন এক অভূতপূর্ব ও জীবনরক্ষাকারী মানববলয়। সেদিন শেখ হাসিনা অলৌকিকভাবে বেঁচে গেলেও, নিজের দেহ দিয়ে রক্তস্নাত মানবঢাল রচনা করা ঢাকার প্রথম নির্বাচিত মেয়র মোহাম্মদ হানিফ মাথায় ও শরীরে অসংখ্য স্প্লিন্টারের চিরন্তন ক্ষত নিয়ে পরবর্তীতে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় চিরতরে ঢলে পড়েন মৃত্যুর কোলে।

মেয়র হানিফের সেই আত্মত্যাগের রক্তে ভেসে গিয়েছিল পুরো সমাবেশস্থল, যার সঙ্গে মিশে যায় আরও ২৩টি তাজা প্রাণের রক্তধারা। সেদিনের সেই বর্বরোচিত হামলায় বাংলাদেশ মহিলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভানেত্রী আইভি রহমান, ঢাকা মহানগর নেতা মোশতাক আহমেদ সেন্টু, আদাবর থানা সভাপতি রফিকুল ইসলাম, যুবলীগ নেতা লতিফুল বারী ট্রুমান, বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল কুদ্দুস পাটোয়ারী এবং শেখ হাসিনার নিরাপত্তারক্ষী ল্যান্স কর্পোরাল (অব.) মাহবুবুর রশীদ সহ ২৪ জন নিবেদিতপ্রাণ রাজনৈতিক কান্ডারী অকালে প্রাণ হারান। আর পাঁচ শতাধিক নিরপরাধ মানুষ শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিদ্ধ স্প্লিন্টার আর পঙ্গুত্বের যন্ত্রণাদায়ক ভার বহন করে আজও বয়ে বেড়াচ্ছেন সেদিনের বিষাদময় স্মৃতির ক্ষত।

এই রক্তগঙ্গার গভীর ঐতিহাসিক উৎস সন্ধান করলে স্পষ্ট বোঝা যায়—এ কেবল আকস্মিক কোনো হত্যাকাণ্ড ছিল না; বরং শেখ হাসিনাসহ শীর্ষ নীতি-নির্ধারকদের একমঞ্চে উচ্ছেদ করে একটি পুরো রাজনৈতিক মতাদর্শকে চিরতরে নেতৃত্বশূন্য ও অস্তিত্বহীন করে তোলাই ছিল এই ষড়যন্ত্রের মূল দর্শন। মূলত, ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা এবং ৩রা নভেম্বর জেলখানায় চার জাতীয় নেতাকে পৈশাচিকভাবে নির্মূল করার মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রগতিশীল ও অসাম্প্রদায়িক ধারাকে স্তব্ধ করার যে চক্রান্ত শুরু হয়েছিল, ২১শে আগস্টের ঘটনাটি ছিল তারই রক্তাক্ত ধারাবাহিকতা। ১৯৯৯ সালে যশোরের উদীচী হামলা, ২০০০ সালে কোটালীপাড়ায় বোমা পুঁতে রাখার চক্রান্ত এবং ২০০১ সালে রমনার বটমূলে রক্তপাতের পর রাজপথের মূল সাংগঠনিক স্তম্ভকে ভেঙে দিতেই ২০০৩ সালে খুলনার মঞ্জুরুল ইমাম, নাটোরের মমতাজ উদ্দিন এবং ২০০৪ সালের মে মাসে জনপ্রিয় শ্রমিক নেতা ও সংসদ সদস্য আহসানউল্লাহ মাস্টারকে প্রকাশ্যে হত্যা করা হয়।

প্রতিপক্ষকে সশরীরে মুছে ফেলার এই দীর্ঘ নীলনকশাই ২০০৪ সালের ২১শে আগস্টে এসে পায় প্রত্যক্ষ রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা। তৎকালীন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু, রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এবং নিষিদ্ধ উগ্রবাদী সংগঠন ‘হারকাতুল জিহাদ’ (হুজি)-এর অশুভ মেলবন্ধনে রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে চালানো হয় এই ভয়াবহ গণহত্যা। শুধু তা-ই নয়, হামলার পর দ্রুত আলামত মুছে ফেলা, আহতদের চিকিৎসায় বাধা প্রদান এবং 'জজ মিয়া নাটক' সাজিয়ে আসল অপরাধীদের আড়াল করার নির্লজ্জ অপচেষ্টা প্রমাণ করে যে, এটি ছিল সুপরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে দীর্ঘায়িত করার পরিণতিতেই পরবর্তীতে ২০০৫ সালের ২৭শে জানুয়ারি হবিগঞ্জে গ্রেনেড হামলায় প্রাণ হারান আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অর্থনীতিবিদ ও সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া এবং একই বছরের ১৭ই আগস্ট দেশের ৬৩টি জেলায় একযোগে ঘটানো হয় নজিরবিহীন সিরিজ বোমা হামলা।

রাজপথের এই রক্তাক্ত চক্রান্তের পর আদালতের কাঠগড়ায় শুরু হয় দীর্ঘ ও জটিল আইনি লড়াই। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০১৮ সালের ১০ই অক্টোবর বিচারিক আদালত লুৎফুজ্জামান বাবর ও আবদুস সালাম পিন্টুসহ ১৯ জনের মৃত্যুদণ্ড এবং তারেক রহমানসহ ১৯ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করেছিলেন। তবে বিচার প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে হাইকোর্ট বিভাগ সাক্ষ্য-প্রমাণের ঘাটতি ও আইনি প্রক্রিয়ার ব্যত্যয় উল্লেখ করে নিম্ন আদালতের সেই সাজা বাতিল করে সংশ্লিষ্ট আসামিদের খালাস প্রদান করেন। বর্তমানে রাষ্ট্রপক্ষ হাইকোর্টের এই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল করার সিদ্ধান্ত নেওয়ায়, ন্যায়বিচারের অন্তিম ফয়সালা এখন দেশের সর্বোচ্চ বিচারালয়ে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

আইনি আদালতের বাইরে রাজনৈতিক ও কৌশলগত প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৯৭৫ থেকে ২০০৪ হয়ে ২০২৪ সালের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন—প্রতিটি অধ্যায়ই প্রতিপক্ষ নির্মূলের একই পৈশাচিক সুতোয় বাঁধা। ২০০৪ সালে যে পরাজিত রাজনৈতিক ও উগ্রবাদী চক্র সরাসরি সামরিক গ্রেনেড ও রাষ্ট্রীয় বল প্রয়োগ করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করতে চেয়ে ব্যর্থ হয়েছিল, দুই দশক পর ২০২৪ সালে এসে তারা তাদের চক্রান্তের কৌশলগত রূপান্তর ঘটায়। সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত ও অরাজনৈতিক আন্দোলনকে পেছনের চক্রান্তকারীরা সুচতুরভাবে নিজেদের রাজনৈতিক 'বর্ম ও ঢাল' হিসেবে ব্যবহার করে। সরাসরি দলীয় ব্যানারে যা অর্জন করা সম্ভব ছিল না, তরুণদের নির্ভেজাল আবেগকে সামনে রেখে রাষ্ট্রকে অচল করা এবং শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে রাজপথ থেকে উপড়ে ফেলার সেই বহু পুরোনো ধ্বংসাত্মক উদ্দেশ্যকেই তারা নতুন মোড়কে বাস্তবায়ন করেছে।

২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা দিবসের এই স্মারক লগ্নে দাঁড়িয়ে ১৯৭৫ সালের গণহত্যা, ২০০৪ সালের রক্তগঙ্গা কিংবা ২০২৪ সালে শিক্ষার্থীদের আবেগকে রাজনৈতিক ঢাল বানিয়ে তাণ্ডব চালানো—প্রতিটি অধ্যায়ই আমাদের সতর্ক করে দেয়। এগুলো প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশে প্রতিপক্ষকে গণতান্ত্রিকভাবে মোকাবিলা না করে শারীরিকভাবে নির্মূল করা বা তরুণ প্রজন্মের কাঁধে বন্দুক রেখে লক্ষ্য অর্জনের চক্রান্ত একই প্রবৃত্তি থেকে উৎসারিত। রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ মেটাতে রাজপথকে বারবার তাজা রক্তে ভাসানোর এই আত্মঘাতী অপসংস্কৃতি থেকে আমরা যদি বেরিয়ে আসতে না পারি, তবে একটি সভ্য, স্বনির্ভর ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি বারবার একইভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হতে থাকবে।

লেখক : একজন কবি।