ঘটনা ধামা চাপা দিতে সাংবাদিকদের নিয়ে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের দফারফা
কালিগঞ্জের এআই ক্লিনিকে ডাঃ তানিয়ার ভুল সিজারে রোগী সাবিনার মৃত্যু
রঘুনাথ খাঁ, সাতক্ষীরা : কোন বিশেষজ্ঞ এনেসথেসিয়া ছাড়া সিজার করতে যেয়ে সাবিনা খাতুন নামের এক অন্তঃস্বত্বা নারীর মৃত্যু হয়েছে। গতকাল বুধবার সকালের দিকে সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলা সদরের এআই ক্লিনিকে এ ঘটনা ঘটে। মৃত সাবিনা খাতুন কালিগঞ্জ উপজেলার গোবিন্দপুর গ্রামের কওছার আলীর স্ত্রী।
কালিগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী বাগমারি গ্রামের আনারুল ইসলাম জানান, তার চাচাত বোন গোবিন্দপুর গ্রামের কওছার আলীর স্ত্রী সাবিনাকে অস্ত্রপচারের মাধ্যমে দ্বিতীয় সন্তান প্রসব করাতে স্থানীয় চিকিৎসক রেজাউল ইসলামের পরামর্শে কালিগঞ্জ উপজেলা সদরের শাহাবুদ্দিন ও ময়নার মালিকানাধীন এআই ক্লিনিকে মঙ্গলবার রাতে ভর্তি করা হয়। ১৫ হাজার টাকা চুক্তির পর টাকা জমা দিয়ে ডাঃ তানিয়া সুলতানা সিজার করবেন মর্মে ক্লিনিক মালিক শাহাবুদ্দিন তাদেরকে নিশ্চিত করেন। এনেসথেসিয়া ডাক্তার হিসেবে কালিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সজীব দায়িত্ব পালন করবেন বলে তাদেরকে অবহিত করা হয়। সে অনুযায়ি বুধবার সকাল ১১টার দিকে সাবিনাকে ক্লিনিকের অপারেশন থিয়েটারে নেওয়া নেওয়া হয়।
আনারুল ইসলামের অভিযোগ, কালিগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এনেসথেসিয়া ডাক্তার সজীবের পরিবর্তে ডাঃ তানিয়া সুলতানা নিজেই সাবিনাকে এনেসথেসিয়া দিয়ে অপারেশন শুরু করলে সে হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে পড়ে। এ সময় ক্লিনিক কর্তপক্ষকে বিষয়টি জানালে শাহাবুদ্দিন ও ময়না তড়িঘড়ি করে সাবিনাকে এম্বুলেন্সে করে কালিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। বিষয়টি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কালিগঞ্জ থানাকে অবহিত করেন। সিভিল সার্জন ডাঃ আব্দুস সালামকে অবহিত করা হয়। সিভিল সার্জন অফিস থেকে এক কর্মকর্তাকে ওই ক্লিনিকে পাঠালে তার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করা হয়। পরে কর্তৃপক্ষ ক্লিনিকে তালা মেরে কেটে পড়ে। স্থানীয় গণমাধ্যম কর্মীদের একাংশ বিশেষ ব্যবস্থায় ডাঃ তানিয়া ও ক্লিনিক মালিকদের বাঁচাতে কোন সংবাদ মাধ্যমে নিউজ না করার জন্য তারা মরিয়া হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে সাবিনার বাবা ও মাকে ডেকে এনে শ্বশুর ও শাশুড়ির সামনে লাশ ময়নাতদন্ত না করে দাফন করার সিদ্ধান্ত নেয়। এ সময় গোবিন্দপুরের ইউপি সদস্য ফারুক হোসেনকেও ডাকা হয়। পরে পুলিশের আপত্তি থাকার পরও গণমাধ্যম কর্মীদের ইচ্ছায় সাবিনার লাশ তার শ্বশুর ও স্বামীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। বিকেল পৌনে ৫টার দিকে সাবিনার লাশ ময়না তদন্ত ছাড়াই তার শ্বশুর বাড়ির পারিবারিক কবরস্থনে দাফন করা হয়। ফলে দেড় লক্ষাধিক টাকায় দফারফার মাধ্যমে সাবিনার মৃত্যর খবর কোন পত্রিকা বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ পায়নি।
এ ব্যাপারে কালিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এনেসথেসিয়া ডাঃ সজীব হোসেন জানান, এআই ক্লিনিক থেকে হাসপাতালে নিয়ে আসার পর সাবিনা খাতুন নামের এক প্রসুতি মারা যায় বলে তিনি জেনেছেন।
গোবিন্দপুরের গ্রাম ডাঃ রেজাউল ইসলাম বলেন, সিজারের সময় সাবিনা মারা গেছে বলে তিনি জেনেছেন। তবে বিষয়টি নিয়ে সাংবাাদিক ও একটি মহল সমাধান করে ফেলায় ময়না তদন্ত ছাড়া লাশের দাফন হয়েছে।
গোবিন্দপুর ইউপি সদস্য ফারুক হোসেন জানান, তার উপস্থিতিতে সাংবাদিক, মৃতের বাবা, মা ও শ্বশুর বাড়ির লোকজন একত্র হয়ে বিষয়টি সমাধান করেছেন।
এ ব্যাপারে বাগমারা গ্রাম পুলিশ হরিপদ মৃধা জানান, তিনি বিষয়টি জানলেও প্রকৃত ঘটনা মৃতের স্বজনরাই বলতে পারেন।
কালিগঞ্জ এআই ক্লিনিকের ডাঃ তানিয়া সুলতানার কাছে তার মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনি তার পরিচয় অস্বীকার করে ঘটনার ব্যাপারে তিনি কিছুই জানেন না বলে জানান।
এআই ক্লিনিকের মালিক মোঃ শাহাবুদ্দিন তার ক্লিনিকে সাবিনা নামে কোন রোগী ভুল চিকিৎসায় মারা যাওয়ার কথা অস্বীকার করে বলেন, নদীর ওপারে এ ধরণের ঘটনা ঘটেেেছ মর্মে তিনি শুনেছেন।
কালিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডাঃ ডালিয়া আক্তার সাথী জানান, এআই ক্লিনিক থেকে হাসপাতালে নিয়ে আসার আগেই সাবিনার মৃত্যু হয়েছে। ঘটনার বাস্তবতা জেনে তিনি থানাকে অবহিত করে সাবিনার লাশ পুলিশে সোপর্দ করেন।
সাতক্ষীরা সিভিল সার্জন অফিসের মেডিকেল অফিসার ডাঃ জয়ন্ত সরকার জানান, কালিগঞ্জের এআই ক্লিনিকে ভুল অপারেশনে সাবিনা নামের এক অন্তঃস্বত্বা মারা যাওয়ার খবর পেয়ে সংশ্লিষ্ট ক্লিনিকে তাদের স্টাফ পাঠানো হয়। ওই স্টাফ যেয়ে কিèনিকে তালা মারা অবস্থায় দেখতে পান। কোন লিখিত অভিযোগ না থাকায় তারা ওই ক্লিনিকের বিরুদ্বে ব্যবস্থা নিতে পারেন নি। বিষয়টি নিয়ে কোন ব্যবস্থা না নেওয়ার জন্য কালিগঞ্জের একটি সাংবাদিক প্রতিষ্ঠানের সভাপতি পরিচয়ে সিভিল সার্জন স্যারকে ফোন করেছিলেন বলে জানান তিনি।
কালিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ শাহীনুর রহমান জানান, এ ধরণের ঘটনা তার জানা নেই।
(আরকে/এসপি/আগস্ট ২০, ২০২৬)
