নকশায় আবাসিক, বাস্তবে দোকান-গোডাউন: সিডিএর নোটিশের পরও চলছে বাণিজ্য
জে.জাহেদ, চট্টগ্রাম : চট্টগ্রাম নগরের আগ্রাবাদে অনুমোদিত আবাসিক নকশার বাইরে ভবন নির্মাণ করে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে একটি জমির মালিকদের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, অনুমোদিত নকশায় ‘আধা-পাকা আবাসিক ইমারত’ নির্মাণের কথা থাকলেও বর্তমানে সেখানে দুই তলা পাকা ভবন, গোডাউন ও একাধিক দোকান রয়েছে।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) নথি ও জারি করা নোটিশে ভবনটির অনুমোদিত নকশা এবং পরবর্তী ব্যবহারের মধ্যে অসঙ্গতির বিষয়টি উঠে এসেছে। তবে নোটিশ জারির পরও কথিত অননুমোদিত নির্মাণ ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ না হওয়ায় সিডিএর কার্যকর তদারকি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সিডিএর সদস্য-সচিবের কার্যালয় থেকে ইস্যু করা গৃহ নির্মাণ নথি নম্বর ১০৩৪/২০০০-২০০৫ অনুযায়ী, আগ্রাবাদ মৌজায় বিএস দাগ নম্বর ৯৭০৬ ও পিএস দাগ নম্বর ৪৩৯৪-এর প্রায় পৌনে পাঁচ কাঠা জমিতে একটি আধা-পাকা আবাসিক ইমারত নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল।
অনুমতিপত্রে অনুমোদিত নকশা অনুসরণ করার বাধ্যবাধকতাও রয়েছে। কিন্তু সরেজমিনে দেখা গেছে, ওই স্থাপনায় আবাসিক ব্যবহারের পাশাপাশি নিচতলায় বড় ধরনের গোডাউন ও রাস্তার পাশে একাধিক দোকান পরিচালিত হচ্ছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, এসব দোকান ভাড়া দেওয়া হয়েছে এবং এর বিনিময়ে অগ্রিম সালামি ও মাসিক ভাড়া আদায় করা হচ্ছে।
ভবনটির বিষয়ে সিডিএর অথরাইজেশন শাখা থেকে একাধিকবার নোটিশ দেওয়া হয়েছে। গত বছরের ২৭ অক্টোবর ও ৩০ নভেম্বর অথরাইজড অফিসার-২ তানজিব হোসেনের স্বাক্ষরে সামছুন নাহার বেগমের নামে কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠানো হয়।
নোটিশে বলা হয়, সিডিএর দায়িত্বপ্রাপ্ত ইমারত পরিদর্শক সরেজমিনে একাধিকবার পরিদর্শন করেন। এ সময় অনুমোদিত নকশা প্রদর্শনের অনুরোধ করা হলেও তা দেখাতে ব্যর্থ হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়।
নোটিশে সাত দিনের মধ্যে বৈধ অনুমতিপত্র ও অনুমোদিত নকশা দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নথি দাখিল না করলে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানানো হয়।
কিন্তু নোটিশ জারির পরও ভবনটির বাণিজ্যিক ব্যবহার অব্যাহত থাকার অভিযোগ রয়েছে। এতে প্রশ্ন উঠেছে—একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থা একাধিকবার নোটিশ দেওয়ার পরও যদি অননুমোদিত নির্মাণ বা ব্যবহার বন্ধ না হয়, তাহলে মাঠপর্যায়ের পরিদর্শন, পরবর্তী ব্যবস্থা এবং নোটিশ বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের ভূমিকা কী ছিল?
স্থানীয় একাধিক সূত্রের অভিযোগ, ভবনটির বাণিজ্যিক কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখতে সিডিএর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মিত অর্থ দেওয়ার একটি ব্যবস্থা রয়েছে। তবে এ অভিযোগের পক্ষে কোনো সরাসরি অর্থ লেনদেনের নথি বা প্রমাণ পাওয়া গেছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
তাই বিষয়টি তদন্তের দাবি রাখে। বিশেষ করে নোটিশ জারির পরও যদি অনুমোদনের বাইরে নির্মাণ ও বাণিজ্যিক ব্যবহার চলতে থাকে, তাহলে সিডিএর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা পরবর্তী সময়ে কী ব্যবস্থা নিয়েছেন—তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
কারণ শুধু নোটিশ জারি করেই নিয়ন্ত্রক সংস্থার দায়িত্ব শেষ হওয়ার কথা নয়। নোটিশের পর আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, সেটিই এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
অভিযোগের বিষয়ে সামছুন নাহার বেগমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, তাঁদের বিরুদ্ধে করা অনিয়মের অভিযোগ ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা’ এবং সিডিএর নিয়ম মেনেই ভবন নির্মাণ করা হয়েছে।
তবে অনুমোদিত নকশার বাইরে দুই তলা ভবন, গোডাউন ও দোকান নির্মাণের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো সদুত্তর না দিয়ে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
অন্যদিকে সিডিএর অথরাইজড অফিসার-২ তানজিব হোসেন জানান তিনি বিষয়টি খোঁজ খবর নেবেন। তারপর সত্যতা পেলে ব্যবস্থা নেবেন।
সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন বলেন, “যেখানে অনিয়ম আর সিডিএর বিধি লঙ্ঘন হবে, সেখানে আইন কার্যকর হবে। কাউকে সুযোগ দেওয়া হবে না। সুন্দর নগরীর স্বার্থে অভিযান চলবেই।”
সিডিএর আরেক প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অনুমোদিত নকশার বাইরে গিয়ে আবাসিক ভবনকে বাণিজ্যিক ব্যবহারে নেওয়া এবং আইনি নোটিশ উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। কোনো কর্মকর্তার গাফিলতি বা অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
এই ঘটনায় মূল প্রশ্ন শুধু ভবন মালিকের অনুমোদনবহির্ভূত নির্মাণ বা বাণিজ্যিক ব্যবহারের অভিযোগে সীমাবদ্ধ নয়। নোটিশ জারির পরও যদি অনিয়ম চলতে থাকে, তাহলে সিডিএর মাঠপর্যায়ের পরিদর্শন ও আইন প্রয়োগের কার্যকারিতাও প্রশ্নের মুখে পড়ে।
অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী ভবন নির্মাণ হয়েছে কি না, বর্তমানে ভবনটির কী ধরনের ব্যবহার হচ্ছে, বাণিজ্যিক ব্যবহারের কোনো অনুমোদন নেওয়া হয়েছে কি না এবং নোটিশের পর সিডিএ কী কী আইনগত পদক্ষেপ নিয়েছে—এসব বিষয়ে নথিভিত্তিক তদন্ত প্রয়োজন।
একই সঙ্গে কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অর্থ লেনদেনের অভিযোগেরও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত। অভিযোগ সত্য হলে দায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা এবং অভিযোগের ভিত্তি না থাকলে সংশ্লিষ্টদের তা স্পষ্ট করার সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন।
নগর পরিকল্পনা ও ভবন ব্যবস্থাপনায় সিডিএর আইন প্রয়োগের বিশ্বাসযোগ্যতা অনেকাংশে নির্ভর করে এমন অভিযোগে সংস্থাটি কতটা দ্রুত, স্বচ্ছ ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেয় তার ওপর।
(জেজে/এসপি/আগস্ট ২১, ২০২৬)
