রিয়াজুল রিয়াজ, বিশেষ প্রতিনিধি : ফরিদপুর জেলা শহরের সমরিতা জেনারেল হাসপাতাল নামে একটি বেসরকারি হাসপাতালে সিজারিয়ান অপারেশনের (অস্ত্রোপচার) সময় কনিকা মন্ডল (৩৬) নামের এক প্রসূতি নাটীর পেটে গজ রেখে সেলাই দেন ওই হাসপাতালে কর্মরত চিকিৎসক ডা. লক্ষ্মী রানী দত্ত। এ ঘটনার দেড় মাস পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে কনিকা মন্ডলের মৃত্যু হয়েছে। চিকিৎসকের এমন ভুলে প্রসুতি গৃহবধূর পরিবারের অভিযোগের খবর বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে বিষয়টি দৃষ্টিগোচরে আসে বর্তমান সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের।

এ ঘটনায় নিহতের পরিবারকে সমবেদনা জানাতে রাজবাড়ীতে নিহতের স্বামীর বাড়ীতে ছুটে যান মন্ত্রী।

আজ শুক্রবার সকালের দিকে রাজবাড়ী জেলার বালিয়াকান্দি উপজেলার বহরপুর ইউনিয়নের বাঘুটিয়া গ্রামে নিহত কণিকা মণ্ডলের স্বামী অশান্ত মণ্ডলের বাড়িতে যান তিনি।

এ সময় নিহতের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান সরকার সাখাওয়াত। তাৎক্ষণিকভাবে পরিবারটিকে ৫০ হাজার টাকা সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি মাতৃহারা এতিম শিশুর পূর্ণ ভরণপোষণের দায়িত্ব সরকার বহন করবে বলেও এসময় প্রতিশ্রুতি দেন মন্ত্রী।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন আরও জানান, প্রসূতির মৃত্যুর ঘটনায় পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দায়ীদের বিরুদ্ধে দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া সরকারের পক্ষ থেকে পরিবারটিকে সকল ধরনের সহযোগীতারও আশ্বাস দিয়েছেন মন্ত্রী।

নিহতের পরিবারকে সমবেদনা জানাতে এসে মন্ত্রী আরও বলেন, 'ঘটনাটি আমি নিজেই মেনে নিতে পারছি না। একারণেই সকালেই পরিবারটিকে সমবেদনা জানাতে চলে এসেছি। একজন মায়ের এই অকাল মৃত্যু, একটা নিষ্পাপ শিশু তার মায়ের চেহারা দেখতে পারে নাই চিকিৎসকের অবহেলার কারনে। বিষয়টি কঠোরভাবে দেখবো এবং এর যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এই শোক সন্তপ্ত পরিবারের প্রতি আমার দৃষ্টি থাকবে, সরকারের দৃষ্টি থাকবে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীরও দৃষ্টি থাকবে'।

তিনি আরও বলেন, গত ১৭ বছরে হাসপাতালের আশপাশে গড়ে ওঠা অবৈধ ক্লিনিকগুলোর বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান ও আকস্মিক পরিদর্শন চলছে। কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে ক্লিনিক বন্ধ করাসহ লাইসেন্স বাতিল করা হচ্ছে।

এ সময় রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসক আফরোজা পারভীন, রাজবাড়ীর সিভিল সার্জন ডা. এসএম মাসুদ, ফরিদপুরের সিভিল সার্জন ডা. মাহমুদুল হাসান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সামসুল হক, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) তারিফ উল হাসান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা চৌধুরী মুস্তাফিজুর রহমান সহ রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

উল্লেখ করা যেতে পারে, রাজবাড়ী জেলার বালিয়াকান্দি উপজেলার বহরপুর ইউনিয়নের বাঘুটিয়া গ্রামের অশান্ত মন্ডলের স্ত্রী কনিকা মন্ডলের (৩৬) প্রসব বেদনা উঠলে গত ২৯ জুন ফরিদপুর শহরের নীলটুলী এলাকার সমরিতা জেনারেল হাসপাতালে তাকে ভর্তি করা হয়। ওই দিন সন্ধ্যায় হাসপাতালটির স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা বিশেষজ্ঞ সার্জন ডা. লক্ষ্মী রানী দত্ত অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তার কন্যা সন্তান প্রসব করান। কিন্তু পরদিনই কনিকার পেট ফুলে যায়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট চিকিৎসককে বিষয়টি জানালে তারা নানা অজুহাত দেখিয়ে রোগীকে অন্যত্র নিয়ে যেতে বলেন। পরে ৩ জুলাই তাকে ঢাকার কল্যাণপুরের ইবনে সিনা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

ঢাকায় ভর্তির পর ৭ জুলাই ওই হাসপাতালের সার্জারি বিশেষজ্ঞ ডা. আব্দুল জলিলের তত্ত্বাবধানে পরীক্ষার পর জানা যায়, কনিকার পেটে প্রায় দেড় কেজি গজ রেখেই সেলাই দেয়া হয়েছে। ওই দিনই অস্ত্রোপচার করে গজ বের করা হয় এবং রোগীর অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যায়। টানা চার দিন আইসিইউতে (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) রাখার পর ৪৮ দিন ধরে তার চিকিৎসা চলে। প্রায় ২০ লাখ টাকা খরচের পরও তাতেও বাঁচাতে সম্ভব হয়নি। বুধবার (১৯ আগস্ট) দিবাগত রাত সোয়া ২টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকার ওই হাসপাতালে মারা যান কনিকা মন্ডল। বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) বিকালে নিহতের সৎকার করা হয়। পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, চিকিৎসকের অবহেলার কারণেই একটি প্রাণ চলে গেল। বিচার দাবী নিহতের স্বজনদের।

নিহত গৃহবধূর স্বামী অশান্ত মন্ডল বলেন, আজ শুক্রবার সকালে স্বাস্থ্য মন্ত্রী বাড়িতে এসেছিলেন, সাথে কর্মকর্তারাও আসেন। আমাদেরকে সমবেদনা জানানোর পাশাপাশি দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন মন্ত্রী।

নিহত গৃহবধুর দেবর সমীর মন্ডল বলেন, ঢাকায় ওই হাসপাতালে ভর্তি করার পর ৭ জুলাই সার্জারী বিশেষজ্ঞ ডা. আব্দুল জলিলের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাকালীন পরীক্ষা করে দেখতে পান তার পেটে প্রায় দেড় কেজি গজ রেখে সেলাই দেওয়া হয়েছে। পরে ওই দিনেই অস্ত্রোপচার করে গজ কাপড় বের করা হয় এবং রোগীর অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যায়। এরপর চারদিন আইসিইউতে (নিবিড় পরিচর্যা) রাখা হয়। পরে টানা ৪৮ দিন চিকিৎসা চলতে থাকে তাঁর। এতে আমাদের প্রায় ২০ লাখ টাকা শেষ হয়ে গিয়েছে, তাতেও বাঁচাতে পারলাম না। আমরা ওই ডাক্তারের বিচার চাই, তাঁর অবহেলার কারনেই আজ একটি প্রাণ চলে গেল।

এদিকে, কনিকার মৃত্যুর পর তার স্বামী অশান্ত মন্ডলের হোয়াটসঅ্যাপে একটি খুদে বার্তা পাঠিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেন অভিযুক্ত চিকিৎসক লক্ষ্মী রানী দত্ত। বার্তায় তিনি লেখেন, দাদা নমস্কার। ভালো থাকুন ঈশ্বরের কাছে সেই প্রার্থনা করি। সব কথার আগে করজোড়ে ক্ষমাপ্রার্থী। ভুল মানুষেরই হয়, অনেক ঝামেলার ভেতর থেকে আমি ভুল করে ফেলেছি। আমি বারবার ক্ষমাপ্রার্থী আপনার কাছে। অনেক কষ্টে আছি। আবারও ক্ষমা চাচ্ছি দাদা।

সিজারিয়ান অপারেশন করা ডা. লক্ষ্মী রানী দত্তের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমার খেয়াল নেই, একটু পরে ফোন দিচ্ছি’ বলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরে আবারও যোগাযোগ করা হলে তিনি আর ফোন ধরেননি।

এ ফরিদপুরের সিভিল সার্জন ডা. মাহমুদুল হাসান উত্তরাধিকার ৭১ নিউজকে জানান, 'মন্ত্রী মহোদয়ের নির্দেশে এ ঘটনায় ফরিদপুর সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোক্তার হোসেনকে প্রধান করে পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট একাটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন গাইনী কনসালটেন্ট ডা. সুলতানা বেগম লিপি, কনসালটেন্ট ডা. সন্দীপন গাইন, গাইনী বিশেষজ্ঞ ডা. নুপুর পাল এবং সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মেডিকেল অফিসার ডা. জোতির্ময়'। এছাড়া, আগামী পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে কমিটিকে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান ফরিদপুরের সিভিল সার্জন মাহমুদুল।

নিহত গৃহবধূ কনিকা মন্ডল (৩৬) রাজবাড়ী জেলার বালিয়াকান্দি উপজেলার বহরপুর ইউনিয়নের বাঘুটিয়া গ্রামের অশান্ত মন্ডলের স্ত্রী। মৃত্যুকালে দুই ছেলে ও দেড় মাস বয়সি একটি কন্যা সন্তান রেখে গেছেন নিহত কনিকা মন্ডল।

(আরআর/এসপি/আগস্ট ২১, ২০২৬)