ছাত্রদল নেতা বাপ্পির নেতৃত্বে ইউপি সদস্য লাল্টুর সমর্থকদের ওপর হামলা, ৯ দিন পর চিকিৎসাধীন রকিবের মৃত্যু
রঘুনাথ খাঁ, সাতক্ষীরা : একটি নারী ঘটিত ভিডিও ফুটেজ ফেইসবুকে ছড়িয়ে দেওয়াকে কেন্দ্র করে সাতক্ষীরা জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহবায়ক মঞ্জুরুল আলম বাপ্পী সমর্থকদের হামলার নয় দিন পর আহত আব্দুর রকিব ঝনু মারা গেছেন। বৃহষ্পতিবার দিবাগত রাত সোয়া একটার দিকে ঢাকা মেডিকেলের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
নিহত আব্দুর রকিব ঝনু (৪০) সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ঘোনা ইউনিয়নের শ্রীরডাঙা গ্রামের ডাঃ আব্দুর রশিদের ছেলে।
এদিকে রকিবের মৃত্যুর প্রায় আধ ঘণ্টা আগে নিহতের পরিবারের সদস্যদেও বাদ দিয়ে ইউপি সদস্য শাহীনুর রহমান লাল্টুর ভাই আশরাফুল আলম ডাবলু বাদি হয়ে বৃহষ্পতিবার দিবাগত রাত ১২টা ৩৫ মিনেটে একটি হত্যা চেষ্টা মামলা করায় প্রকৃত হামলাকারিরা শাস্তি পাবে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
নিহত আব্দুর রকিব ঝনুর বাবা আব্দুর রশিদ জানান, স্থানীয় রুহুল আমিনের ছেলে ইমন ও ঘোনা ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডেও সদস্য শাহীনুর রহমান ওরফে লাল্টুর ছেলে নাজমুলের সঙ্গে বিরোধকে কেন্দ্র করে গত ৮ আগষ্ট রাত ৯টার দিকে শ্রীরডাঙার মোড়ে জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহবায়ক মঞ্জুরুল আলম বাপ্পি, ছাত্রদল নেতা জাহিদ ও তার সমর্থকরা ৪নং ওয়ার্ড জামাতের সভাপতি জহিরুল ইসলামের ভাই ইউপি সদস্য শাহীনুর রহমান লাল্টু ও তার সমর্থকদের উপর আব্দুল মাজেদের চায়ের দোকানে সশস্ত্র হামলা চালায়।
এ সময় হামলাকারিদের লোহার রডের আঘাতে তার ছেলে আব্দুর রকিব ঝনুর মাথা মারাত্মক জখম হয়। তাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আব্দুর রকিবের অবস্থার অবনতি হওয়ায় ৯ আগষ্ট সন্ধ্যায় তাকে ঢাকা মেডিকেলের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে(আইসিইউ) ভর্তি করা হয়। বৃহষ্পতিবার দিবাগত রাত সোয়া একটার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সে মারা যায়। শুক্রবার দুপুরে থানায় মামলা করতে যেয়ে তিনি জানতে পারেন যে, শাহীনুর রহমান লাল্টুর ভাই আশরাফুল আলম ডাবলু বাদি হয়ে বৃহষ্পতিবার দিবাগত রাত ১২টা ৩৫ মিনিটে নজরুল ইসলামের ছেলে পশু চিকিৎসক ও ঘোনা ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি জাহিদ হোসেনসহ পাঁচজনের নাম উল্লেখ করে থানায় একটি হত্যা চেষ্টা মামলা দায়ের করেছেন। এতে হামলার সঙ্গে জড়িত অনেকেই তেকে যাবে ধরা ছোঁয়ার বাইরে।
নিহত আব্দুর রকিব ঝুনুর ভাই বেলাল হোসেন জানান, ঢাকা মেডিকেলের মর্গে শুক্রবার বিকেলে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। রাতে ১০টার দিকে লাশ বাড়িতে পোঁছানোর সম্ভবনা রয়েছে। রাতেই ঝনুর লাশ পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে।
সাতক্ষীরা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ মাহামুদুর রহমান জানান, আব্দুর রকিব ঝনুর উপর হামলার ঘটনায় ভিকটিমের সঙ্গে ছবিতে একসাথে থাকা ঘোনা গ্রামের শ্রীডাংগার আছিরউদ্দিন সরদারের ছেলে আশরাফুল আলম ডাবলু বাদি হয়ে একই গ্রামের নজরুল ইসলামের ছেলে পশু চিকিৎসক জাহিদ হোসেনসহ পাঁচজনের নাম উল্লেখ করে শুক্রবার রাত ১২টা ৩৫ মিনিটে থানায় একটি হত্যা চেষ্টা মামলা(৪৭নং, তাং- ২১.০৮.২৬ সদর) দায়ের করেছেন। ভিকটিমের মৃত্যু সংক্রান্ত কাগজপত্র পাওয়ার পর হত্যা চেষ্টা মামলার সাথে ৩০২ ধারা সংযুক্ত করার জন্য আদালতে আবেদন করা হবে।
প্রসঙ্গত, প্রায় এক বছরেরও বেশি সময় আগে লাল্টু মেম্বরের মেয়েকে কলেজে ও প্রাইভেট পড়তে যাওয়া- আসার পথে বিরক্ত করতো একই গ্রামের রুহুল আমিনের ছেলে ইমন। এনিয়ে রুহুল আমিন ও তার পরিবারের সাথে লাল্টু মেম্বরের সম্পর্কের অবনতি হয়। এ ছাড়া লাল্টু মেম্বরের ভাই লাভলু সরদারের সঙ্গে একই গ্রামের ইদ্রিস আলীর ছোট স্ত্রী সোয়াদা খাতুনের অনৈতিক সম্পর্ক আছে মর্মে প্রচার রয়েছে। এনিয়ে গত ৮ আগষ্ট শনিবার দুপুরে সোয়াদা খাতুন ও চাচা লাভলুকে নিয়ে ইমন ও রাশেদ এর ফেইসবুকে ছড়ানো একটি ভিডিও ভাইরাল হওয়াকে কেন্দ্র করে মোবাইল ফোনে ইমনের সঙ্গে কথাকাটাকাটি হয় লাল্টুর ছেলে নাজমুলের। ইমন বিএনপি করে বলে তাকে হুমকি দিলে ফল ভাল হবে না মর্মে নাজমুলকে জানিয়ে দেয়। এতে নাজমুল ক্ষিপ্ত হয়ে ইমনকে যথেচ্চোভাবে গালিগালাজ করে। বিষয়টি ইমন জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহবায়ক মঞ্জুরুল আলম বাপ্পিসহ কয়েকজনকে জানায়।
এরই জের ধরে ৮ আগষ্ট রাত ৯টার দিকে মোবারকের মোড় থেকে মঞ্জুরুল আলম বাপ্পি ও ছাত্রদল নেতা জাহিদ হোসেনের নেতৃত্বে ৫০/৬০ জন হাতে লাহার রড, হাতুড়ি ও লাঠি নিয়ে লাল্টু মেম্বরের বাড়ির দিকে যাওয়ার সময় শীডাঙ্গার মোড়ে মাজেদেও চায়ের দোকানের সামনে কথা বলতে চাইলে এতে বাপ্পি ও তার সহযোগিরা লাল্টুকে লোহার রড ও হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে জখম করে। খবর পেয়ে ছুঁটে আসা লাল্টুর ছেলে নাজমুল, জাহাঙ্গীর আলম, সামছুর রহমান, আশরাফুল আলম ডাবলু, আব্দুর রকিব ঝনু ও খালিদ হোসেনকে পিটিয়ে জখম করা হয়। পরবর্তীকে আব্দুর রকিব ঝনুকে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং লাল্টু ও জাহাঙ্গীরকে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে খবর পেয়ে শহরের ছাত্রদল, তাঁতীদল ও বিএনপির অঙ্গ সংগঠণের লোকজন সদর হাসপাতালের ১ নং ওয়ার্ডে যেয়ে লাল্টু ও জাহাঙ্গীরকে হাসপাতালের বেড থেকে তুলে আনার চেষ্টা করে। রাত দুটোর দিকে বিএনপি তার অঙ্গ সংগঠেণের লোকজন তাদেরকে গ্রেপ্তারের দাবিতে খুলনা রোডের মোড়ে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করলে পুলিশ লাল্টু ও জাহাঙ্গীরকে হাসপাতালের বেড থেকে গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে যায়। রাত আড়াইটার দিকে বিএনপির অঙ্গ সংগঠণের নেতা কর্মীরা থানার সামনে এক প্রতিবাদ সমাবেশ করে। সমাবেশ থেকে লাল্টু ও জাহাঙ্গীরকে আওয়ামী লীগের লোক হিসেবে মন্তব্য করে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তারের দাবি করে। পুলিশ পরে সামছুর রহমান নামের এক লাল্টু সমর্থককে গ্রেপ্তার করে।
যদিও জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহবায়ক মঞ্জুরুল আলম বাপ্পি বলেন, ইমন ও বিএনপির নামে কটুক্তি করাকে কেন্দ্র করে কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে লাল্টু মেম্বর ও তার লোকজন তাদের উপর হামলা করে ৬/৭জনকে আহত করে। ৯ আগষ্ট মঞ্জুরুল আলম বাপ্পি বাদি হয়ে ইউপি সদস্য শাহীনুর রহমান লাল্টু ও সাবেক চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান মুসাসহ ১৪ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরো ১২ জনকে আসামী করে থানায় একটি মামলা করেন। পরবর্তীতে তারা থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে শহরে কয়েকবার বিক্ষোভ মিছিল করে থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাসুদুর রহমানের অপসারণ দাবি করা হয়।
(আরকে/এসপি/আগস্ট ২১, ২০২৬)
