রক্তে ভেজা হাওরের জলপথ: ’৭৫-এর প্রতিরোধ ও বাঙ্গালভিটার ট্র্যাজেডি
রাসেল আহমদ
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কময় ও নৃশংস অধ্যায়গুলোর একটি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর দেশ যখন স্তব্ধ, আতঙ্কিত ও দিশেহারা, তখনও বাংলাদেশের সর্বত্র নেমে আসেনি নীরবতার পর্দা। কোথাও কোথাও মানুষ প্রতিবাদ করেছে, কেউ সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করেছে, কেউ অস্ত্র হাতে প্রতিরোধের পথ বেছে নিয়েছে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পালাবদল, সামরিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর দ্রুত আনুগত্য পরিবর্তন এবং ভীত-সন্ত্রস্ত রাজনৈতিক পরিবেশের মধ্যেও কিছু মানুষ জীবন বাজি রেখে দাঁড়িয়েছিলেন।
এই বিস্মৃত প্রতিরোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছড়িয়ে আছে বরগুনার রাজপথ থেকে নেত্রকোনার হাওর, টাঙ্গাইলের সীমান্ত এবং সুনামগঞ্জের দুর্গম জনপদ পর্যন্ত। নদী-নালা, হাওর ও সীমান্তঘেরা ভূগোল সেখানে শুধু প্রকৃতির বৈশিষ্ট্য ছিল না; হয়ে উঠেছিল প্রতিরোধের পথ, আশ্রয়ের জায়গা এবং কখনো কখনো রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের মঞ্চ। আর সেই দীর্ঘ প্রতিরোধের সবচেয়ে বেদনাবিধুর স্মৃতিগুলোর একটি আজও বহন করে সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলার সীমান্তবর্তী আদিবাসী গ্রাম বাঙ্গালভিটা।
বঙ্গবন্ধু হত্যার খবর ছড়িয়ে পড়ার পরই দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদের খবর আসতে শুরু করে।
বরগুনা মহকুমায় ভোর থেকেই প্রতিবাদের প্রস্তুতি শুরু হয়। সকাল ৮টার দিকে তৎকালীন এসডিও সিরাজ উদ্দিনের পরোক্ষ সহযোগিতায় স্থানীয় বাকশাল, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের শত শত নেতা-কর্মী রাজপথে নেমে হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল করেন। আমতলী, বামনা, বেতাগী ও পাথরঘাটাতেও প্রতিবাদ সংগঠিত হয়।
এর কিছু পরেই নেত্রকোনার মোহনগঞ্জেও প্রতিরোধের আওয়াজ ওঠে। বেলা ১১টার দিকে সাবেক গণপরিষদ সদস্য ও আওয়ামী লীগ নেতা ডা. আখলাকুর হোসাইনের নির্দেশে মোহনগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সেক্রেটারি আবদুল কুদ্দুছ আজাদ, ছাত্রলীগ সভাপতি আক্কেব আলীসহ স্থানীয় নেতাকর্মীদের নেতৃত্বে এক-দেড়শ মানুষের একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। ১৫ আগস্টের অন্ধকারে এটি ছিল দেশের অন্যতম প্রথম প্রকাশ্য রাজনৈতিক প্রতিবাদ।
পরদিন ১৬ আগস্ট বরগুনায় ছোট পরিসরে শোকসভা অনুষ্ঠিত হলেও ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের পর বড় পরিসরের আনুষ্ঠানিক শোক ও প্রতিরোধ সমাবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন হয় নেত্রকোনার মোহনগঞ্জের মল্লিকপুরে। হাওরের বিশাল জলরাশির মাঝে বিচ্ছিন্ন, অর্ধশতাধিক হিন্দু পরিবার অধ্যুষিত এই জনপদটি তখন হয়ে ওঠে রাজপথের আন্দোলনকারীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল।
১৯ আগস্ট মল্লিকপুরের হরেন্দ্র তালুকদারের বাড়িতে সমবেত হন ধর্মপাশার এমপি আবদুল হেকিম চৌধুরী, গৌরীপুরের এমপি হাতেম আলী তালুকদার, শ্যামগঞ্জ-তারাকান্দার রজব আলী- যিনি পরবর্তী সময়ে ’৭৫-এর প্রতিরোধযুদ্ধে শহীদ হন -নেত্রকোনা সদরের গণপরিষদ সদস্য আব্বাস আলী খান, সুনামগঞ্জের কমরেড বরুন রায়, কলমাকান্দার এমপি আবদুল মজিদ তারা মিয়া এবং ডা. জগদীশ চন্দ্র দত্তসহ প্রবীণ নেতৃবৃন্দ। তাঁদের উপস্থিতির খবর ছড়িয়ে পড়লে আশপাশের গ্রাম থেকে শত শত মুজিবভক্ত ছুটে আসেন সেই বাড়ির উঠানে।
বিকেল ৩টার দিকে হরেন্দ্র তালুকদারের বিশাল আঙিনা কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। শোকাহত মানুষের কান্না, বুক চাপড়ানো আর্তনাদ আর প্রতিরোধের প্রত্যয় মিলেমিশে সেখানে তৈরি করে এক অভূতপূর্ব পরিবেশ। ডা. আখলাকুর হোসাইনের সভাপতিত্বে বিকেল ৪টায় শুরু হয় আনুষ্ঠানিক প্রতিরোধ সভা।
কিন্তু সভা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পরিস্থিতি পাল্টে যায়। শাসকগোষ্ঠীর নির্দেশে শুরু হয় গণগ্রেপ্তার ও নির্যাতন। ডা. আখলাকুর হোসাইন জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় বারহাট্টা থানা আক্রমণের মামলায় পুনরায় গ্রেপ্তার হন। একের পর এক গ্রেপ্তারের ফলে হাওরাঞ্চলে গড়ে ওঠা গণপ্রতিরোধ পূর্ণাঙ্গ সংগঠিত আন্দোলনে রূপ নেওয়ার আগেই বড় ধাক্কা খায়।
সেই সময় আওয়ামী লীগ ও বাকশালের অনেক কেন্দ্রীয় নেতা আত্মগোপনে। সামরিক বাহিনী ও পুলিশের শীর্ষ পর্যায়ের একটি বড় অংশ নতুন ক্ষমতাকেন্দ্রের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করেছে। বঙ্গবন্ধুর নিজ হাতে গড়া রক্ষী বাহিনীও কার্যত নিষ্ক্রিয়। এমন এক ভয়াবহ রাজনৈতিক শূন্যতার মধ্যেই প্রতিরোধের আরেক অধ্যায় শুরু হয় টাঙ্গাইলে।
২২ আগস্ট তৎকালীন টাঙ্গাইলের জেলা গভর্নর বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম ছয়জন সঙ্গী নিয়ে জামালপুর সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেন। মোশতাক সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের ঘোষণা দেওয়ার পর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রাজনৈতিক কর্মীরা সীমান্তে গিয়ে তাঁর সঙ্গে যোগ দিতে থাকেন। প্রতিরোধ ধীরে ধীরে সংগঠিত সশস্ত্র সংগ্রামের রূপ নেয়।
অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহে প্রতিরোধ বাহিনীর একটি দল যমুনা নদীপথে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। সিরাজগঞ্জের কাজীপুর উপজেলার নিশ্চিন্তপুর চরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে বগুড়া জেলা যুবলীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আবদুল খালেক খসরু শহীদ হন। সহযোদ্ধারা তাঁর মরদেহ শত্রুর হাতে পড়তে না দিয়ে যমুনার পানিতে ভাসিয়ে দেন। অস্ত্র রক্ষা করে তাঁরা শেষ পর্যন্ত হালুয়াঘাটের পাহাড়ি সীমান্তে পৌঁছান। ’৭৫-এর প্রতিরোধযুদ্ধের ইতিহাসে এই সংঘর্ষ একটি গুরুত্বপূর্ণ ও রক্তাক্ত অধ্যায়।
হাওরের জনপদেও তখন সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলার( তৎকালীন ধর্মপাশা থানা) বাট্টা গ্রামে সেনাবাহিনী ও প্রতিরোধ বাহিনীর মধ্যে দিনব্যাপী তুমুল যুদ্ধ হয়। সেই সংঘর্ষে তিনজন নিরীহ গ্রামবাসী নিহত হন। গুলিতে মারা যায় অর্ধশতাধিক গবাদিপশুও। এর কিছুদিন পূর্বে একই এলাকার কাউহানি গ্রামেও প্রতিরোধ যোদ্ধাদের সঙ্গে সেনাবাহিনীর সংঘর্ষ হয়েছিল; তবে সেখানে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি। একই জেলার তাহিরপুর উপজেলার শনির হাওরপাড়ের রামজীবনপুর গ্রামও প্রত্যক্ষ করেছিল রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও প্রতিরোধযোদ্ধাদের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ।
তবে এই প্রতিরোধের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী এবং মানবিকভাবে মর্মান্তিক পরিণতির শিকার হয় মধ্যনগরের সীমান্তবর্তী বাঙ্গালভিটা।
পাহাড় ও হাওরের সন্ধিস্থলে অবস্থিত বাঙ্গালভিটার ৬২টি আদিবাসী পরিবার ছিল বঙ্গবন্ধুর প্রতি গভীরভাবে অনুগত। প্রতিরোধযোদ্ধাদের কাছে তাই গ্রামটি হয়ে উঠেছিল একটি নিরাপদ আশ্রয় ও গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি। কিন্তু প্রতিরোধের সংগঠিত শক্তি যখন ধীরে ধীরে স্তব্ধ হয়ে গেল, তখন বাঙ্গালভিটার ওপর নেমে আসে প্রতিশোধের ভয়াবহতা।
স্থানীয়ভাবে বর্ণিত ইতিহাস অনুযায়ী, বঙ্গবন্ধু হত্যার পর যারা উল্লাস করেছিল, মিষ্টি বিতরণ করেছিল, তাদের একটি অংশ পরবর্তী সময়ে প্রতিরোধযোদ্ধাদের স্বজন ও সমর্থকদের ওপর নিপীড়নে যুক্ত হয়। বাড়িঘরে হামলা, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, ভিটেমাটি ও ফসলি জমি দখল -একটির পর একটি ঘটনা বাঙ্গালভিটার মানুষকে অস্তিত্বের সংকটে ঠেলে দেয়। সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয় প্রতিরোধযোদ্ধাদের পরিবারগুলোকে।
নিরাপত্তাহীনতা, নির্যাতন ও সম্পদ হারানোর ভয়াবহতায় একসময় বাঙ্গালভিটার প্রায় সব আদিবাসী পরিবার সীমান্ত পেরিয়ে গারো পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ভারতের আসাম ও মেঘালয়ে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। যে মানুষগুলোর পূর্বপুরুষের ভিটায় প্রজন্মের পর প্রজন্মের স্মৃতি, যে মাটিতে তাদের শ্রমে ফসল ফলেছে, যে দেশকে তারা নিজেদের স্বাধীন মাতৃভূমি বলে বিশ্বাস করেছে -সেই দেশেই তারা পরিণত হলো বাস্তুচ্যুত মানুষে।
কয়েকজন পরে দেশে ফিরতে পেরেছেন। প্রাণেশ রেমা কিংবা হিতেন রেমার মতো কিছু যোদ্ধার প্রত্যাবর্তন ঘটেছে। কিন্তু কাইটাকোনার এলিন সাংমা, সুদন হাজং, সুবোধ হাজংদের মতো অনেকেই আর ফিরে আসতে পারেননি। দেশে জমিজমা থাকার পরও তাঁদের জীবন কেটে গেছে পরবাসে, অন্যের জমিতে শ্রম বিক্রি করে।
এই গল্প শুধু কয়েকটি পরিবারের নয়। এটি রাষ্ট্র, ইতিহাস ও স্মৃতির দায়ের গল্প। মেঘালয়ের গহীন পাহাড়ে কিংবা সীমান্তের অস্থায়ী ঠিকানায় আজও সেই পরিবারগুলোর অনেকে বেঁচে আছেন অনিশ্চয়তা নিয়ে। অর্থের অভাব, চিকিৎসার সংকট ও দীর্ঘ নির্বাসনের কষ্টে অনেকে মৃত্যুবরণ করেছেন। ’৭৫-এর প্রতিরোধযুদ্ধের ‘বেতগড়া কোম্পানি’র কমান্ডার সুকুমার রায়ের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ সরকারও দেশে ফিরতে না-পারা এসব যোদ্ধা ও তাঁদের পরিবারের প্রত্যাবর্তনের জন্য কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি।
এই জায়গাটিই আমাদের ইতিহাসচর্চার সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্নগুলোর একটি। ক্ষমতা বদলেছে। সরকার বদলেছে। রাজনৈতিক স্লোগান বদলেছে। কিন্তু ইতিহাসের প্রান্তে পড়ে থাকা মানুষগুলোর ভাগ্য কি বদলেছে?
বাঙ্গালভিটার ট্র্যাজেডি তাই কেবল অতীতের একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় -রাষ্ট্রীয় ইতিহাসের বড় অধ্যায়গুলোর পাশে অসংখ্য ছোট ছোট মানবিক ইতিহাস চাপা পড়ে থাকে।
রাজধানীর রাজনৈতিক ঘটনাপঞ্জিতে যে রক্তের হিসাব থাকে না, কোনো দুর্গম হাওরগ্রামে তার প্রতিধ্বনি হয়তো দশকের পর দশক বেঁচে থাকে। হাওরের জলপথে একদিন যে প্রতিবাদের নৌকা ভেসেছিল, তার ঢেউ হয়তো থেমে গেছে; কিন্তু তার স্মৃতি থামেনি। বাঙ্গালভিটার পরিত্যক্ত ভিটা, সীমান্তের ওপারে ছড়িয়ে থাকা পরিবার, নির্বাসনে বৃদ্ধ হয়ে যাওয়া যোদ্ধা -সবই সেই অসমাপ্ত ইতিহাসের জীবন্ত দলিল।
বাঙ্গালভিটার জল, মাটি আর সীমান্তের বাতাস আজও যেন সেই প্রশ্নই করে -যাঁরা দেশের জন্য দাঁড়িয়েছিলেন, দেশ কি শেষ পর্যন্ত তাঁদের জন্য দাঁড়াবে?
লেখক: ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
