মীর আব্দুল আলীম


আমরা শুধু রাস্তায় থাকা গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করব, নাকি প্রতিদিন নতুন করে যে হাজার হাজার যানবাহন সড়কে যুক্ত হচ্ছে, সেই প্রবাহও বন্ধ করব? প্রশ্নটি এখন আর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে হলে শুধু রাস্তায় থাকা যানবাহনের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে কোনো স্থায়ী সমাধান পাওয়া যাবে না। প্রতিদিন যদি নতুন নতুন ব্যাটারিচালিত গাড়ি উৎপাদন হয়, বাজারে বিক্রি হয় এবং একের পর এক সড়কে নেমে পড়ে, তাহলে আজকের নিয়ন্ত্রণ আগামীকালই আবার ভেঙে পড়বে। তাই সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর প্রথম শর্তই হলো অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারিচালিত গাড়ির উৎপাদন, আমদানি ও বিক্রি বন্ধ করা।

প্রশ্ন হলো, আমরা কি শুধু চালকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব, নাকি পুরো ব্যবস্থাটিকে নিয়ন্ত্রণ করব? একজন চালক রাস্তায় গাড়ি নিয়ে বের হয়েছেন। কিন্তু গাড়িটি তিনি কোথা থেকে পেলেন? কে সেটি তৈরি করল? কে আমদানি করল? কে বাজারে সরবরাহ করল? কে বিক্রি করল? সেটি কি কোনো নির্ধারিত মান মেনে তৈরি? সেটি কি সড়কে চলার উপযোগী? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে হবে। কারণ একজন চালককে জরিমানা করলেই সমস্যার সমাধান হবে না, যদি একই সময়ে বাজারে শত শত নতুন গাড়ি বিক্রি হতে থাকে।

দেশের বিভিন্ন শহর, উপজেলা, বাজার ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কের দিকে তাকালে এখন একটি বিষয় খুব সহজেই চোখে পড়ে রাস্তার বড় একটি অংশ ক্রমেই ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, ইজিবাইক ও নানা ধরনের ছোট যানবাহনে পূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। একদিকে পুরোনো যান রাস্তায় রয়েছে, অন্যদিকে প্রতিদিন নতুন যান যুক্ত হচ্ছে। ফলে সড়কের ধারণক্ষমতা এবং যানবাহনের সংখ্যার মধ্যে ব্যবধান দ্রুত বাড়ছে। আজ যে অবস্থা চোখে পড়ছে, আগামী দিনগুলোতে তা আরও ভয়াবহ হতে পারে। এখনই যদি এই প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তাহলে দুদিন পর নয়, কয়েক বছর পর পরিস্থিতি সামাল দেওয়া প্রশাসনের জন্য অনেক বেশি কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।

আমরা প্রায়ই দেখি, সড়কে অভিযান হচ্ছে। কিছু গাড়ি আটক করা হচ্ছে, কিছু চালককে জরিমানা করা হচ্ছে, কোথাও কোথাও যান উচ্ছেদ করা হচ্ছে। কিন্তু একই সময়ে অন্য কোনো জায়গায় নতুন গাড়ি তৈরি হচ্ছে, বাজারে বিক্রি হচ্ছে এবং সড়কে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে। অর্থাৎ একদিকে যতটা সরানো হচ্ছে, অন্যদিকে তার চেয়েও বেশি নতুন যান রাস্তায় যুক্ত হচ্ছে। এটি অনেকটা একদিকে বালতি দিয়ে পানি ফেলার মতো, আর অন্যদিকে কলটি খোলা রাখার মতো। যতক্ষণ পর্যন্ত নতুন গাড়ির প্রবাহ বন্ধ না হবে, ততক্ষণ পুরোনো গাড়ি সরিয়ে সড়কে স্থায়ী শৃঙ্খলা আনা সম্ভব হবে না।

ব্যাটারিচালিত গাড়ির চালকদের সবাইকে সমস্যার মূল হিসেবে দেখাও ঠিক হবে না। তাদের অনেকেই নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ। পরিবারের জীবিকা নির্বাহের জন্য কেউ ঋণ করে গাড়ি কিনেছেন, কেউ কিস্তিতে গাড়ি নিয়েছেন, কেউ আবার অন্যের গাড়ি ভাড়ায় চালাচ্ছেন। তাই বিদ্যমান চালকদের জীবিকার বিষয়টি বিবেচনায় না নিয়ে হঠাৎ করে সব গাড়ি উচ্ছেদ করা বাস্তবসম্মত সমাধান নয়। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে নতুন করে অনিয়ন্ত্রিতভাবে হাজার হাজার গাড়ি উৎপাদন ও বিক্রি হতে থাকবে। বরং নতুন উৎপাদন ও বিক্রি বন্ধ করে ধাপে ধাপে বিদ্যমান যানবাহনকে একটি সুশৃঙ্খল ব্যবস্থার মধ্যে আনতে হবে।

আমার বিবেচনায়, এখনই একটি সুস্পষ্ট নীতি নেওয়া দরকার। অনুমোদনহীন ব্যাটারিচালিত গাড়ির উৎপাদন বন্ধ করতে হবে। অনিয়ন্ত্রিত আমদানি বন্ধ করতে হবে। অনুমোদন ছাড়া এসব যান বাজারজাত ও বিক্রির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। নতুন করে কোনো যান সড়কে নামার আগে সেটির মান, নিরাপত্তা, নিবন্ধন ও চলাচলের এলাকা নির্ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে বিদ্যমান গাড়িগুলোর একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করে কোন গাড়ি রাখা হবে, কোনটি পর্যায়ক্রমে প্রত্যাহার করা হবে এবং কোন সড়কে কোন ধরনের যান চলতে পারবে তার একটি বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা করতে হবে।

বিদ্যুৎচালিত হলেই কোনো যান স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিরাপদ বা সড়ক উপযোগী হয়ে যায় না। একটি যান কীভাবে তৈরি হয়েছে, কী ধরনের ব্যাটারি ব্যবহার করছে, বৈদ্যুতিক সংযোগ কতটা নিরাপদ, ব্রেকিং ব্যবস্থা কেমন, আলো ও অন্যান্য নিরাপত্তা সরঞ্জাম ঠিক আছে কি না এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে নিম্নমানের যন্ত্রাংশ দিয়ে তৈরি ও অনুমোদনহীন যানবাহন যদি নির্বিচারে রাস্তায় চলতে থাকে, তাহলে যানজটের পাশাপাশি দুর্ঘটনা ও জননিরাপত্তার ঝুঁকিও বাড়তে পারে। তাই বৈদ্যুতিক যান থাকবে কি থাকবে না এমন সরল বিতর্কের বদলে প্রশ্ন হওয়া উচিত, কোন ধরনের বৈদ্যুতিক যান থাকবে, কী মানের হবে এবং কোথায় চলবে।

আরেকটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাটারিচালিত যান বন্ধ বা নিয়ন্ত্রণ করতে হলে বিকল্প গণপরিবহনের ব্যবস্থা করতে হবে। সাধারণ মানুষকে যদি বলা হয়, এই যান ব্যবহার করা যাবে না, কিন্তু তার বিকল্প হিসেবে পর্যাপ্ত, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী পরিবহন না দেওয়া হয়, তাহলে মানুষ বাধ্য হয়েই আবার অনিয়ন্ত্রিত পরিবহনের দিকে যাবে। তাই একদিকে নতুন ব্যাটারিচালিত যান উৎপাদন ও বিক্রি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, অন্যদিকে বাস, অনুমোদিত ইজিবাইকসহ নিরাপদ ও পরিকল্পিত গণপরিবহন বাড়াতে হবে। মানুষের চলাচলের প্রয়োজন বন্ধ করা যাবে না; বরং সেই চলাচলকে নিয়মের মধ্যে আনতে হবে।

আমাদের আরও একটি বিষয় মনে রাখতে হবে সড়ক কোনো এক শ্রেণির যানবাহনের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। সড়ক পথচারীর, গণপরিবহনের, অ্যাম্বুলেন্সের, ফায়ার সার্ভিসের, স্কুলগামী শিক্ষার্থীর, কর্মজীবী মানুষের এবং সাধারণ নাগরিকের। একটি সড়কের ধারণক্ষমতার তুলনায় যানবাহনের সংখ্যা যদি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, তাহলে সেখানে শুধু যানজট নয়, পুরো নগরজীবনই অচল হয়ে পড়তে পারে। তাই সড়কের ওপর যানবাহনের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করতেই হবে। আর সেই নিয়ন্ত্রণ শুরু করতে হবে রাস্তায় গাড়ি নামার পর নয়, গাড়ি উৎপাদন ও বিক্রির পর্যায় থেকেই।

আজ একটি এলাকায় এক হাজার ব্যাটারিচালিত গাড়ি রয়েছে। প্রশাসন অভিযান চালিয়ে একশ গাড়ি সরিয়ে দিল। কিন্তু পরের মাসেই যদি আরও দুইশ নতুন গাড়ি বাজারে আসে, তাহলে আগের অভিযান কতটা কার্যকর হলো? এটাই বাস্তব প্রশ্ন। সুতরাং নতুন গাড়ির প্রবাহ বন্ধ না করে শুধু বিদ্যমান গাড়ির বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে লাভ নেই। প্রথমে নতুন গাড়ির প্রবেশ বন্ধ করতে হবে, তারপর ধাপে ধাপে বিদ্যমান যানবাহনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। না হলে সমস্যাটি কমবে না, বরং প্রতিদিন নতুন করে বড় হবে।

আজ যে সিদ্ধান্ত নেওয়া তুলনামূলকভাবে সহজ, কয়েক বছর পর সেটিই হয়তো অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠবে। কারণ তখন শুধু গাড়ির সংখ্যা বাড়বে না; এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়বে আরও বেশি চালক, মালিক, ব্যবসায়ী, কারখানা, যন্ত্রাংশ বিক্রেতা ও বিনিয়োগকারী। তখন কোনো কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে গেলে সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রতিক্রিয়াও তৈরি হবে। তাই সংকট বড় হওয়ার আগেই সিদ্ধান্ত নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। আজ নতুন অনিয়ন্ত্রিত উৎপাদন ও বিক্রি বন্ধ করা গেলে আগামী দিনের বড় সংকট অনেকটাই এড়ানো সম্ভব।

আমরা প্রায়ই সমস্যা বড় হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করি। যখন যানজট অসহনীয় হয়, তখন অভিযান শুরু হয়। যখন দুর্ঘটনা বাড়ে, তখন সভা হয়। যখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন নতুন নীতিমালা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু ব্যাটারিচালিত যানবাহনের ক্ষেত্রে সেই পুরোনো ভুল আর করা উচিত নয়। কারণ প্রতিদিন নতুন করে যে যানগুলো সড়কে যুক্ত হচ্ছে, সেগুলোই আগামী দিনের বড় সংকটের ভিত্তি তৈরি করছে।

তাই এখনই সিদ্ধান্ত দরকার নতুন করে অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারিচালিত গাড়ির উৎপাদন বন্ধ করতে হবে, অননুমোদিত আমদানি বন্ধ করতে হবে এবং অনুমোদনহীন বিক্রি বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে বিদ্যমান গাড়ির বিষয়ে একটি ধাপে ধাপে বাস্তবসম্মত নীতি গ্রহণ করতে হবে। চালকদের জীবিকার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বিকল্প কর্মসংস্থান ও অনুমোদিত পরিবহন ব্যবস্থায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ দিতে হবে। অর্থাৎ নীতি হবে কঠোর, কিন্তু বাস্তবায়ন হবে মানবিক।

সড়কে শৃঙ্খলা কোনো একদিনের অভিযান দিয়ে ফিরবে না। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা। সবচেয়ে বড় কথা, সমস্যার শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে সমাধান খুঁজলে হবে না; সমস্যার উৎসে যেতে হবে। প্রতিদিন যে নতুন নতুন ব্যাটারিচালিত গাড়ি উৎপাদন হচ্ছে এবং বাজারে বিক্রি হচ্ছে, সেই প্রবাহ বন্ধ করতে না পারলে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর কোনো অভিযানই দীর্ঘস্থায়ী হবে না।

আজ সিদ্ধান্ত নিলে আগামী দিনকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। কিন্তু আজও যদি আমরা শুধু রাস্তায় থাকা গাড়ি নিয়ে ব্যস্ত থাকি এবং প্রতিদিন নতুন করে রাস্তায় নামা হাজার হাজার গাড়ির প্রবাহকে উপেক্ষা করি, তাহলে সামনে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে। তখন শুধু ট্রাফিক পুলিশ নয়, পুরো প্রশাসনকেই পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খেতে হবে।

সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হলে তাই প্রথমেই নতুন করে অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারিচালিত গাড়ির উৎপাদন ও বিক্রি বন্ধ করতে হবে। মানুষের জীবিকা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি কোটি মানুষের নিরাপদ চলাচলের অধিকারও গুরুত্বপূর্ণ। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রেখে এখনই একটি কঠোর, মানবিক ও দীর্ঘমেয়াদি পরিবহননীতি গ্রহণ করা সময়ের দাবি। কারণ সড়কে শৃঙ্খলা ফিরবে শুধু গাড়ি সরিয়ে নয়, নতুন করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পথ বন্ধ করতে হবে।

লেখক :সাংবাদিক, কলামিস্ট।