আলোয় ঝলমলে কাপ্তাই, আঁধারে নিমজ্জিত ‘কলাবুনিয়া পাড়া’
রিপন মারমা, রাঙামাটি : যেখান থেকে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়ে পুরো দেশকে আলোকিত করে চলেছে ঐতিহাসিক কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র, তার উৎপত্তিস্থল থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার দূরের রাঙামাটি কাপ্তাইয়ে চিৎমরম ইউনিয়ন কলাবুনিয়া পাড়া আজও জ্বলেনি কোনো বৈদ্যুতিক বাতি। ১৯৬২ সালে কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালুর মাধ্যমে দেশের বিদ্যুতের চাহিদা পূরণের যুগান্তকারী সূচনা হলেও, তার প্রতিবেশী রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলার ৩ নম্বর চিৎমরম ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ‘কলাবুনিয়া পাড়া’ দীর্ঘ ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে ধুঁকছে আদিম যুগের অন্ধকারে।
স্বাধীনতার দীর্ঘ বছর এবং বর্তমান ডিজিটাল যুগে এসেও কুপি বা হারিকেনের টিমটিমে আলোই এখানকার অর্ধশতাধিক মারমা পরিবারের একমাত্র ভরসা।
১৯৮৪ সাল থেকে কর্ণফুলী রেঞ্জের আওতাধীন এই জনপদে মারমা সম্প্রদায়ের মানুষ বসতি শুরু করেন। শুরুতে মাত্র ১৫টি পরিবার নিয়ে যাত্রা শুরু হলেও বর্তমানে সেখানে বসবাস করছে অর্ধশতাধিক পরিবার। কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের একদম কাছে হওয়া সত্ত্বেও কর্ণফুলী নদী এবং মাঝখানে লুসাই পাহাড়ের ভৌগোলিক দূরত্বের অজুহাতে আজও এই জনপদে পৌঁছায়নি উন্নয়নের ছোঁয়া।
চিৎমরম ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের অন্যান্য এলাকা যেমন—লংকা মুখ পাড়া, চংড়াছড়ি পাড়া, আগা পাড়া, নাইন্দমা ছড়া পাড়া ও আমতলী পাড়ায় বিদ্যুৎ সংযোগ পেলেও, ঠিক জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের নিকটবর্তী কলাবুনিয়া পাড়া রয়ে গেছে চরম অবহেলায়।
বিদ্যুৎহীনতার সবচেয়ে বড় নির্মম শিকার হচ্ছে এলাকার কোমলমতি শিক্ষার্থী ও যুবসমাজ। বাংলাদেশ সুইডেন সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, কর্ণফুলী সরকারি ডিগ্রি কলেজ, কাপ্তাই উচ্চ বিদ্যালয়, শহীদ শামসুদ্দীন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও চিৎমরম উচ্চ বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ২০ থেকে ২৫ জন শিক্ষার্থীসহ এলাকার ছেলেমেয়েরা সন্ধ্যার অন্ধকার নামলেই পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারছে না।
স্থানীয় সমাজসেবক সুচিংপ্রু মারমা বুকভরা আক্ষেপ নিয়ে বলেন, “ডিজিটাল যুগে এসেও আমাদের ছেলেমেয়েরা আলোর মুখ দেখছে না। এলাকার সামান্য সচ্ছল দু-একটি পরিবার নিজ দায়িত্বে সোলার প্যানেল চালালেও, অধিকাংশ অসচ্ছল পরিবার তা কিনতে না পারায় আজও হারিকেনের আলোয় দিন কাটাচ্ছে। পড়াশোনার মতো মৌলিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে আমাদের সন্তানেরা।”
স্থানীয় কলাবুনিয়া পাড়ার হেডম্যান পাইংপ্রু অং মারমা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, যুগের পর যুগ ধরে এই পাহাড়ি এলাকায় বসবাস করে আসলেও নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক নেতাদের বড় বড় প্রতিশ্রুতি কেবল ভোট পাওয়ার আশ্বাসের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকে। ভোট ফুরোলেই পাহাড়বাসীর এই কষ্টের কথা কেউ মনে রাখেন না।
চিৎমরম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ওয়েশ্লিমং চৌধুরী আক্ষেপের সুরে বলেন, “জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে অত্যন্ত কাছে হওয়া সত্ত্বেও নানা জটিলতার কারণে এখানে আলো পৌঁছানো যায়নি। আমরা বারবার সংশ্লিষ্ট মহলে যোগাযোগ করেছি, কিন্তু কাজটি এখনো না হওয়াটা অত্যন্ত বেদনাদায়ক।”
অন্যদিকে, বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্যমতে, এই এলাকায় সংযোগ দিতে হলে নিকটস্থ লাইন থেকে আনুমানিক ৪০ থেকে ৪৫টি নতুন বৈদ্যুতিক খুঁটি স্থাপন করা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে কাপ্তাই বিদ্যুৎ বিভাগের আবাসিক প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) আশরাফুল ইসলাম জানান, বিদ্যুৎ না থাকার বিষয়টি নিয়ে তাদের অফিসে কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করেনি। তবে তিনি খুব দ্রুত ওই এলাকা পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিয়েছেন।
যে কাপ্তাইয়ের জলবিদ্যুৎ দিয়ে আজ সারা বাংলাদেশ আলোকিত, সেই কাপ্তাইয়েরই বুকের ওপর অবস্থিত কলাবুনিয়া পাড়ার মানুষ কেন আজও অন্ধকারের বন্দি থাকবে ডিজিটাল বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় অবহেলিত এই পাড়াবাসীর প্রতিটি ঘরে কবে বিজলির আলো জ্বলবে—এখন সেটাই দেখার অপেক্ষা স্থানীয় ভুক্তভোগী মানুষের।
(আরএম/এসপি/আগস্ট ২৭, ২০২৬)
