স্টাফ রিপোর্টার : নতুন জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের সঙ্গে সাংবাদিকদের সুযোগ-সুবিধার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান।

তিনি বলেন, ‍“সাংবাদিকদের চাকরি ও জীবিকার নিশ্চয়তা দেওয়া না গেলে ভালো সাংবাদিকতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এ বিষয়ে সরকার দ্রুত কাজ করবে।”

মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি জানাতে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।

বেসরকারি সংবাদপত্র ও টেলিভিশনে কর্মরত সাংবাদিকদের সরকারি সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা এবং নবম ও দশম ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়নের বিষয়ে জানতে চাইলে জাহেদ উর রহমান বলেন, “সাংবাদিকদের বিষয়টি রিয়েল প্রবলেম। ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সংকটসহ এ-সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কাজ করছে।”

সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে বলা হয়, অষ্টম ওয়েজ বোর্ডের পর নবম ওয়েজ বোর্ড নিয়ে আলোচনা হলেও সেটি বাস্তবায়ন নিয়ে এখনো প্রশ্ন রয়েছে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে দাবি থাকা দশম ওয়েজ বোর্ডও বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। জবাবে উপদেষ্টা বলেন, ‘অবশ্যই বাস্তবায়ন করব। আমি আপনার সঙ্গে দ্বিমত করছি না।”

নবম ও দশম ওয়েজ বোর্ড একসঙ্গে বাস্তবায়ন করা হবে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “একসঙ্গে হবে।”

এই উপদেষ্টা বলেন, “নিশ্চয়ই করব এবং আমি এটা একেবারেই নীতিগতভাবে একমত। আমরা যদি সাংবাদিকদের চাকরি এবং তাদের জীবিকার সঠিক নিশ্চয়তা দিতে না পারি, তাহলে আমরা ভালো সাংবাদিকতা পাব না।”

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নজর
ব্রিফিংয়ে মূল্যস্ফীতি ও নতুন বেতন কাঠামো নিয়েও কথা বলেন জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেন, “বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি ৫ থেকে ৬ শতাংশের মধ্যে থাকলে তা সহনীয় ও ভালো পর্যায়ের বলে বিবেচিত হয়। কিন্তু, দেশে দীর্ঘদিন মূল্যস্ফীতি দুই অঙ্কে ছিল। বর্তমানে তা কিছুটা কমেছে।”

নতুন পে-স্কেলের কারণে মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “বিপুলসংখ্যক মানুষের বেতন বাড়লে মূল্যস্ফীতির কিছুটা ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তবে, নতুন বেতন কাঠামোয় সবার বেতন দ্বিগুণ হয়ে যাবে বিষয়টি এমন নয়। নতুন বেতন স্কেল না হওয়ায় অনেক সরকারি কর্মচারীর নিয়মিত ইনক্রিমেন্টের মাধ্যমে বর্তমান বেতন নতুন স্কেলের কাছাকাছি চলে গেছে। ফলে নতুন স্কেল কার্যকর হলে অনেকের বেতন প্রত্যাশিত হারে বাড়বে না।”

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংক তার হাতে থাকা বিভিন্ন নীতিগত উপকরণ ব্যবহার করবে জানিয়ে তিনি বলেন, “সরকারও প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপ নেবে। পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দিতে সামাজিক সহায়তা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।”

৪০ লাখ পরিবার পাবে ফ্যামিলি কার্ড
জাহেদ উর রহমান বলেন, “বছরের শেষ নাগাদ ৪০ লাখ পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় আনার লক্ষ্য রয়েছে। এ নিয়ে সরকার নিবিড়ভাবে কাজ করছে এবং প্রায় নিখুঁত একটি তালিকা তৈরির চেষ্টা চলছে।”

৪০ লাখ পরিবারে গড়ে পাঁচজন সদস্য ধরলে প্রায় দুই কোটি মানুষ এ সহায়তার আওতায় আসবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দুই কোটি মানুষের কাছে প্রতি মাসে এ সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।” এ ছাড়া খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি, ওএমএস ও টিসিবির পণ্য বিক্রির আওতাও বাড়ানো হয়েছে বলে জানান তিনি। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষকে সুরক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।

দ্রুত স্বাভাবিক হবে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিয়েও বিস্তারিত কথা বলেন তথ্য উপদেষ্টা। তিনি বলেন, “বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট সমাধানে দুই বছর সময় লাগবে- অর্থমন্ত্রীর এমন বক্তব্যের সঠিক ব্যাখ্যা প্রয়োজন। দুই বছর পর বাংলাদেশ বর্তমান সংকটের আগের অবস্থায় ফিরবে, বিষয়টি এমন নয়। বরং স্বল্প সময়ের মধ্যেই আগের অবস্থায় পৌঁছানোর আশা করছে সরকার।”

তিনি বলেন, “বর্তমানে বিদ্যুৎ সংকটের পেছনে যান্ত্রিক ও সরবরাহজনিত কিছু সাময়িক সমস্যা রয়েছে। গ্যাসিফিকেশন ইউনিটের সমস্যা ও সরবরাহের ঘাটতি দূর হলে পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হবে।”

বাংলাদেশে অতীতেও লোডশেডিং ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, “বহু বছরেও সারাদেশে সবসময় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ ছিল না। বড় শহরগুলোতে লোডশেডিং তুলনামূলক কম থাকলেও দেশের সর্বত্র নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ছিল- এমন তথ্য সঠিক নয়।” এ বিষয়ে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে সাংবাদিকদের দেওয়ার কথাও জানান তিনি।

দুই বছরে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির বড় উন্নতির আশা
দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতির উন্নয়নে সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে জাহেদ উর রহমান বলেন, “নতুন একটি এফএসআরইউ আনার অর্ডার দেওয়া হয়েছে। এটি দেশে আসতে প্রায় দুই বছর সময় লাগবে। একই সঙ্গে এলএনজি আমদানি বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।” তবে, আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম বেশি থাকায় এটি সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

দেশীয় গ্যাসের উৎস বাড়াতেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে জানিয়ে এই উপদেষ্টা বলেন, “বাপেক্স ১৫০টি কূপ খনন ও পুনঃখননের কাজ করছে। ভোলার গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে নিয়ে আসার জন্য ৫০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্পও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।”

বিকল্প জ্বালানি ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রসঙ্গে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “সেপ্টেম্বরে এর পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরুর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। আগামী বছর থেকে এটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর দিকে যাবে।”

সব মিলিয়ে দুই বছরের মধ্যে বর্তমানের তুলনায় অনেক ভালো বিদ্যুৎ পরিস্থিতি তৈরি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন জাহেদ উর রহমান। তখন শহর ও গ্রাম মিলিয়ে প্রায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব হবে বলেও জানান তিনি।

মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি বড় অনিশ্চয়তা
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে সরকার অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস দেখাতে চায় না বলেও সতর্ক করেন তথ্য উপদেষ্টা। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিকে বড় অনিশ্চয়তা হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে এলএনজি সরবরাহ ও দামের ওপর তাৎক্ষণিক চাপ তৈরি হতে পারে বলে জানান জাহেদ উর রহমান।

তিনি বলেন, “গত বছর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এলএনজির দাম যেখানে প্রতি ইউনিটে ১২ থেকে ১৩ ডলারের মতো ছিল, বর্তমানে তা বেড়ে ২৪ থেকে ২৫ ডলারে পৌঁছেছে। পরিস্থিতি আরো খারাপ হলে দাম ৩০ ডলারের ওপরে যেতে পারে।” এমন পরিস্থিতি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলা সরকারের জন্য কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলে জানান তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা।

(ওএস/এএস/সেপ্টেম্বর ০১, ২০২৬)