স্পোর্টস ডেস্ক : আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনস আইরেসের ঐতিহাসিক লা বোকা এলাকাটি সবসময়ই ফুটবল উন্মাদনায় মুখরিত থাকে। বিখ্যাত বোকা জুনিয়র্স স্টেডিয়াম ঘিরে গড়ে ওঠা এই এলাকার অলিগলিতে এখন শুধু বিষাদের সুর।

সেখানে দেয়ালে আঁকা লিওনেল মেসির বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরার বিশালাকার ম্যুরালগুলোর সামনে শত শত মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন, শেষবারের মতো শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন তাদের প্রিয় নায়ককে। পুরো বুয়েনস আইরেস শহরজুড়ে জাতীয় সব স্মৃতিস্তম্ভ ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো আর্জেন্টিনার জাতীয় পতাকার নীল-সাদা আলোয় সাজানো হয়েছে।

আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে দুই দশকের রূপকথাতুল্য ক্যারিয়ারের ইতি টানার ঘোষণা দিয়েছেন জাতীয় বীর লিওনেল মেসি। একসময়ের শান্ত, লাজুক খুদে বিস্ময় থেকে গোটা দেশের ঐক্যের প্রতীকে পরিণত হওয়া এই কিংবদন্তির বিদায় কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না আর্জেন্টাইনরা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের হাতে লেখা একটি অত্যন্ত আবেগঘন বার্তার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্তটি নিশ্চিত করেন মেসি। তিনি জানান, চলতি ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে কষ্টদায়ক ১-০ গোলের হারের ঠিক দুদিন পরেই চিঠিটি তিনি লিখে রেখেছিলেন।

এত বছরের দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর পথচলা শেষে নিজের শারীরিক ও মানসিক অবস্থার কথা উল্লেখ করে আবেগতাড়িত মেসি লেখেন, ‘জাতীয় দলকে আর দেওয়ার মতো কিছুই আমার অবশিষ্ট ছিল না। এই সিদ্ধান্তটি নেওয়া অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক ছিল, এখনও হৃদয়ের গভীরে খুব কষ্ট হচ্ছে, তবে আমি অনুধাবন করতে পারছি যে থেমে যাওয়ার সঠিক সময় এটাই এসে গেছে।’

৩৯ বছর বয়সী এই কিংবদন্তির বিদায়ের বার্তাটি একেবারে অপ্রত্যাশিত ছিল না। সাম্প্রতিক সময়ে তার ফুটবল ক্যারিয়ার ও জীবনের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা, বাবা হোর্হে মেসির প্রয়াণ তার ওপর গভীর মানসিক প্রভাব ফেলেছিল। তা সত্ত্বেও এই আনুষ্ঠানিক বিদায়ের খবর শুনে ভেঙে পড়েছেন সাধারণ সমর্থকরা।

স্থানীয় অনুরাগী সেবাস্তিয়ান লুনা কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে নিজের অনুভূতি জানাতে গিয়ে বলেন, ‘আমরা মেসিকে ভালোবাসতেই থাকব। কেবল তার অলৌকিক ফুটবলের জন্য নয়, তার অপরিসীম বিনয় ও অসাধারণ ব্যক্তিত্বের জন্য। খেলা শেষ হতে পারে, কিন্তু মেসি চিরকাল আমাদের হৃদয়ে রাজত্ব করবেন।’

ফুটবলপ্রেমীদের বিশাল একটি অংশ এখন থেকেই দাবি তুলতে শুরু করেছেন, যেন ১০ নম্বর জার্সিটিকে মেসির সম্মানার্থে চিরতরে অবসর দেওয়া হয়। যদিও আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্থা ফিফার কড়া নিয়মের কারণে জাতীয় দলে এমনটা করার সুযোগ নেই।

নিজের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে আর্জেন্টিনার হয়ে রেকর্ড ছয়টি বিশ্বকাপ খেলেছেন মেসি। তবে ক্যারিয়ারের শুরুর দুই দশকে দেশকে কোনো বড় ট্রফি এনে দিতে না পারার কারণে জাতীয় দলের জার্সিতে তাকে অগণিত সমালোচনা সহ্য করতে হয়েছে। স্বদেশি কিংবদন্তি দিয়েগো ম্যারাডোনার সঙ্গে তার প্রতিনিয়ত তুলনা করা হতো।

কিন্তু ২০২১ সালের কোপা আমেরিকা এবং পরবর্তীতে ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপ জয়ের পর সমস্ত হিসাব-নিকাশ পাল্টে যায়। রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভেদ ভুলে গোটা আর্জেন্টিনা জাতি তাকে ম্যারাডোনার পাশাপাশি জাতীয় ঐক্যের পরম প্রতীক হিসেবে বরণ করে নেয়।

বুয়েনস আইরেসের প্রবীণ ভক্ত কার্লোস সিয়াতা আবেগ চেপে রেখে বলেন, ‘আমি ম্যারাডোনাকে খেলতে দেখেছি, মারিও কেম্পেসকে দেখেছি, কিন্তু মেসি সবার চেয়ে আলাদা, অনন্য। তার এই অবসরের খবরটা মাথায় এক বালতি বরফপানি ঢেলে দেওয়ার মতো ধাক্কা দিল। তবে তার বাবার মৃত্যুর পর হয়তো এমনটা হওয়ারই কথা ছিল। আমরা তাকে ভীষণ মিস করব, তার মতো আর কেউ এই পৃথিবীতে দ্বিতীয়বার আসবে না।’

দেশের হয়ে সর্বোচ্চ ২০৭ ম্যাচে রেকর্ড ১২৫টি গোল করা এবং রেকর্ড আটবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী এই মহাতারকার অবসরে আন্তর্জাতিক ফুটবল অঙ্গনে শ্রদ্ধার জোয়ার বইছে। কাতার বিশ্বকাপে মেসির কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ট্রফি জেতা সতীর্থ আনহেল দি মারিয়া নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করে বলেন, ‘আমার কেবল মনে হয়, আমি সঠিক শতাব্দীতে জন্মেছিলাম বলেই তোমার এই জাদু দেখতে পেরেছি, উপভোগ করতে পেরেছি। আর সবচেয়ে বড় কথা, এতগুলো বছর জাতীয় দলে তোমার পাশে খেলার পরম সৌভাগ্য আমার হয়েছে।’

মেজর লিগ সকারের ক্লাব ইন্টার মায়ামি এবং জাতীয় দলে মেসির আরেক সতীর্থ রদ্রিগো দি পল লিখেছেন, ‘আমাদের এত আনন্দ দেওয়ার জন্য তোমাকে অজস্র ধন্যবাদ, সর্বকালের সেরা। তুমি আমাদের জন্য চিরন্তন।’

চলতি বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে পরাজিত হলেও জাতীয় দলকে নিজের সবটুকু উজাড় করে দিয়ে এক সোনালী অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটালেন মেসি। তবে এই মহাতারকার বিদায় একই সঙ্গে আর্জেন্টাইন ফুটবলে এক অমোচনীয় শূন্যতার সৃষ্টি করেছে।

একদিকে যেমন প্রধান কোচ লিওনেল স্কালোনির তৈরি করা দলটির ভবিষ্যৎ নিয়ে হাজারো প্রশ্ন উঠছে, অন্যদিকে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (এএফএ) ভেতরের দুর্নীতি ও আর্থিক অনিয়মের তদন্ত ঘিরে দেশের ফুটবল অঙ্গন চরম অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

নানাবিধ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটে জর্জরিত আর্জেন্টিনার সাধারণ মানুষের কাছে লিওনেল মেসি কেবল একজন ফুটবলার ছিলেন না, ছিলেন প্রতিদিনের লড়াই শেষে এক চিলতে বাঁধভাঙা আনন্দের উৎস।

জাতীয় দলকে সব দিয়ে যাওয়া এই মহানায়ক নিজের বিদায়বার্তায় দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে শেষ লাইনে লিখেছেন, ‘সতীর্থদের সঙ্গে মিলে একসময় যে স্বপ্নগুলোর কথা আমরা কেবল কল্পনা করতাম, তা আপনাদের উপহার দিতে পেরেছি, এই পরম প্রশান্তি ও আত্মতৃপ্তি নিয়েই আমি বিদায় নিচ্ছি।’

(ওএস/এএস/সেপ্টেম্বর ০২, ২০২৬)