চুক্তিভিত্তিক আমদানি: কাগজ কমুক, তদারকি থাকুক
মো. ইমদাদুল হক সোহাগ
একটি ছোট কারখানার কাছে সময়ই পুঁজি। কাঁচামালের চালান আটকে গেলে উৎপাদন ব্যাহত হয়, ক্রেতার কাছে সময়মতো সরবরাহের প্রতিশ্রুতি ঝুঁকিতে পড়ে। ধাক্কা সামলাতে বাড়তি মজুত রাখতে গেলে কার্যকর মূলধনও আটকে যায়।
এই বাস্তবতায় ২৩ আগস্টের আমদানি নীতি আদেশ, ২০২৬–২০২৯—যা ২৪ আগস্ট গেজেটে প্রকাশিত হয়েছে—ব্যবসার জন্য গুরুত্বপূর্ণ স্বস্তির ইঙ্গিত দেয়। প্রযোজ্য নীতি, বৈদেশিক মুদ্রা বিধি ও পণ্যভিত্তিক শর্ত মেনে শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতের আমদানিযোগ্য পণ্য ক্রয় বা বিক্রয়চুক্তির মাধ্যমে আনলে আগের বার্ষিক ৫ লাখ মার্কিন ডলারের সীমা আর নেই।
কিন্তু নীতিটির আসল পরীক্ষা ঘোষণায় নয়, লেনদেনের পথে। একটি চালানের চুক্তি, প্রো ফরমা ইনভয়েস, পেমেন্টের রেকর্ড ও বিল অব এন্ট্রি কি একবারের তথ্যেই এগোবে, নাকি ব্যাংক, কাস্টমস ও আমদানি নিবন্ধন কর্তৃপক্ষের আলাদা দরজায় আটকে থাকবে? দ্বিতীয়টি হলে সহজীকরণ কেবল কাগজেই থাকবে।
সহজীকরণকে তদারকি শিথিল করার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা যাবে না। নীতিটি এলসি তুলে দেয়নি, সব পণ্যের জন্য বাধাহীন পথও খুলে দেয়নি। আমদানি নিবন্ধন, বৈদেশিক মুদ্রা, শুল্ক ও অর্থপাচারবিরোধী বিধি বহাল আছে। এলসি লেনদেনের নথিগত শৃঙ্খলা দেয়; কিন্তু সেটি একা পণ্যের মূল্য, বর্ণনা, অর্থের উৎস বা পণ্য দেশে প্রবেশের প্রমাণ নিয়ে সব ঝুঁকি দূর করে না। আবার চুক্তিভিত্তিক আমদানিও কোনো অন্ধ ছাড় নয়। উভয় ক্ষেত্রেই দরকার নির্ভরযোগ্য যাচাই।
এই যাচাইয়ের ভিত্তি শূন্য থেকে গড়তে হবে না। ১৩ আগস্টের বাংলাদেশ ব্যাংক সার্কুলার অনুযায়ী, অনুমোদিত ডিলার ব্যাংককে এলসি খোলা বা অনুমোদিত আমদানি শুরুর আগে প্রাসঙ্গিক ইন্ডেন্ট, প্রো ফরমা ইনভয়েস বা ক্রয়-বিক্রয়চুক্তি নিতে হয় এবং প্রাথমিক আমদানি-তথ্য অনলাইন আমদানি পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থায় পাঠাতে হয়। পণ্যের বিবরণ, মূল্য ও আট অঙ্কের এইচএস কোডের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পরে আমদানিকারক প্রত্যয়িত বিল অব এন্ট্রি বা কাস্টমস-সনদিত ইনভয়েস দিলে, অনুমোদিত ডিলার তা আগে দাখিল করা আইএমপি ফরম ও ইনভয়েসের সঙ্গে মিলিয়ে যাচাই করে ফল অনলাইন ব্যবস্থায় জানায়।
সমস্যা নথির ঘাটতিতে নয়; এক বাণিজ্যিক লেনদেনের বিবরণ আলাদা ব্যবস্থায় বিচ্ছিন্ন থাকে বলেই জট তৈরি হয়। চুক্তি, আমদানিকারকের নিবন্ধন, এইচএস কোড, চালান, পেমেন্ট ও শুল্ক ছাড়—সবই ওই লেনদেনের অংশ। সময়মতো মিল না হলে নিয়ম মেনে চলা ব্যবসায়ী কাগজপত্রে আটকে যান, আবার প্রকৃত গরমিলও নজর এড়িয়ে যেতে পারে।
সমাধান আরেকটি অনুমোদনস্তর নয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাস্টমস কর্তৃপক্ষ এবং আমদানি ও রপ্তানি প্রধান নিয়ন্ত্রকের দপ্তরকে নিয়ে ৯০ দিনের একটি বাস্তবায়ন রূপরেখা তৈরি করা উচিত। সেখানে ঠিক হবে—কোন নথি কোন সংস্থা কোন আইনগত প্রয়োজনে দেখবে, গরমিল হলে কার জবাবদিহি থাকবে এবং সীমিত পরীক্ষামূলক কার্যক্রম কোথা থেকে শুরু হবে। লক্ষ্য কোনো বিশাল তথ্যপ্রযুক্তি প্রকল্প ঘোষণা নয়।
প্রথম ধাপে ব্যাংকের কাছে চুক্তি উপস্থাপনের সময় একটি একক আমদানি-রেফারেন্স নম্বর দেওয়া যেতে পারে। একই চুক্তিতে একাধিক চালান বা কিস্তি থাকলে মূল নম্বরের অধীনে উপ-নম্বর থাকবে। আইএমপি ফরম, পেমেন্ট, শুল্ক ঘোষণা ও বিল অব এন্ট্রিতে সেই পরিচিতি ব্যবহার হবে। ফলে চুক্তির মূল্য ও মুদ্রা, সরবরাহকারী, আমদানিকারকের নিবন্ধন, এইচএস কোড এবং চালানের রেকর্ড একই সূত্রে মিলবে। বাড়তি কোনো কাগজ তৈরি হবে না; বিদ্যমান নথিগুলোর পরিচিতি এক জায়গায় মিলবে।
এতে কোনো সংস্থার ক্ষমতা অন্য সংস্থার হাতে যাবে না। কাস্টমস তার আইন অনুযায়ী মূল্যায়ন ও শুল্কের সিদ্ধান্ত নেবে। ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রা বিধি ও নিজস্ব সতর্কতামূলক যাচাই করবে। আমদানি নিবন্ধন কর্তৃপক্ষও তার আইনগত দায়িত্ব পালন করবে। একক নম্বরটি শুধু সবাইকে একই লেনদেন চিনতে সাহায্য করবে। গরমিল হলে ব্যবসায়ীকে আবার কাগজ নিয়ে ঘুরতে না পাঠিয়ে একবারেই জানাতে হবে কী ঘাটতি, কোন সংস্থা তা দেখছে এবং কখন উত্তর মিলবে।
তথ্য বিনিময়েরও সীমা থাকা চাই। সব কর্মকর্তা সব নথি দেখবেন—এমন ব্যবস্থা অযৌক্তিক ও ঝুঁকিপূর্ণ। যার আইনগত দায়িত্বে যতটুকু তথ্য প্রয়োজন, সে কেবল ততটুকুই দেখবে; কে কোন রেকর্ড দেখলেন, তার ডিজিটাল নথি থাকবে। সংবেদনশীল চুক্তি, মূল্য বা সরবরাহকারীর তথ্য অপ্রয়োজনে ছড়িয়ে পড়লে ব্যবসার আস্থা নষ্ট হবে, সংস্কারও দুর্বল হবে।
সব চালান একই ঝুঁকির নয়। নথি পূর্ণাঙ্গ এবং তথ্য সঙ্গতিপূর্ণ হলে নিয়মিত চালানের দ্রুত নিষ্পত্তি লক্ষ্য হওয়া উচিত। কিন্তু মূল্য, পণ্যের শ্রেণিবিন্যাস, উৎপত্তির দেশ, পেমেন্টের মেয়াদ বা পণ্য দেশে প্রবেশের প্রমাণে অস্বাভাবিকতা থাকলে বিস্তারিত যাচাই দরকার। অস্বাভাবিক মূল্য, বারবার নথি বদল বা সম্পর্কিত পক্ষের সঙ্গে লেনদেনেও বাড়তি সতর্কতা লাগতে পারে। এতে বৈধ ব্যবসায়ীর সময় বাঁচবে এবং কর্তৃপক্ষ প্রকৃত ঝুঁকিতে মনোযোগ দিতে পারবে।
ঝুঁকি বাছাইয়ের প্রতিটি সূত্র প্রকাশ করার দরকার নেই; তাতে অসাধু পক্ষ ব্যবস্থা এড়িয়ে চলার পথ খুঁজে পাবে। কিন্তু সেবার নিয়ম অবশ্যই প্রকাশ্য থাকা চাই। কোন নথি লাগবে, প্রশ্ন কে তুলেছে, কী ঘাটতি আছে, কত দিনে জবাব মিলবে এবং অনিচ্ছাকৃত ভুল কীভাবে সংশোধন করা যাবে—এসব ব্যবসায়ীকে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে। একই নথি আবার চাইলে তার লিখিত কারণও থাকা উচিত।
শুরু করা যায় তিন মাসের সীমিত পাইলট দিয়ে। কয়েকটি অনুমোদিত ডিলার ব্যাংক এবং একটি প্রধান শুল্ক স্টেশনে পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবস্থা চালু হলে বাস্তব জটগুলো ধরা পড়বে। ফল দেখে ধাপে ধাপে তা বিস্তৃত করা যাবে। প্রথমেই অতিরিক্ত ফি, পৃথক পোর্টাল বা ইচ্ছানির্ভর অনুমোদনের আরেকটি স্তর যোগ হলে সংস্কারই নতুন বাধা হয়ে দাঁড়াবে।
সংস্কারের হিসাব নিতে হবে ব্যবসায়ীর সময়ের হিসাব ধরে। প্রতি তিন মাসে প্রতিষ্ঠানের পরিচয় গোপন রেখে চুক্তিভিত্তিক আমদানির গড় নিষ্পত্তি সময়, বিল অব এন্ট্রির সঙ্গে মিল হওয়া লেনদেনের হার, গরমিল মীমাংসার সময় এবং অনিয়মে নেওয়া ব্যবস্থার সমষ্টিগত তথ্য প্রকাশ করা যেতে পারে। তাতে বোঝা যাবে, বিলম্ব কমছে কি না এবং তদারকি বাস্তবেই কার্যকর হচ্ছে কি না।
এই নকশা সবচেয়ে জরুরি ছোট ব্যবসার জন্য। বড় প্রতিষ্ঠানের আইনজীবী, নিয়মপালনের দল ও অতিরিক্ত মজুত রাখার সামর্থ্য থাকে; ছোট কারখানার থাকে না। তাদের প্রয়োজন সহজ নির্দেশনা, একটি নির্দিষ্ট যোগাযোগকেন্দ্র এবং উত্তর পাওয়ার সুস্পষ্ট সময়সীমা। নইলে নীতির সুবিধা বেশি পাবে সেই ব্যবসাগুলোই, যারা একসঙ্গে কয়েকটি আলাদা ব্যবস্থা সামলাতে পারে।
আমদানি নীতি আদেশের সাফল্য শুধু এলসির সংখ্যা কমল কি না, তা দিয়ে মাপা যাবে না। প্রশ্ন হলো, নিয়ম মেনে চলা ব্যবসায়ী কি পূর্বানুমানযোগ্য সময়ে পণ্য আনতে পারছেন এবং রাষ্ট্র কি সন্দেহজনক লেনদেন দ্রুত ও যথাযথভাবে শনাক্ত করতে পারছে। কাগজ কমার সাফল্য তখনই, যখন তার সঙ্গে জবাবদিহির পথটিও স্পষ্ট থাকে।
লেখক : ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক, কলাম লেখক ও উদ্যোক্তা।
