রঘুনাথ খাঁ, সাতক্ষীরা : সাতক্ষীরা শহরতলীর তালতলা এলাকার বিসমিল্লাহ ফুড্স এর কর্মচারি কোহিনুর খাতুনকে হত্যার ঘটনায় থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। মঙ্গলবার রাতে নিহতের ভাই সাতক্ষীরা সদরের লাবসা ইউনিয়নের খেলারডাঙা গ্রামের ইমরান হোসেন বাদি হয়ে কারো নাম উল্লেখ করে সদর থানায় এ মামলা দায়ের করেন। পুলিশ হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে বিসমিল্লাহ ফুডস এর মালিক সাতক্ষীরা শহরের কাটিয়া লস্করপাড়ার আব্দুর রহমানের ছেলে।

আজ বুধবার সকালে সরেজমিনে খেলারডাঙা গ্রামে গেলে প্রয়াত মুনসুর রহমানের স্ত্রী রেবেকা খাতুন জানান, ১৭ বছর আগে পাটকেলঘাটার লালচন্দ্রপুর গ্রামের আবু মুছার সাথে তার মেয়ে কোহিনুর খাতুনের বিয়ে দেন। পরবর্তীতে জামাতা মাদকাসক্ত হয়ে পড়ায় স্ত্রী কোহিনুর ও তাদের একমাত্র সন্তান হাফেজ মোহাম্মদ মুন্নার ভরনপোষণ যোগাড় করতে পারতো না। অভাবকে কেন্দ্র করে সংসারে অশান্তি লেগেই থাকতো। একপর্যায়ে ২০২১ সালের প্রথম দিকে কাহিনুর তার একমাত্র সন্তান মুন্নাকে নিয়ে বাপের বাড়িতে চলে আসে। ছেলে মুন্নাকে বল্লী ইউনিয়নের আমতলা ছিদ্দিকিয়া-বরকতিয়া হেফজোখানা ও এতিমখানায় ভর্তি করা হয়। চলতি বছরে মুন্না ওই প্রতিষ্ঠান থেকে হাফেজ পাস করে। বাপের বাড়িতে আসার পর থেকে কোহিনুর প্রথমে বিনেরপোতার ঢাকা ফুডস ও পরে সাতক্ষীরার একটি বেকারীতে কাজ করতো। তবে আড়াই বছর যাবৎ সে মাসিক আট হাজার টাকা বেতনে কাটিয়া লস্করপাড়ার আব্দুস সোবহানের মালিকানাধীন তালতলার “বিসমিল্লাহ ফুডস” কারখানায় কাজ করতো। তবে ওই কারখানার মালিকের স্ত্রী মঞ্জুয়ারা বেগম তার মেয়ে কোহিনুরের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে গণ্ডগোল করতো।

নিহতের ছেলে মোহাম্মদ মুন্না জানান, বিসমিল্লাহ ফুডস এ কাজ করাকালিন তার মা কোহিনুরকে পাশ^বর্তী আমজাদ হোসেনের স’মিলের এক কর্মচারির সঙ্গে সখ্যতা দেখতে পায়। একপর্যায়ে ওই কর্মচারি তার মায়ের সঙ্গে ছবি তুলে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে দেন। বর্তমানে তার মায়ের সঙ্গে বিসমিল্লাহ ফুড এর মালিকের স্ত্রী ঋ’শিল্পীর পানির প্লান্টের কর্মী মঞ্জুয়ারা পথিমধ্যে ও কারখানায় যেয়ে বিভিন্ন সময়ে গণ্ডগোল করতো। সোমবার বিকেল সোয়া ৫টার দিকে তার মা কারখানার উদ্দেশ্যে নানার বাড়ি থেকে বের হয়ে যান। ওইদিন বিকেলে কারখানা মালিকের স্ত্রী মঞ্জুয়ারা বেগম কারখানার মধ্যে ও কারখানার ফটকের সামনে মারপিট করে। মা চলে আসতে চাইলে মালিক তাকে আবার ডেকে কারখানায় নিয়ে যায়। রাতে মা আর বাড়ি ফেরেনি। সোমবার রাত ১১টার দিকে মায়ের ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে তালতলা এলাকার আব্দুল খালেকের পানিবন্ধি জমি থেকে তার মায়ের লাশ উদ্ধার করা হয়। তার মাকে কে বা কাহারা ফোনে বিরক্ত করতো বলে তিনি কয়েকদিন আগে সিম পাল্টান। বিসমিল্লাহ ফুড এর মালিক আব্দুস সোবহানের সঙ্গে তার মায়ের অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগ এনে মালিকের স্ত্রী মঞ্জুয়ারা খাতুনের বিরোধকে কেন্দ্র করে তার মাকে সোমবার রাতে কারখানা থেকে বাড়ি ফেরার পথে নৃশংসভাবে খুন করা হয়েছে।

কোহিনুরের স্বামী পাটকেলঘাটা থানাধীন লাল চন্দনপুরের আবু মুছা জানান, দীর্ঘ ৫ বছরেরর বেশি সময় ধরে কোহিনুর ও ছেলে মুন্না তার সঙ্গে যোগাযোগ রাখে না। সাংবাদিকদের কল্যাণে কোহিনুরের মৃত্যু সম্পর্কে তিনি জানতে পেরেছেন।

তালতলা বিসমল্লিাহ ফুডস এর পার্শ্ববর্তী বাসিন্দা শফিকুল ইসলামের ছেলে ইজিবাইক চালাক আবু হাসান ও জহিরুল ইসলাম জানান, পার্শ্ববর্তী স’মিল মালিক আমজাদ হোসেনের ঘর ভাড়া নিয়ে বিসমিল্লাহ ফুডস এর সাতজন কর্মচারি বসবাস করতো। কুশখালি গ্রামের আবু তালেব তার শ্বশুর আব্দুস সোবহানের মাধ্যমে গত ৫ বছর ধরে “বিসমিল্লাহ ফুডস’ কারখানাটি পরিচালনা করে আসছেন। এক বছর আগে কারখানার নারী কর্মী কোহিনুরের সাথে কারখানার মুল মিস্ত্রী কালিগঞ্জের চম্পাফুল ঢালী পাড়ার আরিফুল ইসলামের বিরোধকে কেন্দ্র করে দ’ুজনকেই ছাটাই করেন আব্দুস সোবহান।

দুই মাস পরে তাদেরকে আবারো কাজে ফিরিয়ে আনা হয়। সম্প্রতি কোহিনুরের সাথে সোবহানের অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। প্রতি রাতে কাজ শেষে কোহিনুরকে নিজের মটর সাইকেলে করে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া ছাড়াও কোহিনুরের সাথে মাঝে মাঝে নিকটবর্তী কোন স্থানে সময় কাটাতেন সোবহান। বিষয়টি জানতে পেরে সোবহানের স্ত্রী মঞ্জুয়ারা বেগম কয়েকবার কারখানায় এসে কোহিনুরকে মারপিট করেছে। সোমবার বিকেল ৫টার দিকে কারখানায় এসে মালিক সোবহানের স্ত্রী মঞ্জুয়ারা বেগম হঠাৎ করে কোহিনুরকে মারপিট করে চলে যায়। রাত আটটায় ডিউটি শেষে কোহিনুরকে ব্যস্ততার মধ্য দিয়ে চলে যেতে দেখা যায়। সে তাদের কারখানার শ্রমিকদের ভাড়া বাসার পাস দিয়ে যাওয়ার সময় খুন হতে পারে। অধিক রাতে কোহিনুরের লাশ সেখান থেকে আব্দুল খালেকের পানিবন্ধি জমিতে ফেলে দিয়ে আসা হয়েছে বলে মনে করেন তারা। তবে এ হত্যার সঙ্গে আব্দুস সোবহানের স্ত্রী মঞ্জুয়ারা খাতুনের হাত থাকতে পারে বলে তারা আশাঙ্কা করছেন।

বিসমিল্লাহ ফুডস এর মিস্ত্রী আরিফুল ইসলাম জানান, তার এক আত্মীয় পানিতে ডুবে মারা যাওয়ার ঘটনায় সোমবার নিজ বাড়ি চম্পাফুলে যান। মঙ্গলবার সকাল ১১টার দিকে কারখানায় ফিরে কোহিনুরের মৃত্যূর খবর পান। বিকেলে কোহিনুরের লাশ মাটি দেওয়া হবে শুনে তার বাপের বাড়িতে গিয়েছিলেন তিনিসহ কয়েকজন শ্রমিক। তবে ভাই ইমরান থানায় অবস্থান করায় মাটি দিতে দেরী হবে বলে তারা চলে আসেন। তবে রাতে বাপের বাড়ির সামনে কোহিনুরকে কবরস্থ করা হয়।

খেলারডাঙা গ্রামের ইমরান হোসেন বলেন, তার বোন কোহিনুরকে কে বা কারা সোমবার রাত ৮টা থেকে মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টার মধ্যে হত্যা করে খালেকের জমিতে ফেলে রেখে গেছে।
কোহিনুরকে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃত আব্দুস সোবহান জানান, তার আদি বাড়ি কালিগঞ্জের কৃষ্ণনগর ইউনিয়নের রঘুনাথপুরে। কয়েক বছর আগে তিনি শহরের কাটিয়া লস্করপাড়ায় জমি কিনে বাড়ি তৈরি করে বসবাস শুরুর পাশাপাশি তালতলায় নিজ প্রতিষ্ঠিত বিসমিল্লাহ ফুডস কারখানা পরিচালনা করেন। কারখানার শ্রমিক কোহিনুরের সঙ্গে তার অনৈতিক সম্পর্কের বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, এ নিয়ে তার স্ত্রী মঞ্জুয়ারা বেগমের সঙ্গে বিরোধ হতো। তবে কোহিনুর ও তার ছেলে মুন্নার পড়াশুনায় তিনি সার্বিক সহায়তা করতেন। মঙ্গলবার বিকেল তিনটার দিকে কারখানা থেকে পুলিশ তাকে জিজ্ঞাজাসাবাদের জন্য থানায় ডেকে আনে। কোহিনুর হত্যার সঙ্গে তার কোন সম্পর্ক নেই বলে দাবি করেন তিনি।

এ ব্যাপারে মঞ্জুয়ারা খাতুনের মুঠোফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলে তা বন্ধ পাওয়া যায়।
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাতক্ষীরা সদও হাসপাতালের একজন ডাক্তার জানান, কোহিনুরকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে।

সাতক্ষীরা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ মাহাবুবর রহমান জানান, কোহিনুরকে শ্বাসরোধ করে হত্যার ঘটনায় তার ভাই ইমরান হোসেন বাদি হয়ে কারো নাম উল্লেখ না করে মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। এ ঘটনায় সন্ধিগ্ধ আসামী হিসেবে বিসমিল্লাহ ফুডস এর মালিক আব্দুস সোবহানকে গ্রেপ্তার করে বুধবার দুপুরে আদালতের মধ্যেমে জেলখানায় পাঠানো হয়েছে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতে রিমা- আবেদন করা হবে। উপপরিদর্শক শাহাদাৎ হোসেনকে মামলার তদন্তভার দেওয়া হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের খুঁজে বের করতে পুলিশ চেষ্টা অব্যহত রেখেছে।

(আরকে/এসপি/সেপ্টেম্বর ০২, ২০২৬)