আন্তর্জাতিক ডেস্ক : বিদেশে বাস্তুচ্যুত হয়ে থাকা নিজেদের নাগরিকদের ‘নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণভাবে’ দেশে ফেরানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে মিয়ানমার। তবে একই সঙ্গে দেশটি আবারও রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠীর স্বতন্ত্র জাতিগত পরিচয় ও অস্তিত্ব অস্বীকার করেছে। মালয়েশিয়া থেকে প্রায় ১ হাজার ৫০০ মানুষকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর প্রস্তুতির মধ্যে বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে।

মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, বাংলাদেশ ও বন্ধুত্বপূর্ণ দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে যাচাই করা বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের স্বেচ্ছায় ‘নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণভাবে’ দেশে ফেরার ব্যবস্থা করতে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

তবে একই বিবৃতিতে রোহিঙ্গাদের বিষয়ে নিজেদের আগের অবস্থানও পুনর্ব্যক্ত করেছে মিয়ানমার।

দেশটির দাবি, ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি এমন একটি জাতিগত পরিচয়কে বোঝায়, যার কোনো অস্তিত্ব মিয়ানমারে কখনো ছিল না। বৃহস্পতিবার দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কয়েকটি দেশে পালিত ‘রোহিঙ্গা গণহত্যা স্মরণ দিবস’-এরও নিন্দা জানিয়েছে।

মালয়েশিয়া ও মিয়ানমারের মধ্যে প্রত্যাবাসন নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে মূলত রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা নিয়ে। জাতিসংঘ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো আশঙ্কা করছে, মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হলে রোহিঙ্গারা আবারও নিপীড়ন ও নির্যাতনের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।

গত জুলাইয়ে মালয়েশিয়া জানিয়েছিল, মিয়ানমার ৫ হাজার রোহিঙ্গাকে দেশে ফিরিয়ে নিতে সম্মত হয়েছে। ২০১৭ সাল থেকে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সহিংস বৈষম্য ও নিপীড়নের অভিযোগ রয়েছে। তবে প্রথম দফায় সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে প্রায় ১ হাজার ৫০০ মিয়ানমারের নাগরিককে স্বেচ্ছায় দেশে ফেরত পাঠানোর কথা জানিয়েছে দুই দেশ। এই দফায় কতজন রোহিঙ্গা থাকবেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

২০১৭ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ব্যাপক দমন-পীড়নের পর দেশটি থেকে লাখ লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেন। ওই সামরিক অভিযানের ঘটনাকে কেন্দ্র করেই আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার মামলা চলছে।

বর্তমানে বাংলাদেশে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছেন। তারা সীমান্তের ওপারে বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী বসতিগুলোর একটিতে অবস্থান করছেন। মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা হলেও এখন পর্যন্ত তা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি পায়নি।

মালয়েশিয়াতেও প্রায় ১ লাখ ২৬ হাজার রোহিঙ্গা রয়েছেন। তাদের পাশাপাশি মিয়ানমারের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর আরও বহু বাস্তুচ্যুত নাগরিক দেশটিতে বসবাস করছেন।

রোহিঙ্গাদের জাতিগত পরিচয় নিয়ে মিয়ানমারের অবস্থান দীর্ঘদিনের। দেশটি রোহিঙ্গাদের স্বতন্ত্র জনগোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। মিয়ানমারের দাবি, তারা বাংলাদেশ থেকে যাওয়া অভিবাসীদের বংশধর। এ কারণেই দেশটির কর্তৃপক্ষ সাধারণত ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটিও ব্যবহার করতে অস্বীকৃতি জানায়।

মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বৃহস্পতিবারও সেই অবস্থান ধরে রেখে বলেছে, ‘রোহিঙ্গা’ পরিচয়টি মিয়ানমারে কখনো বিদ্যমান ছিল না- এমন একটি জাতিগত পরিচয়ের ‘মিথ্যা দাবি’ করে।

অন্যদিকে, মালয়েশিয়ার যোগাযোগমন্ত্রী ফাহমি ফাদজিল বলেছেন, কোনো মিয়ানমারের নাগরিককে এমন পরিস্থিতিতে দেশে ফেরত পাঠানো হবে না, যেখানে তার ওপর নিপীড়নের আশঙ্কা রয়েছে বা তার জীবন হুমকির মুখে পড়তে পারে।

তবে মানবাধিকার পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, রোহিঙ্গাদের পরিচয়ই যেখানে মিয়ানমার অস্বীকার করে, সেখানে তাদের দেশে ফেরত পাঠানো হলে নতুন করে মানবাধিকার লঙ্ঘনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) বলা হয়েছে, রোহিঙ্গাদের ‘স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসইভাবে’ দেশে ফেরার মতো প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি বর্তমানে মিয়ানমারে নেই।

এদিকে মালয়েশিয়ায় থাকা অনেক অভিবাসী বর্তমানে আটককেন্দ্রেও রয়েছেন। ফলে তাদের দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত কতটা স্বাধীনভাবে নেওয়া হচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন নিয়ে চলমান এই পরিস্থিতিতে মিয়ানমারের নতুন করে পরিচয় অস্বীকারের অবস্থান এবং নিরাপদ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ নিয়ে জাতিসংঘ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর উদ্বেগ আরও গভীর হয়েছে।

তথ্যসূত্র : বিবিসি

(ওএস/এএস/সেপ্টেম্বর ০৪, ২০২৬)