খালি রিকশার চাকার নিচে বিদ্যুৎ
মীর আব্দুল আলীম
রাজধানীর সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা নিয়ে কথা বলতে গেলে আমরা সাধারণত যানজট, দুর্ঘটনা, সড়কের শৃঙ্খলা কিংবা গণপরিবহনের সংকটের কথা বলি। কিন্তু এর আড়ালে যে আরেকটি বড় জাতীয় অপচয় নীরবে প্রতিদিন ঘটে যাচ্ছে, সেটি নিয়ে খুব কমই আলোচনা হয়। আর সেটি হলো বিদ্যুতের অপচয়। সম্প্রতি ব্যাটারিচালিত যানবাহনের চলাচল নিয়ে একটি সরেজমিন জরিপ করতে গিয়ে যে চিত্র চোখে পড়েছে, তা শুধু বিস্মিত করার মতো নয়, বিদ্যুৎ-সংকটের এই সময়ে রীতিমতো উদ্বেগজনক।
ঢাকার বনশ্রীর সি এভিনিউ সড়কের এক পাশে দাঁড়িয়ে নিজে একটি সরেজমিন জরিপ চালাতে গিয়ে এমন একটি চিত্র চোখে পড়ল, যা কেবল যানজট বা সড়কের বিশৃঙ্খলার গল্প নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জাতীয় সম্পদের ভয়াবহ অপচয়ের প্রশ্ন। আমি যে হিসাবটি করেছি, সেটি কোনো সরকারি পরিসংখ্যান নয়, কোনো প্রতিষ্ঠানের গবেষণাও নয়। এটি একটি নির্দিষ্ট সড়কের এক পাশে দাঁড়িয়ে নিজের চোখে দেখা যানবাহনের প্রবাহের সরেজমিন হিসাব। মাত্র এক মিনিটে ওই সড়কের এক পাশ দিয়ে প্রায় ৫০টি ব্যাটারিচালিত যান চলাচল করতে দেখেছি। ১ ঘণ্টা জরিপে দেখা গেছে এই ৩ হাজার ২১ টি ব্যাটারিচালিত যান কেবল ঐ রাস্তার এক পাশ দিয়েই চলাচল করেছে। দুই পাশের হিসাব এখানে ধরা হয়নি। অথচ সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই বিপুলসংখ্যক যানবাহনের মধ্যে প্রায় ৩ হাজারের মতো ছিল ব্যাটারিচালিত রিকশা এবং এর মধ্যে আনুমানিক ১ হাজার ৩০০ শত ৪০টি রিকশা ছিল একেবারেই খালি, কোনো যাত্রী নেই, তবু রাস্তায় ছুটছে। তারা যাত্রী বহন করছে না; তারা শুধু যাত্রী খুঁজছে। আর যাত্রী খুঁজতে যে দূরত্ব তারা অতিক্রম করছে, তার জন্য যে বিদ্যুৎ ব্যাটারিতে জমা করা হয়েছে, সেটিই তখন পরিণত হচ্ছে নিছক অপচয়ে।
দুই পাশেও যদি কাছাকাছি প্রবাহ থাকে, তাহলে সংখ্যাটি প্রায় ৬ হাজারে পৌঁছাতে পারে। আবার এই হিসাব একটি নির্দিষ্ট সময়ের একটি নির্দিষ্ট সড়কের। রাজধানীর আরও অসংখ্য সড়ক, মহল্লা, সংযোগপথ ও প্রধান সড়কে একই ধরনের ব্যাটারিচালিত যান চলাচল করছে। ফলে বনশ্রীর সি এভিনিউয়ের এই ছোট্ট সরেজমিন পর্যবেক্ষণটি আসলে একটি বড় নগরবাস্তবতার দিকে আঙুল তোলে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, অনেক রিকশা যাত্রী নামিয়ে দিয়ে আবার যাত্রীর সন্ধানে ছুটছে। কেউ সামনে যাচ্ছে, কেউ পেছনে ফিরছে, কেউ রাস্তার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাচ্ছে, কেউ আবার একই এলাকায় চক্কর দিচ্ছে। অর্থাৎ একই যাত্রীর জন্য একাধিক রিকশা প্রতিযোগিতা করছে এবং সেই প্রতিযোগিতার বড় একটি অংশ হচ্ছে খালি অবস্থায়। এই খালি চলাচলই বিদ্যুৎ ব্যবহারের দক্ষতাকে ভয়াবহভাবে কমিয়ে দিচ্ছে।
একটি ব্যাটারিচালিত রিকশা যখন যাত্রী বহন করে, তখন তার বিদ্যুৎ ব্যবহারের একটি যৌক্তিকতা আছে। মানুষকে তার গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। একজন শ্রমিক তার জীবিকা নির্বাহ করছেন। একজন নাগরিক তার প্রয়োজনীয় যাতায়াতের সুযোগ পাচ্ছেন। কিন্তু একই রিকশা যখন যাত্রী ছাড়াই দীর্ঘ সময় ধরে শুধু যাত্রী খুঁজতে ঘুরছে, তখন সেই বিদ্যুতের ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। কারণ সেখানে কোনো যাত্রী পরিবহন হচ্ছে না, কোনো অতিরিক্ত পরিবহনসেবা সৃষ্টি হচ্ছে না; শুধু ব্যাটারির চার্জ খরচ হচ্ছে এবং সড়কে একটি অতিরিক্ত যান জায়গা দখল করছে। একটি খালি রিকশা হয়তো একবারে খুব বেশি বিদ্যুৎ খরচ করে না। কিন্তু রাজধানীর হাজার হাজার রিকশা যদি প্রতিদিন একইভাবে খালি ঘুরতে থাকে, তাহলে সামান্য সামান্য অপচয় মিলেই বিরাট অপচয়ে পরিণত হয়। যে বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি লাগে, অর্থ লাগে, অবকাঠামো লাগে, সেই বিদ্যুৎ যদি শেষ পর্যন্ত যাত্রী ছাড়াই রাস্তায় ঘুরতে থাকা রিকশার ব্যাটারি ক্ষয় করতে ব্যবহৃত হয়, তাহলে সেটিকে নিছক পরিবহন সমস্যা বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
আমার সরেজমিন পর্যবেক্ষণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি এখানেই। একটি নির্দিষ্ট এলাকায় যত যাত্রী আছে, তাদের পরিবহনের জন্য যদি প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি রিকশা একই সময়ে রাস্তায় থাকে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই একটি বড় অংশকে যাত্রীবিহীন অবস্থায় চলতে হবে। একজন চালক রাস্তায় বসে থাকলে তার আয় নেই। তাই সে যাত্রী পাওয়ার আশায় ঘুরছে। অন্য চালকরাও একই কাজ করছেন। ফলে একদিকে যাত্রী পাওয়ার জন্য চালকদের মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়ছে, অন্যদিকে একই যাত্রীর জন্য অতিরিক্ত সংখ্যক রিকশা রাস্তায় ঘুরছে। এই ব্যবস্থায় চালকেরও লাভ হচ্ছে না, যাত্রীরও স্বস্তি নেই, সড়কেরও শৃঙ্খলা থাকছে না এবং বিদ্যুতেরও সাশ্রয় হচ্ছে না। বরং একটি রিকশা যখন যাত্রী নিয়ে তার গন্তব্যে যাচ্ছে, তার পেছনে হয়তো আরও কয়েকটি রিকশা খালি অবস্থায় একই এলাকায় ঘুরছে। এভাবে একটি পরিবহন চাহিদা মেটাতে প্রয়োজনের তুলনায় দ্বিগুণ বা তারও বেশি যান রাস্তায় থাকলে তা কোনোভাবেই দক্ষ পরিবহনব্যবস্থা হতে পারে না।
আমরা প্রতিনিয়ত বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের কথা বলি। বাসাবাড়িতে অপ্রয়োজনীয় বাতি বন্ধ করতে বলি, অফিসে বিদ্যুৎ ব্যবহারে সতর্ক হতে বলি, শিল্পকারখানাকে জ্বালানি সাশ্রয়ের পরামর্শ দিই। বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য রাষ্ট্র বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করে। কিন্তু বিদ্যুৎ ব্যবহারের জায়গায় যদি দক্ষতা নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে শুধু উৎপাদন বাড়িয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। ব্যাটারিচালিত রিকশা সেই বিদ্যুতেরই একটি বড় ভোক্তা। তাই এই যানবাহনের চার্জিং ও চলাচল ব্যবস্থাপনাকেও বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে দেখতে হবে। একটি রিকশা কতক্ষণ চার্জ হচ্ছে, কত দূরত্ব যাচ্ছে, তার কতটা যাত্রী নিয়ে এবং কতটা যাত্রী ছাড়া এসব তথ্য নিয়ে কখনো কি সমন্বিত গবেষণা হয়েছে? আমার মনে হয়, এখন সেই গবেষণার সময় এসেছে। কারণ শুধু কত রিকশা আছে, সেই হিসাব যথেষ্ট নয়; কত রিকশা কতটা কার্যকরভাবে চলছে, সেই হিসাবও প্রয়োজন।
রাজধানীজুড়েই একই চিত্র। বনশ্রীর সি এভিনিউয়ে দাঁড়িয়ে আমি যে দৃশ্য দেখেছি, সেটিকে শুধু বনশ্রীর সমস্যা বললে ভুল হবে। এই চিত্র রাজধানীর বহু এলাকায় কমবেশি একই। তাই বনশ্রীর সি এভিনিউয়ের আমার জরিপটি কোনোভাবেই পুরো ঢাকার পরিসংখ্যান নয়; বরং রাজধানীর বড় একটি সমস্যার একটি দৃশ্যমান নমুনা। আর নমুনাটি যদি এত বড় হয়, তাহলে পুরো রাজধানীতে প্রতিদিন কত বিদ্যুৎ শুধু যাত্রী খোঁজার জন্য রাস্তায় চলতে থাকা খালি রিকশার পেছনে ব্যয় হচ্ছে, সেটি নিশ্চয়ই হিসাব করার মতো একটি বিষয়।
সমাধান রিকশা বন্ধ করে দেওয়া নয়। সমাধান হলো ব্যবস্থাপনাকে কার্যকর করা। কত এলাকায় কত রিকশা প্রয়োজন, তার বৈজ্ঞানিক হিসাব করতে হবে। রিকশার জন্য নির্দিষ্ট স্ট্যান্ড থাকতে পারে। যাত্রী নামানোর পর চালককে অযথা দীর্ঘ সময় ঘুরে বেড়ানোর পরিবর্তে নির্দিষ্ট যাত্রী সংগ্রহস্থলে যাওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। প্রযুক্তিনির্ভর যাত্রী-চাহিদা ব্যবস্থাপনা চালু করা গেলে খালি রিকশার ঘোরাঘুরি অনেকটাই কমানো সম্ভব। একটি এলাকায় যদি যাত্রীর চাহিদা কম থাকে, সেখানে অতিরিক্ত রিকশার প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। আবার ব্যস্ত এলাকায় নির্দিষ্ট রুট ও স্ট্যান্ডের মাধ্যমে রিকশার চলাচল সংগঠিত করা যেতে পারে। এতে চালকের আয় কমানোর প্রয়োজন নেই; বরং অযথা খালি ঘোরার কারণে যে সময় ও চার্জ নষ্ট হচ্ছে, সেটি বাঁচিয়ে চালকও লাভবান হতে পারেন।
অপচয়ের বিরুদ্ধে এখনই নিতে হবে। আমরা প্রায়ই বলি, দেশের বিদ্যুৎ ঘাটতি আছে, উৎপাদন বাড়াতে হবে, জ্বালানি আমদানি করতে হবে। কিন্তু বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি বিদ্যুতের প্রতিটি ইউনিট কতটা দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার হচ্ছে, সেই প্রশ্নও করতে হবে। যে বিদ্যুৎ দিয়ে একটি হাসপাতাল চলতে পারে, একটি কারখানার মেশিন চালু থাকতে পারে, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম চলতে পারে, সেই বিদ্যুতের একটি অংশ যদি প্রতিদিন অপ্রয়োজনীয়ভাবে খালি রিকশা ঘোরাতে ব্যয় হয়, তাহলে বিষয়টি নতুন করে ভাবতেই হবে। এটি শুধু চালকের সমস্যা নয়, শুধু রিকশার সমস্যা নয়, শুধু যানজটের সমস্যাও নয়। এটি নগর ব্যবস্থাপনা ও জাতীয় সম্পদ ব্যবহারের সমস্যা।
তাই এখন সময় এসেছে ব্যাটারিচালিত রিকশাকে শুধু যানজটের বোঝা হিসেবে না দেখে বিদ্যুৎ ব্যবহারের দক্ষতার প্রশ্নেও দেখার। রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে বৈজ্ঞানিকভাবে জরিপ করা হোক। কত রিকশা চলছে, কতটি যাত্রী বহন করছে, কতটি খালি, কতক্ষণ খালি চলছে এবং এতে আনুমানিক কত বিদ্যুৎ ব্যয় হচ্ছে সব হিসাব সামনে আনা হোক। তারপর প্রয়োজন অনুযায়ী রিকশার সংখ্যা, রুট, স্ট্যান্ড ও চলাচলের নিয়ম নির্ধারণ করা হোক।
বিদ্যুৎ শুধু একটি রিকশার ব্যাটারিতে জমা থাকা চার্জ নয়। এর পেছনে আছে রাষ্ট্রের অর্থ, মানুষের শ্রম, জ্বালানি এবং জাতীয় সম্পদ। সেই বিদ্যুৎ যদি যাত্রী বহনের বদলে হাজার হাজার খালি রিকশার চাকার সঙ্গে প্রতিদিন রাস্তায় ঘুরে ঘুরে নিঃশেষ হয়ে যায়, তাহলে তাকে আর সাধারণ অপচয় বলা যায় না। এটি জাতীয় সম্পদের নীরব, কিন্তু ভয়াবহ অপচয়।
লেখক :সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
