বাগেরহাট প্রতিনিধি : বাগেরহাট জেলায় দিন দিন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে ডেঙ্গু পরিস্থিতি। চলতি বছরের শুরু থেকে গত শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত জেলায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ১৮৫ জন। সরকারি হিসাবে এ সময়ে ডেঙ্গুতে একজনের মৃত্যুর তথ্য থাকলেও স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ১২ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। নিহতদের মধ্যে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, শিশু ও প্রবীণ রয়েছেন।

বাগেরহাট সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১ জানুয়ারি থেকে ৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জেলায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ১ হাজার ১৮৫ জনের মধ্যে সুস্থ হয়েছেন ১ হাজার ৪৪ জন। বর্তমানে জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ১০৭ জন। এর মধ্যে কচুয়ায় ৫ জন, বাগেরহাট সদরে ৫৯ জন, মোরেলগঞ্জে ৯ জন, চিতলমারীতে ১৩ জন, ফকিরহাটে ৪ জন, মোল্লাহাটে ২ জন এবং মোংলায় ১৫ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

তবে জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও স্থানীয় সূত্রে খোঁজ নিয়ে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ১২ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে বাগেরহাট সদর উপজেলায় ডেঙ্গুতে মারা গেছেন জিপিএ-৫ পাওয়া মেধাবী শিক্ষার্থী রিয়া মজুমদার (১৭)। সদর উপজেলার বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের সাহসপুর গ্রামের এই শিক্ষার্থী গত ২৯ আগস্ট মারা যান। বাগেরহাট পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সাহাপাড়া এলাকার শিক্ষক সুমন সাহা (৩৮) মারা যান গত ৩১ আগস্ট। এছাড়া পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব বাসাবাটি গ্রামের ফকির বুজরুক আলী (৮২) মারা যান গত ১ সেপ্টেম্বর।

কচুয়া উপজেলায় ডেঙ্গুতে মারা গেছেন অনার্স প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী জিহাদ হাসান (২২)। উপজেলার রাড়িপাড়া ইউনিয়নের চন্দ্রপাড়া গ্রামের এই তরুণের মৃত্যু হয় গত ২৯ আগস্ট। একই উপজেলায় দিগন্ত (১৫) নামে এক কিশোর গত ১৮ মে মারা যান। এছাড়া একই উপজেলার খান মোহাম্মদ লিয়াকত আলী (৫৩) মারা যান গত ১৬ আগস্ট এবং গোপালপুর গ্রামের শামসুর রহমান (৭৫) মারা যান গত ২৬ মে। মোরেলগঞ্জ উপজেলায় চ-ীপুর গ্রামের শিক্ষার্থী সুমাইয়া আক্তার মিতু (১৮) মারা যান গত ২৬ আগস্ট। একই উপজেলার বিষখালী গ্রামের রাধারানী দাস (৪২) মারা যান গত ৫ জুন।

ফকিরহাট উপজেলায় মাদ্রাসাশিক্ষার্থী মো. রমজান আলী মোল্লা (২৩) মারা যান গত ২৮ আগস্ট এবং একই উপজেলার সাতসইয়া গ্রামের তুলি বেগম (৪৭) মারা যান গত ২৬ আগস্ট। এছাড়া মোংলা পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা দুই বছরের শিশু ইফা আক্তার মারা যায় গত ১৯ জুলাই।
সরকারি হিসাবের সঙ্গে স্থানীয়ভাবে পাওয়া মৃত্যুর সংখ্যার পার্থক্যের বিষয়ে বাগেরহাটের সিভিল সার্জন

ডা. আ.স. মো. মাহবুবুল আলম বলেন, বাগেরহাটের বাইরে গিয়ে কিংবা কোনো বেসরকারি ক্লিনিকে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর মৃত্যু হলে তা সরকারি হিসাবের মধ্যে আসে না। জেলা সদর হাসপাতালসহ জেলার ৯টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও হাসপাতাল থেকে তথ্য সংগ্রহ করে সরকারি হিসাব তৈরি করা হয়। ফলে জেলার বাইরে বা অন্য কোনো হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে কারও মৃত্যু হলে তা সরকারি তালিকায় যুক্ত হচ্ছে না। গত মে মাস থেকে জেলায় ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা দিলেও নিয়ম অনুযায়ী ১ জানুয়ারি থেকে হিসাব শুরু করা হয়। এছাড়া বর্তমানে বাগেরহাটের ডেঙ্গু পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল পর্যায়ে রয়েছে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে এ মুহূর্তে জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা সবচেয়ে বেশি জরুরি। বিশেষ করে বাড়িঘর ও আশপাশে বৃষ্টির পানি কিংবা অন্য কোনো পানি জমে থাকলে দ্রুত তা পরিষ্কার করতে হবে। ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ারও আহ্বান জানান তিনি।

বাগেরহাট জেলা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. অসীম কুমার সমাদ্দার বলেন, বাগেরহাট ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য ২৫টি শয্যা রয়েছে। গত চার মাস ধরে এ হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ৫০ জনের বেশি রোগী ভর্তি থাকছেন। এর মধ্যে অনেক রোগী ডায়রিয়া, কিডনি ও হৃদ্রোগসহ বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে আসছেন। তাদের মধ্যেও অনেকে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছেন। সব মিলিয়ে জেলার ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভালো নয়। ২৫০ শয্যার হাসপাতালটি পরিচালনার জন্য ১০০ শয্যার হিসাব অনুযায়ী অর্থ বরাদ্দ দিচ্ছে সরকার। বর্তমানে জেলা হাসপাতালে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে ৪৬৫ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন। এর মধ্যে হাসপাতালটিতে তীব্র জনবল সংকট রয়েছে। বিপুলসংখ্যক রোগীকে চিকিৎসাসেবা দিতে আমাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।

(এস/এসপি/সেপ্টেম্বর ০৬, ২০২৬)