ড. মাহরুফ চৌধুরী


একটি জাতির ভবিষ্যৎ মূলত নির্ধারিত হয় তার শিক্ষাব্যবস্থার চরিত্র, দর্শন ও উদ্দেশ্য দ্বারা। অর্থনীতি, রাজনীতি, প্রযুক্তি কিংবা সামরিক শক্তি কোনো রাষ্ট্রকে সাময়িকভাবে শক্তিশালী ও প্রভাবশালী করে তুলতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে একটি জাতির সভ্যতা, মানবিকতা, নৈতিকতা এবং সৃজনশীল সক্ষমতার ভিত্তি নির্মাণ করে জাতীয় আদর্শ ও মূল্যবোধের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা একটি সুপরিকল্পিত ও কার্যকর শিক্ষাব্যবস্থা। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, যেসব জাতি শিক্ষা, জ্ঞানচর্চা এবং মুক্তবুদ্ধির বিকাশকে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারে পরিণত করতে পেরেছে, তারাই টেকসই উন্নয়ন, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং সাংস্কৃতিক উৎকর্ষ অর্জনে সফল হয়েছে। অন্যদিকে শিক্ষার অবক্ষয়, জ্ঞানচর্চার সংকোচন এবং বৌদ্ধিক স্বাধীনতার অবরুদ্ধতা প্রায়শই একটি জাতির সামগ্রিক পশ্চাৎপদতার পূর্বলক্ষণ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই কারণেই শিক্ষার সংকট মূলত জাতির সংকট, আর শিক্ষার মুক্তি মানেই জাতির মুক্তির সম্ভাবনা। শিক্ষা কেবল কর্মসংস্থানের উপযোগী মানবসম্পদ তৈরির প্রক্রিয়া নয়; এটি মানুষের চিন্তা, বিবেক, বিচারবোধ, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং নাগরিক চেতনা গঠনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। একটি জাতি কী ধরনের মানুষ গড়ে তুলতে চায়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে কী ধরনের মূল্যবোধ হস্তান্তর করতে চায় এবং রাষ্ট্রকে কোন আদর্শিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে চায় তার প্রতিফলন সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা যায় তার শিক্ষানীতিতে এবং শিক্ষাব্যবস্থায় সেটার বাস্তব প্রয়োগে।

বাংলাদেশের শিক্ষা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে তাই একটি কঠিন কিন্তু অত্যন্ত প্রয়োজনীয় প্রশ্ন সামনে আসে: আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কি সত্যিই জ্ঞানচর্চা, মুক্তবুদ্ধি ও মানবিক বিকাশের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে, নাকি ধীরে ধীরে তারা রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও গোষ্ঠীগত প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র হয়ে উঠছে? এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়, কারণ সমস্যাটি কেবল কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা সময়পর্বের নয়; বরং এটি শিক্ষা, রাষ্ট্র এবং ক্ষমতার সম্পর্ককে ঘিরে গড়ে ওঠা একটি গভীর কাঠামোগত বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কিত। প্রকৃতপক্ষে রাষ্ট্রীয় পরিধিতে শিক্ষা ও রাজনীতির সম্পর্ক নতুন কোনো বিষয় নয়। প্রাচীনকালের গ্রীক দার্শনিক প্লেটো (খ্রিস্টপূর্ব ৪২৭-খ্রিস্টপূর্ব ৩৪৭) থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের মার্কিন শিক্ষাবিদ জন ডিউই (১৮৫৯-১৯৫২) কিংবা ব্রাজিলীয় শিক্ষাবিদ পাওলো ফ্রেইরি (১৯২১-১৯৯৭) পর্যন্ত প্রায় সকল শিক্ষাচিন্তকই শিক্ষা ও নাগরিক জীবনের পারস্পরিক সম্পর্কের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। মানুষ সমাজে বসবাস করে, রাষ্ট্রের কাঠামোর মধ্যে জীবনযাপন করে; ফলে শিক্ষা কখনোই সম্পূর্ণভাবে রাজনীতির বাইরে অবস্থান করতে পারে না। বরং একটি সুস্থ শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম দায়িত্ব হলো শিক্ষার্থীদের সচেতন, দায়িত্বশীল ও অংশগ্রহণমূলক নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা, যাতে তারা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং মানবিক দায়িত্ব সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা লাভ করতে পারে।

কিন্তু রাজনৈতিক সচেতনতা এবং দলীয় আনুগত্য এক বিষয় নয়। নাগরিক শিক্ষা মানুষকে স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে শেখায়, প্রশ্ন করতে শেখায় এবং যুক্তির আলোকে মতামত গঠন করতে সক্ষম করে। পক্ষান্তরে দলীয়করণ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিচয়ের অনুগত কাঠামোয় আবদ্ধ করে ফেলে, যেখানে স্বাধীন চিন্তা ও সমালোচনামূলক বোধের পরিবর্তে আনুগত্য, অনুসরণ এবং ক্ষমতাকেন্দ্রিক অবস্থান অধিক গুরুত্ব পায়। এখানেই আমাদের সবচেয়ে বড় বিভ্রান্তি এবং সংকট নিহিত। যখন রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরির পরিবর্তে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো দলীয় প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্র হয়ে ওঠে, তখন শিক্ষা তার মৌলিক উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হয়। আর যখন শিক্ষা তার মৌলিক উদ্দেশ্য হারায়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় কেবল শিক্ষাব্যবস্থা নয়; ক্ষতিগ্রস্ত হয় একটি জাতির ভবিষ্যৎ, তার বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তি এবং তার সামগ্রিক উন্নয়ন ও অগ্রগতির সম্ভাবনা। আমাদের মনে রাখতে হবে যে শিক্ষা কেবল তথ্য মুখস্থ করার নাম নয়, আর শিক্ষিত হওয়া মানেই কেবল সনদ অর্জন নয়। প্রকৃত শিক্ষা হলো মানুষকে চিন্তা করতে শেখানো, প্রশ্ন করতে শেখানো, সত্য অনুসন্ধানের সাহস জাগিয়ে তোলা এবং নিজের বিবেকের সঙ্গে সংলাপ করার সক্ষমতা অর্জনে সহায়তা করা। শিক্ষা মানুষের মস্তিষ্ককে যেমন সমৃদ্ধ করে, তেমনি তার নৈতিক বোধ, মানবিকতা এবং বিচারক্ষমতাকেও বিকশিত করে। একটি সমাজে শিক্ষার প্রকৃত সাফল্য নির্ধারিত হয় কতজন মানুষ তথ্য জানে তার দ্বারা নয়; বরং কতজন মানুষ স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে পারে, যুক্তির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য নির্ণয় করতে সক্ষম হয়, তার দ্বারা।

পাওলো ফ্রেইরি তাঁর বহুল আলোচিত গ্রন্থ ‘অত্যাচারিতের শিক্ষা’ (পেডাগোজি অব দ্যা অপ্রেসড)-এ দেখিয়েছিলেন যে, শিক্ষা যদি কেবল তথ্য জমা রাখার একটি যান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়, তাহলে তা মুক্ত মানুষ নয়, বরং অনুগত মানুষ তৈরি করে। তিনি এই পদ্ধতিকে ‘শিক্ষার ব্যাংকিং মডেল’ (ব্যাংকিং মডেল অব এডুকেশন) নামে অভিহিত করেছিলেন, যেখানে শিক্ষার্থীকে একটি খালি পাত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং শিক্ষক তার মধ্যে তথ্য জমা করেন। এই ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীর চিন্তা, প্রশ্ন, সৃজনশীলতা কিংবা অভিজ্ঞতার কোনো মূল্য থাকে না। ফলে শিক্ষা জ্ঞানচর্চার পরিবর্তে কর্তৃত্বের পুনরুৎপাদনের হাতিয়ারে পরিণত হয়। ফ্রেইরির মতে, প্রকৃত শিক্ষা হলো সংলাপভিত্তিক, অংশগ্রহণমূলক এবং মুক্তিকামী; যা মানুষকে বিদ্যমান বাস্তবতাকে বোঝার পাশাপাশি প্রয়োজন হলে তাকে পরিবর্তন করার সক্ষমতাও প্রদান করে। প্রকৃতপক্ষে প্রশ্ন করার ক্ষমতাই মানবসভ্যতার অগ্রগতির অন্যতম চালিকাশক্তি। প্রাচীন গ্রীক দার্শনিক সক্রেটিসের (খ্রিস্টপূর্ব ৪৭০–খ্রিস্টপূর্ব ৩৯৯) অনুসন্ধিৎসু প্রশ্ন, গ্যালিলিওর বৈজ্ঞানিক কৌতূহল, ইংরেজ বিজ্ঞানী আইজাক নিউটনের (১৬৪৩–১৭২৭) পর্যবেক্ষণ, ব্রিটিশ ভারতীয় কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৬১–১৯৪১) মুক্তচিন্তা কিংবা ব্রিটিশ ভারতীয় বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসুর (১৮৫৮-১৯৩৭) গবেষণামনস্কতা সবকিছুর কেন্দ্রেই ছিল প্রতিষ্ঠিত ধারণাকে প্রশ্ন করার সাহস। জ্ঞান কখনো স্থির নয়; এটি ক্রমাগত অনুসন্ধান, পরীক্ষা, বিতর্ক এবং পুনর্মূল্যায়নের মাধ্যমে বিকশিত হয়। তাই যে শিক্ষাব্যবস্থা প্রশ্ন করাকে নিরুৎসাহিত করে, ভিন্নমতকে সন্দেহের চোখে দেখে কিংবা সমালোচনামূলক চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, সে শিক্ষাব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনশক্তিকে দুর্বল করে ফেলে।

দুঃখজনকভাবে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম বড় সংকট হলো, অনেক ক্ষেত্রেই আমরা শিক্ষাকে জ্ঞানার্জনের পরিবর্তে আনুগত্যের অনুশীলনে পরিণত করি। শিক্ষার্থীদের শেখানো হয় কীভাবে পরীক্ষায় ভালো ফল করতে হবে, কিন্তু সবসময় শেখানো হয় না কীভাবে স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে হবে। তারা শিখে কীভাবে নির্ধারিত উত্তর পুনরুৎপাদন করতে হয়, কিন্তু শিখে না কীভাবে নতুন প্রশ্ন উত্থাপন করতে হয়। তারা শিখে কীভাবে মূল্যায়ন পদ্ধতিতে সফল হতে হয়, কিন্তু অনেক সময় শিখে না কীভাবে জটিল সামাজিক, রাজনৈতিক কিংবা নৈতিক সমস্যার সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ করতে হয়। ফলে শিক্ষা ধীরে ধীরে অনুসন্ধিৎসু মনের বিকাশের পরিবর্তে মুখস্থনির্ভর সাফল্যের সংস্কৃতিকে শক্তিশালী করে। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা অল্প বয়স থেকেই এমন একটি সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হয়, যেখানে ক্ষমতার প্রতি প্রশ্নহীন আনুগত্যকে গুণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। তারা শেখে কীভাবে ক্ষমতাবানকে খুশি রাখতে হয়, কিন্তু শেখে না কীভাবে সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে হয়। তারা শেখে কীভাবে প্রচলিত কাঠামোর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হয়, কিন্তু শেখে না কীভাবে অন্যায়, বৈষম্য বা ভুল সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যুক্তিপূর্ণ অবস্থান নিতে হয়। অথচ ইতিহাসের প্রতিটি ইতিবাচক সামাজিক পরিবর্তনের পেছনে ছিল এমন মানুষ, যারা প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতার সামনে নত না হয়ে সত্য, ন্যায় এবং মানবিকতার পক্ষে দাঁড়ানোর সাহস দেখিয়েছিল।

এই বাস্তবতায় শিক্ষার মৌলিক উদ্দেশ্যকে নতুন করে স্মরণ করা জরুরি। শিক্ষা যদি মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা, নৈতিক সাহস এবং সমালোচনামূলক চিন্তার বিকাশ ঘটাতে না পারে, তাহলে তা কেবল দক্ষ কর্মী তৈরি করতে পারলেও সচেতন নাগরিক তৈরি করতে পারবে না। আর যে সমাজে সচেতন, চিন্তাশীল ও নৈতিকভাবে দায়িত্বশীল নাগরিকের সংখ্যা কমে যায়, সেখানে গণতন্ত্র দুর্বল হয়, উদ্ভাবন থেমে যায় এবং জাতীয় উন্নয়নও দীর্ঘমেয়াদে বাধাগ্রস্ত হয়। তাই শিক্ষার প্রকৃত শক্তি নিহিত রয়েছে মানুষের মধ্যে প্রশ্ন করার সাহস, সত্য অনুসন্ধানের আগ্রহ এবং স্বাধীনভাবে চিন্তা করার সক্ষমতা গড়ে তোলার মধ্যেই। শিক্ষা ও শিক্ষাঙ্গনের রাজনৈতিকীকরণ আজ আমাদেরকে এক গভীর ও বহুমাত্রিক সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এর প্রভাব কেবল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা রাষ্ট্র, সমাজ এবং জাতির ভবিষ্যৎ বিকাশের ওপরও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলছে। একটি শিক্ষাব্যবস্থার প্রধান দায়িত্ব হলো মুক্তবুদ্ধির বিকাশ, জ্ঞানচর্চার প্রসার এবং মানবিক ও দক্ষ নাগরিক গড়ে তোলা। কিন্তু যখন শিক্ষাঙ্গন রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, দলীয় প্রভাব বিস্তার কিংবা ক্ষমতার কেন্দ্র দখলের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহৃত হতে শুরু করে, তখন শিক্ষা তার মৌলিক উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হয়। এর ফলে জ্ঞানচর্চার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, বৌদ্ধিক স্বাধীনতা সংকুচিত হয় এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে তার নৈতিক ও একাডেমিক বিশ্বাসযোগ্যতা হারাতে শুরু করে।

ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী পিয়েরে বুর্দিয়ো (১৯৩০–২০০২) শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে কেবল জ্ঞান বিতরণের স্থান হিসেবে দেখেননি; বরং তিনি বিশ্লেষণ করেছিলেন কীভাবে শিক্ষা অনেক সময় বিদ্যমান সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা কাঠামোকে পুনরুৎপাদন করে। তাঁর ‘সাংস্কৃতিক পুঁজি’ এবং ‘সামাজিক পুনরুৎপাদন’ তত্ত্ব দেখায় যে, শিক্ষা সবসময় নিরপেক্ষভাবে কাজ করে না; অনেক ক্ষেত্রে এটি সমাজে বিদ্যমান ক্ষমতা, মর্যাদা এবং সুযোগের অসম বণ্টনকে নতুন রূপে টিকিয়ে রাখতে ভূমিকা রাখে। অর্থাৎ যে সমাজে বৈষম্য, পক্ষপাত বা ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ রয়েছে, সেই সমাজের শিক্ষাব্যবস্থা যথাযথভাবে সংস্কার ও সুরক্ষিত না হলে অনিচ্ছাকৃতভাবেও সেই বৈষম্য ও ক্ষমতাকাঠামোকেই দীর্ঘস্থায়ী করতে পারে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই বিশ্লেষণ বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। যখন শিক্ষাঙ্গনে দলীয় পরিচয়, রাজনৈতিক আনুগত্য কিংবা গোষ্ঠীগত সংশ্লিষ্টতা মেধা, নৈতিকতা, পেশাগত দক্ষতা ও যোগ্যতার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেতে শুরু করে, তখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তার বৌদ্ধিক স্বাধীনতা হারানোর ঝুঁকিতে পড়ে। নিয়োগ, পদোন্নতি, নেতৃত্ব নির্বাচন, গবেষণা সুযোগ কিংবা একাডেমিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে যদি যোগ্যতার পরিবর্তে রাজনৈতিক পরিচয় প্রভাব বিস্তার করে, তাহলে শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরে ধীরে ধীরে একটি অস্বাস্থ্যকর সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। এতে মেধাবী ও স্বাধীনচেতা ব্যক্তিরা নিরুৎসাহিত হন, আর আনুগত্যভিত্তিক সংস্কৃতি ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

এর সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় শিক্ষার মূল চরিত্রের ওপর। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর পরিচয় তখন আর প্রধানত জ্ঞানচর্চাকারী, গবেষক কিংবা অনুসন্ধিৎসু নাগরিক হিসেবে থাকে না; বরং তারা বিভিন্ন রাজনৈতিক বা গোষ্ঠীগত অবস্থানের প্রতিনিধি হিসেবে বিবেচিত হতে শুরু করে। শিক্ষাঙ্গনের সম্পর্কগুলোও তখন একাডেমিক সহযোগিতা ও বৌদ্ধিক বিনিময়ের পরিবর্তে ক্ষমতা ও প্রভাবের সমীকরণ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতে থাকে। ফলত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে এমন এক পরিবেশের জন্ম হয়, যেখানে মতের বৈচিত্র্যকে সম্পদ হিসেবে না দেখে অনেক সময় সন্দেহের চোখে দেখা হয়, আর ভিন্নমতকে জ্ঞানতাত্ত্বিক বিতর্কের বিষয় হিসেবে নয়, বরং রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়। এই পরিস্থিতির একটি স্বাভাবিক পরিণতি হলো বিভক্ত শিক্ষাঙ্গনের সৃষ্টি। সেখানে প্রশ্নের পরিবর্তে স্লোগান, যুক্তির পরিবর্তে আনুগত্য এবং গবেষণার পরিবর্তে অবস্থানগত পক্ষপাত প্রাধান্য পেতে শুরু করে। জটিল সামাজিক, অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক বিষয়গুলোকে সমালোচনামূলকভাবে বিশ্লেষণ করার পরিবর্তে মানুষ পূর্বনির্ধারিত মতাদর্শিক অবস্থান থেকে বিচার করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। এর ফলে জ্ঞানচর্চার যে উন্মুক্ত পরিবেশ একটি বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ বা বিদ্যালয়ের প্রাণশক্তি হওয়ার কথা, তা ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে যায়। গবেষণা ও বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। কারণ নতুন জ্ঞান সৃষ্টির জন্য প্রয়োজন মুক্ত বিতর্ক, ভিন্নমতের সহাবস্থান এবং প্রশ্ন করার স্বাধীনতা।

ইতিহাস আমাদের বারবার দেখিয়েছে, যে সমাজে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র হয়ে ওঠে, সেখানে জ্ঞানচর্চা দুর্বল হয় এবং উদ্ভাবনী সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পক্ষান্তরে যে সমাজগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক ক্ষমতার সরাসরি নিয়ন্ত্রণ থেকে যথাসম্ভব মুক্ত রেখে একাডেমিক স্বাধীনতা, গবেষণার স্বাধীনতা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সুরক্ষিত করেছে, তারা বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে অধিক অগ্রগতি অর্জন করেছে। কারণ জ্ঞান বিকশিত হয় স্বাধীন পরিবেশে; নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে নয়। তাই শিক্ষাঙ্গনের রাজনৈতিকীকরণের প্রশ্নটি কেবল কোনো প্রশাসনিক বা সাংগঠনিক সমস্যা নয়; এটি মূলত জাতির বৌদ্ধিক ভবিষ্যৎ, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত একটি জাতীয় প্রশ্ন। যদি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আমরা জ্ঞান, গবেষণা ও মুক্তবুদ্ধির কেন্দ্র হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে না পারি, তাহলে আমরা হয়তো সনদধারী মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে পারব, কিন্তু এমন নাগরিক গড়ে তুলতে পারব না যারা স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে পারে, যুক্তির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং জাতির দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণে সৃজনশীল অবদান রাখতে সক্ষম।

লেখক : ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য।