আদালতের রায় বা আদেশের বিরুদ্ধে হরতাল-ধর্মঘট অবৈধ
স্টাফ রিপোর্টার : আদালতের রায় বা আদেশের বিরুদ্ধে বাস মালিক সমিতি কিংবা পরিবহন শ্রমিকদের কোনো সংগঠনের ডাকা হরতাল বা ধর্মঘট অবৈধ ঘোষণা করেছেন হাইকোর্ট।
একই সঙ্গে আদালতের রায় বা আদেশের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের হরতাল-ধর্মঘট ডাকা হলে জড়িত সংগঠনের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ধরনের কর্মসূচির ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ অন্যান্য কর্তৃপক্ষ ফৌজদারি আইনে ব্যবস্থা নিতে পারবে।
এ বিষয়ে এক রিটের পরিপ্রেক্ষিতে জারি করা রুলের চূড়ান্ত শুনানি শেষে রবিবার (১৩ সেপ্টেম্বর) হাইকোর্টের বিচারপতি শশাঙ্ক কুমার সরকার ও বিচারপতি ফয়সাল হাসান আরিফের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এ রায় দেন।
আদালতে রিটকারী হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) পক্ষে শুনানি করেন সিনিয়র অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ। তাকে সহায়তা করেন অ্যাডভোকেট সঞ্জয় মণ্ডল ও অ্যাডভোকেট রিপন বাড়ৈ। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল (ডিএজি) মোহাম্মদ আহসান হাবীব। অন্যদিকে, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) পক্ষে অ্যাডভোকেট আসিবুল হক এবং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) পক্ষে অ্যাডভোকেট মো. রাফিউল ইসলাম শুনানি করেন।
২০১১ সালের আগস্টে মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলায় ডিলাক্স পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে একটি মাইক্রোবাসের সংঘর্ষে চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ, সাংবাদিক মিশুক মুনীরসহ পাঁচজন নিহত হন। এ ঘটনায় বাসচালকের বিরুদ্ধে মামলা হয়। মামলার বিচার শেষে ২০১৭ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি মানিকগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালত বাসচালককে সাজা দেন।
ওই সাজা ঘোষণার পর বাস মালিকদের পক্ষ থেকে পরিবহন ধর্মঘট ও হরতাল ডাকার খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে জনস্বার্থে মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ (এইচআরপিবি) হাইকোর্টে রিট আবেদন করে।
রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষে ২০১৭ সালের ১ মার্চ হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ রুল জারি করেন। রুলে আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে পরিবহন ধর্মঘট বা হরতাল আহ্বান কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়। একই সঙ্গে অন্তর্বর্তীকালীন আদেশে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ধর্মঘট ও হরতাল প্রত্যাহার এবং যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। আদালতের ওই নির্দেশের পরদিন পরিবহন ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হয়।
রুলের চূড়ান্ত শুনানি শেষে রোববার আদালত রুলটি অ্যাবসোলিউট (চূড়ান্তভাবে গ্রহণ) করে রায় দেন। এতে বলা হয়, সংবিধানের ১১২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আদালতের রায় ও আদেশ সংশ্লিষ্ট সবার জন্য বাধ্যতামূলক। আদালতের কোনো রায় বা আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করার সুযোগ রয়েছে। তবে সেই রায়ের প্রতিবাদে হরতাল বা ধর্মঘট আহ্বান করা অবৈধ ও সংবিধানপরিপন্থি।
আদালত স্বরাষ্ট্র সচিব, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) এবং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনকে (বিআরটিসি) এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। রায়ে আরও বলা হয়, আদালতের রায় বা আদেশের বিরুদ্ধে কোনো বাস মালিক সমিতি বা পরিবহন শ্রমিক সংগঠন হরতাল-ধর্মঘট ডাকলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ও ফৌজদারি ব্যবস্থা নিতে হবে।
শুনানিতে এইচআরপিবির পক্ষে মনজিল মোরসেদ বলেন, সংবিধানের ১১২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আদালতের যে কোনো রায় ও নির্দেশনা মানতে সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষ বাধ্য। কিন্তু দুর্ঘটনার ঘটনায় চালকের সাজাকে কেন্দ্র করে বাস মালিকরা পরিবহন ধর্মঘট ডেকে আদালতের আদেশের প্রতি অশ্রদ্ধা দেখিয়েছিলেন।
তিনি বলেন, পরিবহন ধর্মঘটের কারণে সাধারণ মানুষের চলাচলের স্বাধীনতা বাধাগ্রস্ত হয়। এতে হাজার হাজার মানুষ ভোগান্তিতে পড়েন, যা গণমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়েছে।
এই রিটের আবেদনকারী ছিলেন অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ ছারওয়ার আহাদ চৌধুরী ও অ্যাডভোকেট মাহাবুবুল ইসলাম। রিটে বিবাদী করা হয় সেতু বিভাগের সচিব, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব, বিআরটিএ ও বিআরটিসির চেয়ারম্যান, ঢাকা, রাজশাহী, বরিশাল, রংপুর, চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহ রেঞ্জের ডিআইজি এবং সড়ক পরিবহন মালিক সমিতিসহ মোট ১৭ জনকে।
(ওএস/এএস/সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২৬)
