‘অধিকাংশ কর্মকর্তা চোর’-দুর্নীতির দায় কি শুধু কর্মকর্তাদের?
মনিরুজ্জামান মনির
বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা, রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও প্রশাসনিক দুর্নীতি নিয়ে জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সাম্প্রতিক বক্তব্য নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। গত ১৩ সেপ্টেম্বর ভোলার তজুমদ্দিন উপজেলা মিলনায়তনে বিএনপি আয়োজিত সুধী সমাজের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি বলেন, “আমাদের...অদ্ভুত দেশ! অধিকাংশ সরকারি কর্মকর্তা চোর। এগুলো নানা ধরনের ঘুষখোরি, লুটপাট এসব করে; যার ফলে মানুষের জীবনে নাভিশ্বাস উঠেছে।”
স্পিকারের এই মন্তব্যকে ঘিরে সরকারি কর্মকর্তা—কর্মচারীদের মধ্যে যেমন প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে, তেমনি সাধারণ মানুষের মধ্যেও দুর্নীতির অভিজ্ঞতা ও ক্ষোভের প্রতিফলন ঘটেছে। তবে এই বক্তব্যের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক তাৎপর্য বিশ্লেষণ করতে গিয়ে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে-দুর্নীতির দায় কি শুধু কর্মকর্তাদের? রাজনীতিকরা যদি সৎ, নীতিনিষ্ঠ ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ হতেন, তাহলে সরকারি কর্মকর্তারা কি এত সহজে দুর্নীতির সুযোগ পেতেন?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে দুর্নীতিকে কেবল ব্যক্তির অপরাধ হিসেবে দেখলে চলবে না; বরং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, প্রশাসনিক দুর্বলতা, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির সংকটকে একই সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
‘অধিকাংশ কর্মকর্তা চোর’-অভিযোগের সত্যতা ও দায়
সরকারি কর্মকর্তা—কর্মচারীদের একটি অংশের বিরুদ্ধে ঘুষ, ক্ষমতার অপব্যবহার, সরকারি সম্পদ আত্মসাৎ, নিয়োগ—বাণিজ্য, বদলি—পদায়নে অনিয়ম, ঠিকাদারি সুবিধা প্রদান এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে দুর্নীতির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
কিন্তু “অধিকাংশ সরকারি কর্মকর্তা চোর”-এমন একটি ব্যাপক অভিযোগকে নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান ও প্রমাণ ছাড়া চূড়ান্ত সত্য হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। কারণ প্রশাসনে সৎ, দক্ষ, নিষ্ঠাবান ও জনবান্ধব কর্মকর্তাও রয়েছেন। তাঁদের অবদান অস্বীকার করা যেমন অন্যায়, তেমনি দুর্নীতিবাজদের রক্ষা করাও রাষ্ট্রের প্রতি অবিচার।
এখানে প্রশ্ন হলো, একজন কর্মকর্তা দুর্নীতির সুযোগ পান কীভাবে?
একজন সরকারি কর্মকর্তা কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক চাপ, প্রভাবশালী মহলের নির্দেশ, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনৈতিক প্রত্যাশা কিংবা ব্যক্তিগত সুবিধার প্রলোভনের মুখোমুখি হতে পারেন। তিনি যদি আইন অমান্য করে সুবিধা নেন, তাহলে তাঁর ব্যক্তিগত দায় অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু যে রাজনৈতিক বা প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ তাঁকে অনৈতিক কাজে উৎসাহিত করে কিংবা অপরাধের পর সুরক্ষা দেয়, সেই পরিবেশের দায়ও অস্বীকার করা যায় না। সুতরাং দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হলে কর্মকর্তার ব্যক্তিগত অপরাধ এবং দুর্নীতির পেছনে থাকা ক্ষমতার কাঠামো-দুটিকেই চিহ্নিত করতে হবে।
রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা দুর্নীতির অন্যতম আশ্রয়
বাংলাদেশে দুর্নীতির আলোচনায় সরকারি কর্মকর্তাদের ভূমিকা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা আরও গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। কারণ রাষ্ট্র পরিচালনার রাজনৈতিক ক্ষমতা যখন জনসেবার পরিবর্তে ব্যক্তিগত সম্পদ অর্জন, দলীয় স্বার্থ রক্ষা, ঠিকাদারি সুবিধা বণ্টন কিংবা প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যম হয়ে ওঠে, তখন দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি শক্তিশালী হয়।
একজন রাজনৈতিক নেতা যদি কোনো কর্মকর্তাকে বেআইনি সুবিধা দিতে চাপ দেন, কোনো ঠিকাদারকে অনৈতিকভাবে কাজ পাইয়ে দেন, নিয়োগে স্বজনপ্রীতি করেন কিংবা দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে রক্ষা করেন, তাহলে তিনি কেবল একটি অনিয়মে সহায়তা করেন না; তিনি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করেন।
আবার কোনো কর্মকর্তা রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে বেআইনি সুবিধা নিলে তাঁরও দায় রয়েছে। রাজনৈতিক চাপ থাকলেই বেআইনি কাজ বৈধ হয়ে যায় না। সংবিধান, আইন, চাকরির বিধিমালা ও পেশাগত নৈতিকতা একজন সরকারি কর্মকর্তার দায়িত্ব নির্ধারণ করে। অতএব, রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায় এবং কর্মকর্তার ব্যক্তিগত দায়কে পরস্পরের বিকল্প হিসেবে দেখা যাবে না। উভয় ক্ষেত্রেই জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
রাজনীতিকরা সৎ হলে দুর্নীতির সুযোগ কি কমত না?
এই প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। একজন রাজনৈতিক নেতা যদি রাষ্ট্রীয় নিয়োগ, বদলি, পদায়ন, পদোন্নতি, প্রকল্প অনুমোদন, ঠিকাদারি কিংবা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে বেআইনি প্রভাব বিস্তার করেন, তাহলে কর্মকর্তাদের একটি অংশ সেই প্রভাবের সুযোগ নিয়ে ব্যক্তিগত সুবিধা অর্জনের চেষ্টা করতে পারেন। আবার কর্মকর্তারাও যদি রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগসাজশ করে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করেন, তাহলে দুর্নীতির একটি পারস্পরিক সুবিধাভোগী বলয় তৈরি হয়।
এই বলয় ভাঙতে হলে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে প্রথমে নিজেদের ঘর পরিষ্কার করতে হবে। শুধু আগের সরকারের দুর্নীতির তালিকা প্রকাশ করে বর্তমান বা ভবিষ্যতের দুর্নীতি বন্ধ করা যাবে না। ক্ষমতাসীন দলের কোনো নেতা, মন্ত্রী, জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তি দুর্নীতিতে জড়িত হলে তাঁর বিরুদ্ধেও একই আইনে ব্যবস্থা নিতে হবে।
দুর্নীতিবিরোধী রাজনীতির প্রথম পরীক্ষা হলো-নিজের দলের দুর্নীতিবাজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সাহস। যে রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিজের লোকের দুর্নীতি আড়াল করে, সে যতই সুশাসনের কথা বলুক না কেন, জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারবে না। জনগণ এখন বক্তৃতার চেয়ে বাস্তব পদক্ষেপ দেখতে চায়।
কোষাগার লুণ্ঠন ও বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ
স্পিকার তাঁর বক্তব্যে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাষ্ট্রীয় কোষাগার লুণ্ঠন, বিদেশি সহায়তার অর্থ আত্মসাৎ ও পাচার, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি এবং বিদেশে বিপুল সম্পদ গড়ার অভিযোগ তুলে ধরেছেন। তিনি অভিযোগ করেন, এসব অনিয়ম ও অপরাধের সঙ্গে জড়িত বাংলাদেশের অনেকের যথাযথ বিচার হয়নি।
এখানে দুটি বিষয় আলাদা করে দেখা জরুরি। প্রথমত, রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাৎ, অর্থ পাচার ও রিজার্ভ চুরির মতো অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। দ্বিতীয়ত, কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগকে প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে নিরপেক্ষ তদন্ত, নথিপত্র, আর্থিক অনুসন্ধান এবং আদালতের বিচারিক সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনা ২০১৬ সালে দেশের আর্থিক নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির ওপর বড় আঘাত হেনেছিল। সেই ঘটনায় অর্থ উদ্ধারের উদ্যোগ, তদন্ত ও বিচারিক অগ্রগতি নিয়ে জনগণের প্রশ্ন থাকা স্বাভাবিক। একইভাবে, কোনো সাবেক মন্ত্রী বা রাজনৈতিক নেতার বিদেশে সম্পদের বিষয়ে অভিযোগ উঠলে সম্পদের বৈধতা, মালিকানা, অর্থের উৎস এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দায় নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
জনগণের অর্থ লুণ্ঠনের অভিযোগ যত গুরুতরই হোক, বিচার হতে হবে প্রমাণের ভিত্তিতে। রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে কাউকে অপরাধী ঘোষণা করা যেমন ন্যায়সংগত নয়, তেমনি রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে প্রকৃত অপরাধীকে দায়মুক্ত রাখাও রাষ্ট্রের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা।
দুর্নীতির বিচার হতে হবে দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে-অপরাধী যে দলেরই হোক, তাকে আইনের মুখোমুখি হতে হবে।
প্রশাসনে ‘আগের সরকারের লোক’-এই ধারণার বিপদ
স্পিকার বলেছেন, প্রশাসনে এখনো আগের সরকারের কিছু লোক বসে থাকায় প্রকৃত চিত্র জনগণের সামনে ভালোভাবে আসছে না। এই বক্তব্য প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে। তবে এখানে একটি মৌলিক পার্থক্য করা জরুরি-কোনো কর্মকর্তা আগের সরকারের আমলে দায়িত্ব পালন করেছেন, আর তিনি অনিয়ম বা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেনÑএই দুটি বিষয় এক নয়।
সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কোনো কর্মকর্তা রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে অভিযুক্ত হবেন কিংবা চাকরি হারাবেন-এমন ধারণা প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা ও পেশাগত নিরপেক্ষতার জন্য বিপজ্জনক। সরকারি কর্মকর্তা রাষ্ট্রের কর্মচারী; তাঁকে সংবিধান, আইন ও সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করতে হয়।
তবে কোনো কর্মকর্তা যদি রাজনৈতিক আনুগত্যের বিনিময়ে বেআইনি সুবিধা নিয়ে থাকেন, দুর্নীতিতে যুক্ত থাকেন, তদন্তে বাধা দেন কিংবা রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাতে সহায়তা করেন, তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থা অবশ্যই নিতে হবে। প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করার অর্থ হলো-দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের রক্ষা না করা এবং সৎ কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে হয়রানি না করা। প্রশাসনিক শুদ্ধি অভিযান হতে হবে অপরাধভিত্তিক, দলীয় পরিচয়ভিত্তিক নয়।
দুর্নীতি শুধু ঘুষখোর কর্মকর্তার সমস্যা নয়
দুর্নীতি কোনো একক শ্রেণির সমস্যা নয়। এটি অনেক সময় রাজনৈতিক নেতৃত্ব, প্রশাসন, ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, ঠিকাদারি ব্যবস্থা এবং দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক তদারকির পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে বিস্তার লাভ করে।
একটি সরকারি প্রকল্পে দুর্নীতি হলে সেখানে শুধু একজন কর্মকর্তা দায়ী থাকতে পারেন না; প্রকল্পের অনুমোদন, দরপত্র, ঠিকাদারি, অর্থ ছাড়, কাজের তদারকি, বিল পরিশোধ এবং নিরীক্ষাÑপ্রতিটি ধাপে কার কী ভূমিকা ছিল, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একইভাবে, নিয়োগে অনিয়ম হলে শুধু নিয়োগকারী কর্মকর্তাকে অভিযুক্ত করলেই হবে না; রাজনৈতিক সুপারিশ, প্রভাবশালী মধ্যস্থতাকারী, ঘুষের অর্থের প্রবাহ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াও তদন্ত করতে হবে। কোনো দুর্নীতির ঘটনায় যদি রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, প্রশাসনিক যোগসাজশ ও ব্যবসায়িক স্বার্থ একসঙ্গে কাজ করে থাকে, তাহলে শুধু নিচের স্তরের কর্মচারীকে শাস্তি দিয়ে মূল চক্রকে আড়াল করা ন্যায়বিচার নয়। দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রকৃত ব্যবস্থা নিতে হলে যে ঘুষ নেয়, যে ঘুষ দেয়, যে ঘুষের ব্যবস্থা করে এবং যে ক্ষমতা ব্যবহার করে অপরাধকে সুরক্ষা দেয়Ñপ্রত্যেকের ভূমিকা তদন্ত করতে হবে।
দুর্নীতি বন্ধে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কার
দুর্নীতির বিরুদ্ধে বক্তব্য যতই কঠোর হোক, কার্যকর সংস্কার ছাড়া বাস্তব পরিবর্তন সম্ভব নয়। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
প্রথমত, রাজনৈতিক অর্থায়নে স্বচ্ছতা আনতে হবে। রাজনৈতিক দল ও নির্বাচনী কার্যক্রমে অর্থের উৎস, ব্যয় এবং প্রভাবশালী অর্থদাতাদের ভূমিকা সম্পর্কে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, সরকারি নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে। কর্মকর্তার যোগ্যতা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও পেশাগত সততাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
তৃতীয়ত, সরকারি ক্রয় ও প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। দরপত্র, চুক্তি, ব্যয়, কাজের অগ্রগতি, গুণগত মান এবং নিরীক্ষা—সংক্রান্ত তথ্য যথাসম্ভব জনসমক্ষে আনতে হবে।
চতুর্থত, দুর্নীতি দমন কমিশন, নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান, তদন্ত সংস্থা ও বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা ও দক্ষতা বাড়াতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয় যেন তদন্তে প্রভাব না ফেলে, আবার অভিযোগ যেন রাজনৈতিক প্রতিহিংসার হাতিয়ার না হয়-দুটিই নিশ্চিত করতে হবে।
পঞ্চমত, তথ্য অধিকার ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার পরিবেশ সুরক্ষিত করতে হবে। দুর্নীতির তথ্য প্রকাশকারী সাংবাদিক, হুইসেলব্লোয়ার ও সৎ অভিযোগকারীদের হয়রানি থেকে রক্ষা করতে হবে।
ষষ্ঠত, সরকারি কর্মকর্তাদের সম্পদের বিবরণ ও জীবনযাপনের সঙ্গে আয়ের সামঞ্জস্য যাচাইয়ের ব্যবস্থা কার্যকর করতে হবে। অস্বাভাবিক সম্পদ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ তদন্ত হতে হবে।
সপ্তমত, দুর্নীতির মামলার বিচার ও তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা কমাতে হবে। অপরাধ প্রমাণিত হলে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, আর নির্দোষ ব্যক্তিকে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক হয়রানি থেকে সুরক্ষা দিতে হবে।
অডিট আপত্তি, দুর্নীতি ও জবাবদিহি
রাষ্ট্রীয় প্রকল্প ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে অডিট আপত্তি উঠলে তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তবে অডিট আপত্তি নিজেই দুর্নীতির চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। আপত্তির কারণ হতে পারে হিসাবের ত্রুটি, বিধি অনুসরণে ঘাটতি, নথিপত্রের অসম্পূর্ণতা, ব্যয়ের যথাযথ ব্যাখ্যার অভাব কিংবা প্রকৃত আর্থিক অনিয়ম। অডিট আপত্তির প্রতিটি বিষয় তদন্ত, জবাব গ্রহণ ও নিষ্পত্তির প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। প্রকৃত দুর্নীতি প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। আবার কোনো কর্মকর্তা বা প্রকল্পের বিরুদ্ধে অডিট আপত্তিকে রাজনৈতিক অপপ্রচারের হাতিয়ার বানানোও অনুচিত। রাষ্ট্রীয় অর্থের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হলে অডিটকে কার্যকর করতে হবে, অডিট আপত্তি নিষ্পত্তির সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে এবং জনগণের সামনে প্রকল্পের প্রকৃত আর্থিক চিত্র তুলে ধরতে হবে।
রাজনীতি হতে হবে জনসেবার অঙ্গীকার
বাংলাদেশের জনগণ রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন চায় না; তারা চায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তন, আইনের শাসন, ন্যায়বিচার, কর্মসংস্থান, সুশাসন ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ। রাজনীতি যদি জনগণের সেবার পরিবর্তে ব্যক্তিগত সম্পদ অর্জন, ক্ষমতার বাণিজ্য, নিয়োগ—বদলি নিয়ন্ত্রণ, ঠিকাদারি সুবিধা কিংবা প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে পরিণত হয়, তাহলে রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।
রাজনীতিকদের দায়িত্ব হলো-নিজেদের সম্পদের হিসাব দেওয়া, স্বজনপ্রীতি পরিহার করা, দুর্নীতির অভিযোগে নিরপেক্ষ তদন্তে সহযোগিতা করা এবং দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্ব হলো-রাজনৈতিক চাপ কিংবা ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জনগণের সেবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা। এই দুই পক্ষের জবাবদিহি ছাড়া দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের বক্তব্যে সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতি, রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে অভিযোগ এবং প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে যে প্রশ্নগুলো সামনে এসেছে, সেগুলোকে দলীয় বিতর্কে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। এগুলো রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ, জনগণের অধিকার এবং সুশাসনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে দুর্নীতিবাজদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহারকারী, দুর্নীতির পৃষ্ঠপোষক এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদেরও জবাবদিহির মুখোমুখি করতে হবে।
কোনো সরকারের আমলে দুর্নীতি হয়েছে কি না, তা তদন্ত ও প্রমাণের বিষয়। কিন্তু কোনো সরকারের আমলেই দুর্নীতির দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকা উচিত নয়। রাষ্ট্রীয় সম্পদ জনগণের; জনগণের অর্থ আত্মসাৎকারী ব্যক্তি রাজনৈতিক পরিচয়, পদমর্যাদা কিংবা প্রশাসনিক ক্ষমতার কারণে আইনের ঊর্ধ্বে থাকতে পারেন না। রাজনীতিকরা যদি সত্যিই দেশ ও জনগণের জন্য রাজনীতি করেন, তাহলে তাঁদের প্রথম দায়িত্ব হবে নিজেদের সততা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা। আর সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্ব হবে রাজনৈতিক আনুগত্যের পরিবর্তে সংবিধান, আইন ও জনগণের প্রতি আনুগত্য বজায় রাখা।
বাংলাদেশে এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যেখানে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা রাজনৈতিক আশ্রয় পাবেন না, দুর্নীতিবাজ রাজনীতিক প্রশাসনিক সুবিধা নিতে পারবেন না এবং সৎ কর্মকর্তা ও সৎ রাজনীতিক উভয়েই তাঁদের সততার জন্য সম্মানিত হবেন। কারণ দুর্নীতি বন্ধের লড়াই শুধু একজন ঘুষখোর কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নয়; এটি সেই সমগ্র ব্যবস্থার বিরুদ্ধে, যেখানে ক্ষমতা, অর্থ ও প্রভাবের বিনিময়ে আইনের শাসনকে দুর্বল করা হয়।
রাজনীতি সৎ হলে প্রশাসনকে সৎ থাকার পরিবেশ দিতে হবে। প্রশাসন সৎ হলে রাজনীতিকদেরও আইনের সীমার মধ্যে থাকতে হবে। আর রাষ্ট্রের সর্বস্তরে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠিত হলেই জনগণের নাভিশ্বাস কমবে, ফিরে আসবে রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
