ভিআইপি কক্ষে ক্ষমতার দম্ভ
আবদুল হামিদ মাহবুব
গতকাল (১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬) শ্রীমঙ্গল রেলস্টেশন থেকে পারাবত এক্সপ্রেসে ওঠার আগে ভিআইপি ওয়েটিং রুমে ঢুকেছিলাম। সেখানে লিগ্যাল এইডের একজন নারী কর্মকর্তা আগে থেকেই বসা ছিলেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন তাঁর এক কর্মচারী; পান খেয়ে যার মুখ ছিল টকটকে লাল।
সেই কর্মকর্তার কথাবার্তা ও আচরণে আমার মনে হলো, ক্ষমতা মানুষকে কখনো কখনো মাটি থেকে এতটাই ওপরে তুলে দেয় যে, পায়ের নিচের বাস্তবতাটাই আর চোখে পড়ে না। আর ক্ষমতার আশ্রয়-প্রশ্রয়ে থাকা তাঁর সঙ্গীটির দাপট যেন আরও কয়েক চামচ বেশি!
ভিআইপি ওয়েটিং রুমের দায়িত্বে রেলওয়ের ‘আলী’ নামের একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তি থাকেন বলে জানতে পারলাম। অভিযোগ, তিনি নিয়মিত ডিউটি ফাঁকি দেন। প্রায় দুই ঘণ্টা খুঁজেও তাঁকে কোথাও পাওয়া গেল না। স্টেশনের ব্যবস্থাপক; স্টেশন ম্যানেজার, না স্টেশন মাস্টার, যে নামেই বলি, তাঁকেও খুঁজে পাওয়া গেল না।
একটি সরকারি স্টেশনের একটি নির্দিষ্ট কক্ষের দায়িত্বপ্রাপ্ত মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা খুঁজে পাওয়া যায় না; এটা কি কেবল একজন কর্মচারীর অনুপস্থিতির ঘটনা, নাকি এর ভেতরে আরও বড় কোনো প্রশাসনিক অসংগতি লুকিয়ে আছে?
এরপর ঘটল আরও তাৎপর্যপূর্ণ একটি ঘটনা। ওই লিগ্যাল এইড কর্মকর্তার সঙ্গে থাকা নিম্নপদস্থ কয়েকজন কর্মচারী একপর্যায়ে আমাকে ঘিরে তাঁদের ক্ষোভ, দুঃখ ও অসহায়ত্বের কথা বলতে শুরু করলেন। তাঁদের অভিযোগ; ক্ষমতার দাপটে তাঁদের সারাক্ষণ দৌড়ের ওপর রাখা হয়। তাঁদের ভাষায়, তাঁদের কোনো ‘মানবাধিকার’ নেই।
আমি তাঁদের আশ্বস্ত করেছিলাম; জুডিশিয়ারি নিয়ে হয়তো কোনো একসময় লিখব। আর যখন লিখব, ক্ষমতার নিচে চাপা পড়ে থাকা এই নিম্নপদস্থ কর্মচারীদের কথাও সেখানে থাকবে।
কিছুদিন আগে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের ক্ষমতার ব্যবহার নিয়ে লিখেছিলাম। গতকালের ঘটনাটি নতুন করে একটি আরেকটি বিষয় সামনে এনেছে; আর সেটা হচ্ছে জুডিশিয়ারির ক্ষমতা, আচরণ ও জবাবদিহি নিয়েও আমাদের আরও বেশি কথা বলা কি দরকার নয়? আমাদের সাংবাদিকতা প্রশাসন ও পুলিশের ওপর যতটা নজর রাখে, বিচারব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরের ওপর ততটা নজর রাখে কি?
বিচারব্যবস্থা নিঃসন্দেহে একটি সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। আর সেই কারণেই সেখানে জবাবদিহির প্রয়োজন আরও বেশি। বিচার প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা রক্ষা করার অর্থ তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সব ধরনের আচরণকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখা নয়। বরং প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতেই ক্ষমতার অপব্যবহার, অধস্তনদের সঙ্গে আচরণ এবং প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে সামনে আসা দরকার। নজরদারি মানেই বিচারব্যবস্থার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া নয়; বরং নজরদারি হলো প্রতিষ্ঠানকে আরও জবাবদিহিমূলক রাখার একটি উপায়।
তাই সাংবাদিকদের নজরদারি শুধু জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন কিংবা রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্র পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। একেবারে নিম্নস্তর থেকে উচ্চপর্যায় পর্যন্ত বিচারব্যবস্থার প্রতিটি স্তরেও প্রশ্ন করার সাহস থাকতে হবে। কারণ ক্ষমতা যে প্রতিষ্ঠানের হাতেই থাকুক, ক্ষমতার সঙ্গে যদি জবাবদিহি না থাকে, তাহলে সেই ক্ষমতা একসময় মানুষের সেবার হাতিয়ার না হয়ে মানুষের ওপর বোঝা হয়ে উঠতে পারে। আর ভিআইপি কক্ষের দরজা যতই আলাদা হোক, আইন ও জবাবদিহির দরজা সবার জন্য সমান হওয়াই একটি সুস্থ রাষ্ট্রের পরিচয়।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশুসাহিত্যক।
