মীর আব্দুল আলীম


বন্ধ কারখানার গেট শুধু একটি তালাবদ্ধ দরজা নয়, এর ওপাশে আটকে থাকে হাজারো শ্রমিকের জীবিকা, উদ্যোক্তার স্বপ্ন, পরিবারের ভবিষ্যৎ এবং দেশের অর্থনীতির সম্ভাবনা। একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের চাকা থেমে গেলে শুধু মালিকের ব্যবসা থামে না, থেমে যায় বহু মানুষের আয়, বাজারের লেনদেন এবং অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্রোত। তাই দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ হয়ে থাকা শিল্প ও সেবা খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোকে আবার উৎপাদনে ফিরিয়ে আনতে ২০ হাজার কোটি টাকার প্রাক্-অর্থায়ন স্কিম এবং গ্রাহক পর্যায়ে সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ সুদ নির্ধারণের উদ্যোগকে নিঃসন্দেহে স্বাগত জানাতে হয়।

এই উদ্যোগের জন্য সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংককে সাধুবাদ। কারণ অর্থনীতি যখন নানা চাপের মধ্য দিয়ে যায়, তখন নতুন শিল্প স্থাপনের পাশাপাশি বিদ্যমান কিন্তু বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করাও অত্যন্ত জরুরি। নতুন একটি কারখানা স্থাপন করতে যে সময়, অর্থ ও অবকাঠামোগত প্রস্তুতি প্রয়োজন, একটি সম্ভাবনাময় বন্ধ শিল্পকে পুনরায় চালু করার ক্ষেত্রে তার অনেকটাই আগে থেকেই তৈরি থাকে। ভবন আছে, যন্ত্রপাতি আছে, বাজারের অভিজ্ঞতা আছে, শ্রমিকের দক্ষতা আছে। প্রয়োজন শুধু সঠিক অর্থায়ন, কার্যকর ব্যবস্থাপনা এবং পুনরায় দাঁড়ানোর সুযোগ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন সিদ্ধান্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো ছয় মাসের গ্রেস পিরিয়ড। ঋণ পাওয়ার পরই যদি একজন বিপর্যস্ত উদ্যোক্তার ঘাড়ে সুদের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে পুনরায় উৎপাদনে ফিরতে গিয়ে তিনি আরও চাপে পড়বেন। কিন্তু ছয় মাস সুদ পরিশোধের চাপমুক্ত সময় একজন উদ্যোক্তাকে উৎপাদন শুরু, শ্রমিক নিয়োগ, কাঁচামাল সংগ্রহ, বাজার পুনর্গঠন এবং ব্যবসা স্বাভাবিক করার সুযোগ দেবে। এরপর সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ সুদে ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা শিল্প পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে কার্যকর সহায়তা হতে পারে।

এখানে বিষয়টি শুধু ব্যবসা বাঁচানোর নয়, অর্থনীতির চাকাকে আবার ঘুরিয়ে দেওয়ার। একটি কারখানা চালু হলে শুধু কয়েকশ শ্রমিকের চাকরি হয় না। এর সঙ্গে যুক্ত হয় কাঁচামাল সরবরাহকারী, পরিবহন শ্রমিক, ঠিকাদার, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, দোকানদার, ব্যাংক, বীমা, লজিস্টিকসসহ অসংখ্য মানুষ। একজন শ্রমিকের বেতন তার পরিবারের খাদ্য, সন্তানের শিক্ষা, চিকিৎসা ও দৈনন্দিন ব্যয়ের মাধ্যমে আবার বাজারে ফিরে আসে। ফলে একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন শুরু হওয়া মানে অর্থনীতির বহু স্তরে নতুন করে লেনদেন সৃষ্টি হওয়া।

সবচেয়ে বড় সুফল আসতে পারে কর্মসংস্থানে। বন্ধ শিল্পের সঙ্গে সবচেয়ে বড় যে শব্দটি জড়িয়ে আছে, সেটি হলো ‘বেকারত্ব’। কোনো কারখানা বন্ধ হলে শ্রমিক শুধু একটি চাকরি হারান না, তিনি হারান ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা। পরিবারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। সন্তানদের পড়াশোনা বাধাগ্রস্ত হয়। ঋণের কিস্তি, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, খাবারসহ প্রতিটি প্রয়োজনীয় ব্যয় কঠিন হয়ে পড়ে। সেই কারখানাটি আবার চালু হলে একজন শ্রমিকের হাতে শুধু বেতন নয়, ফিরে আসে আত্মসম্মান, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের প্রত্যাশা।

এ উদ্যোগের আরেকটি বড় সম্ভাবনা হলো রপ্তানি বৃদ্ধি। বাংলাদেশের শিল্প খাতের একটি বড় অংশ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে রপ্তানির সঙ্গে যুক্ত। পোশাকের পাশাপাশি ওষুধ, চামড়া, কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাত পণ্য, প্লাস্টিক, সিরামিক, হালকা প্রকৌশলসহ বিভিন্ন খাতে আমাদের রপ্তানির সুযোগ রয়েছে। বন্ধ শিল্পগুলো যথাযথভাবে পুনরুজ্জীবিত করা গেলে উৎপাদন বাড়বে এবং দেশের রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। এর সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পথও প্রশস্ত হবে।

শিল্প সচল হলে আমদানিও প্রয়োজন হবে। কাঁচামাল আসবে, যন্ত্রপাতি আসবে, উৎপাদন হবে, পণ্য দেশের বাজারে যাবে, আবার রপ্তানির পণ্য বন্দরে যাবে। ফলে শিল্পের সঙ্গে বন্দর, পরিবহন, ব্যাংকিং, বীমা ও লজিস্টিকস খাতেও কর্মকাণ্ড বাড়বে। অর্থাৎ একটি বন্ধ শিল্পকে সচল করার অর্থ হলো অর্থনীতির একটি বড় চক্রকে আবার গতিশীল করা। তবে এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে বাস্তবায়নে। ২০ হাজার কোটি টাকা বড় অঙ্কের অর্থ। এই অর্থ যেন প্রকৃত শিল্পোদ্যোক্তার হাতে যায়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। বন্ধ হলেই কোনো প্রতিষ্ঠান পুনরায় চালু করার উপযুক্ত হয়ে যায় না। কোন প্রতিষ্ঠান কেন বন্ধ হয়েছে, তার বাজার আছে কি না, ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা কেমন, কত শ্রমিক আবার কাজে ফিরতে পারবেন, উৎপাদন শুরু হলে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা তৈরি হবে কি না, রপ্তানির সম্ভাবনা কতটা এসব বিষয় গভীরভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

অর্থাৎ শুধু ‘বন্ধ শিল্প’ দেখলেই ঋণ দেওয়া যাবে না। দেখতে হবে ‘চালু করলে শিল্পটি টেকসই হবে কি না’। এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জনগণের আমানতের অর্থ দিয়ে এমন প্রকল্পকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করা ঠিক হবে না, যার ব্যবসায়িক সম্ভাবনা নেই। আবার কাগজপত্রের জটিলতা, দীর্ঘসূত্রতা কিংবা অতি আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার কারণে প্রকৃত সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তাও যেন অর্থায়ন থেকে বঞ্চিত না হন। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি এখানে অপরিহার্য। ঋণ দেওয়ার পরও প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করতে হবে। টাকা কোথায় ব্যয় হচ্ছে, উৎপাদন শুরু হয়েছে কি না, শ্রমিক নিয়োগ হয়েছে কি না, প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে কি না এসব বিষয়ে নিয়মিত নজরদারি দরকার। তা না হলে শিল্প বাঁচানোর নামে আবারও খেলাপি ঋণের নতুন বোঝা তৈরি হতে পারে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, শিল্পের টাকা শিল্পেই থাকতে হবে। এই অর্থ কোনোভাবেই অন্য ব্যবসায় সরিয়ে নেওয়া, সম্পদ কেনা, ব্যক্তিগত ব্যয় মেটানো কিংবা কাগজে-কলমে প্রতিষ্ঠান চালু দেখানোর সুযোগ হওয়া উচিত নয়। প্রকৃত উৎপাদন, প্রকৃত কর্মসংস্থান এবং প্রকৃত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডই হতে হবে এই অর্থায়নের সাফল্যের মাপকাঠি। একই সঙ্গে উদ্যোক্তাদেরও দায়িত্ব নিতে হবে। সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক অর্থায়নের সুযোগ দেবে, ব্যাংক ঋণ দেবে, কিন্তু শিল্প টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত উদ্যোক্তার। আধুনিক ব্যবস্থাপনা, উৎপাদন দক্ষতা, শ্রমিকের অধিকার, মানসম্মত পণ্য, বাজার সম্প্রসারণ এবং সময়মতো ঋণ পরিশোধের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। শুধু ঋণ পেলেই শিল্প বাঁচবে না; ঋণকে উৎপাদনে রূপান্তর করতে হবে।

বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এমন একটি পর্যায়ে, যেখানে উৎপাদন বাড়ানো ছাড়া টেকসই গতি তৈরি করা কঠিন। কর্মসংস্থান ছাড়া মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে না, উৎপাদন ছাড়া বাজার শক্তিশালী হবে না, রপ্তানি ছাড়া বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বাড়বে না। আর শিল্প ছাড়া এই তিনটির কোনোটিই দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী করা সহজ নয়। তাই বন্ধ শিল্প পুনরুজ্জীবনের এই উদ্যোগকে শুধু একটি ঋণ কর্মসূচি হিসেবে দেখলে চলবে না। এটিকে দেখতে হবে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে। আজ যে কারখানার গেটে তালা ঝুলছে, সেখানে আগামীকাল শ্রমিকের ভিড় দেখা গেলে সেটিই হবে এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় সাফল্য। যে মেশিন বহুদিন ধরে নীরব, সেটি আবার শব্দ করলে সেটিই হবে অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানোর দৃশ্যমান চিহ্ন।

আমরা চাই, এই ২০ হাজার কোটি টাকা সত্যিকার অর্থেই বন্ধ শিল্পের প্রাণ ফেরাক। হাজার হাজার বেকার মানুষের হাতে আবার কাজ ফিরুক। উদ্যোক্তার বিনিয়োগের আস্থা ফিরে আসুক। উৎপাদন বাড়ুক, রপ্তানি বাড়ুক, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন বাড়ুক। আমদানি-রপ্তানির চাকা আরও গতিশীল হোক। স্থানীয় বাজারে অর্থের প্রবাহ বাড়ুক। অর্থনীতির প্রতিটি স্তরে কর্মচাঞ্চল্য ফিরে আসুক।

একটি বন্ধ কারখানা খুলে দেওয়া মানে শুধু একটি গেট খোলা নয়। এর অর্থ হাজার মানুষের জীবনের দরজা খুলে দেওয়া। আর হাজার মানুষের জীবনে কর্মের আলো জ্বালাতে পারলে সেই আলো শেষ পর্যন্ত দেশের অর্থনীতিকেও আলোকিত করবে।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট।