আন্তর্জাতিক ডেস্ক : রাশিয়ার ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের আইনে সই করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর ফলে রাশিয়া থেকে তেল ও গ্যাস কেনা দেশগুলোর পণ্যে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এতে রাশিয়ার বড় জ্বালানি ক্রেতা ভারত ও চীনও নতুন করে মার্কিন শুল্কের ঝুঁকিতে পড়েছে।

রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদ ২৬২-১৫৯ ভোটে বিলটি পাস করার দুই দিন পর ট্রাম্প এতে সই করেন।

‘লিন্ডসে ও গ্রাহাম স্যাঙ্কশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট অব ২০২৬’ নামের এই আইনের নামকরণ করা হয়েছে রাশিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের জন্য পরিচিত মার্কিন সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের নামে। চলতি বছরের জুলাইয়ে কিয়েভ সফর শেষে দেশে ফেরার কিছুদিন পর তিনি মারা যান।

কী আছে নতুন আইনে?
নতুন আইনটির মূল লক্ষ্য রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেন যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের উৎস কমিয়ে দেওয়া। এর আওতায় রাশিয়ার সরকারি কর্মকর্তা, ব্যাংক, জ্বালানি খাত এবং মস্কোর সামরিক কর্মকাণ্ডে সহায়তা করা বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের সুযোগ রাখা হয়েছে।

আইন অনুযায়ী, রাশিয়ার সঙ্গে ব্যবসা করা দেশগুলোর ওপরও শুল্ক আরোপ করতে পারবেন ট্রাম্প। বিশেষ করে রাশিয়ার তেল ও গ্যাস কেনা দেশগুলোর ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।

মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের ওয়েজ অ্যান্ড মিনস কমিটির তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়ার পণ্যের ওপর সর্বোচ্চ ৫০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের সুযোগ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি রাশিয়ার তেল ও গ্যাস কেনার সঙ্গে যুক্ত দেশগুলোর পণ্যে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ শুল্ক বসানো যেতে পারে।

এ ছাড়া রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং দেশটির সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও নিষেধাজ্ঞার বিধান রয়েছে।

ভারতের ওপর কী প্রভাব পড়তে পারে?
নতুন আইনে ট্রাম্পের হাতে ভারতসহ রাশিয়ার জ্বালানি ক্রেতা দেশগুলোর ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা তৈরি হয়েছে। তবে আইনটি সই হওয়ার অর্থ এই নয় যে ভারতীয় পণ্যের ওপর সরাসরি ১০০ শতাংশ শুল্ক বসে গেছে।

ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসম্যান স্টেনি হোয়ারের আনা একটি সংশোধনীতে চীন, ভারত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, তুরস্ক, সিঙ্গাপুর, আজারবাইজান, কাজাখস্তান, হাঙ্গেরি, কিরগিজস্তান ও স্লোভাকিয়ার নাম উল্লেখ করা হয়েছিল। এসব দেশের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের সুযোগ রাখার কথা বলা হয়।

তবে ওই সংশোধনী নিজে থেকে ভারতের ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর করেনি। ট্রাম্প চাইলে তাঁর ক্ষমতা ব্যবহার করে এমন শুল্ক আরোপ করতে পারবেন।

ভারতের ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হলে এর প্রভাব বর্তমান মার্কিন শুল্কের সঙ্গে যুক্ত হবে। তবে নতুন শুল্কের সুনির্দিষ্ট হার ও কোন কোন পণ্যে তা কার্যকর হবে, তা যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী ঘোষণার ওপর নির্ভর করবে।

ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে ফের চাপ?
রাশিয়ার কাছ থেকে ভারতের তেল কেনা নিয়ে গত বছর থেকেই ওয়াশিংটন ও নয়াদিল্লির মধ্যে টানাপোড়েন চলছে। রাশিয়ার কাছ থেকে অপরিশোধিত তেল কেনার কারণে ভারতীয় পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিলেন ট্রাম্প। এর সঙ্গে আগে থেকেই ২৫ শতাংশ পাল্টা শুল্ক ছিল।

তবে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক তুলে নেওয়া হয়। একই সময়ে দুই দেশের বাণিজ্য কাঠামোর আওতায় ভারতের ওপর পাল্টা শুল্ক ১৮ শতাংশে নামানো হয়।

নতুন নিষেধাজ্ঞা আইনের ফলে রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের জ্বালানি বাণিজ্য আবারও ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠতে পারে।
বিজ্ঞাপন

ভারতের অবস্থান কী?
মার্কিন কংগ্রেসে বিলটি পাস হওয়ার দিনই ভারত জানিয়েছিল, নিজেদের বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, দেশের ১৪০ কোটি মানুষের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নয়াদিল্লির অন্যতম অগ্রাধিকার। সে কারণে বিভিন্ন উৎস থেকে জ্বালানি আমদানি অব্যাহত রাখবে ভারত এবং বাজার পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সিদ্ধান্ত নেবে।

মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ভারতের রাশিয়া থেকে তেল আমদানির বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এই বাণিজ্যের সম্ভাব্য প্রভাব শুধু ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ওপর নয়, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের ওপরও পড়তে পারে বলে ওয়াশিংটনকে জানিয়েছে নয়াদিল্লি।

মার্কিন রাজনীতিতেও উদ্বেগ
নতুন আইনটি অধিকাংশ রিপাবলিকান আইনপ্রণেতার সমর্থন পেলেও দলের ভেতরে শুল্কের বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ ছিল বলে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, কয়েকজন রিপাবলিকান নেতা ব্যক্তিগতভাবে দলীয় নেতৃত্বকে বিল থেকে নতুন শুল্ক আরোপের ক্ষমতা বাদ দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। তাদের আশঙ্কা ছিল, অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ হলে বিভিন্ন পণ্যের দাম আরও বেড়ে যেতে পারে।

এখন মূল বিষয় হলো—ট্রাম্প এই আইনে দেওয়া ক্ষমতা কীভাবে ব্যবহার করেন এবং রাশিয়ার তেল-গ্যাস কেনা দেশগুলোর ওপর আদৌ কতটা শুল্ক আরোপ করেন। ভারতের ক্ষেত্রেও চূড়ান্ত প্রভাব নির্ভর করবে ওয়াশিংটনের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর।

তথ্যসূত্র : এনডিটিভি

(ওএস/এএস/সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৬)