গোপালগঞ্জে ধান-চাল সংগ্রহ শতভাগ অর্জিত
গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি : বোরো-২০২৬ সংগ্রহ মৌসুমে গোপালগঞ্জ জেলায় ধান-চাল সংগ্রহ অভিযানে মূল লক্ষ্যমাত্রা শতভাগ অর্জিত হয়েছে। ধান সংগ্রহ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। কিছু চালকল মালিকের আবেদনের প্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট মিলের অনুকূলে অতিরিক্ত চাল বরাদ্দ এসেছে। সেসব মিলের চাল সংগ্রহ অব্যাহত রয়েছে। গোপালগঞ্জ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক অনিক পাল অন্তু এসব তথ্য জনিয়েছেন।
ওই কর্মকর্তা বলেন, বোরো মৌসুমে সরকারের খাদ্য মন্ত্রণালয় জেলার ৬টি খাদ্য গুদামে ১৪ হাজার ৫৮৩ মেট্রিক টন ধান , ১৪ হাজার ৭৬ মেট্রিক টন সিদ্ধ চাল ও ২৪২ মেট্রিক টন আতপ চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেয়। এর মধ্যে ধানের সংগ্রহ মূল্য কেজি প্রতি ৩৬ টাকা ও চালের দর ধরা হয় ৪৯ টাকা। আমরা মে মাস থেকে ধান-চাল সংগ্রহ অভিযান শুরু করি। নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই ধান সংগ্রহ শেষ হয়েছে। আতপ ও সিদ্ধ মিলিয়ে ১৪ হাজার ৩১৮ মেট্রিক টন চাল কেনা হয়েছে। কিন্তু বেশ কিছু চালকল মালিকের আবেদনের প্রেক্ষিতে অতিরিক্ত চাল বরাদ্দ পেয়েছেন। এখন সেসব চাল সংগ্রহ অব্যাহত রয়েছে।
ওই কর্মকর্তা আরো বলেন, জেলার ৬টি খাদ্য গুদামের ৩০% বর্ধিত হিসাবে ধারণ ক্ষমতা ১৪ হাজার ৯৫০ মেট্রিক টন। ধান চাল মিলিয়ে ইতোমধ্যে মোট সংগ্রহ করা হয়েছে ২৮ হাজার ৯০১ মেট্রিক টন। ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত সংগ্রহ করা হয়েছে ১৪ হাজার ৩১১ মেট্রিক টন। খাদ্য অধিদপ্তর দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দৃঢ় ভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ । তাই অতিরিক্ত সংগ্রহ করা খাদ্যশস্য যে সমস্ত সরকারি গুদামে ধারণ ক্ষমতা অধিক রয়েছে, সেখানে পাঠানো হয়েছে। ধান-চাল সংগ্রহ করার মাধ্যমে নিরাপদ মজুদ নিশ্চিত করতে গোপালগঞ্জ জেলা হতে খাদ্যশস্য ফরিদপুর, রাজবাড়ী, নারায়নগঞ্জ সাইলো, মংলা সাইলোসহ বিভিন্ন সরকারি গুদামে পাঠানো হয়েছে।
ধান সংগ্রহ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে জানিয়ে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক বলেন, আমরা সরাসরি প্রকৃত কৃষকের নিকট থেকে ধান ক্রয় করেছি। ৩৬ টাকা কেজি দরে একজন কৃষক সর্বোচ্চ ৩ টন ধান আমাদের কাছে বিক্রি করেছে। ধান ক্রয়ের টাকা আমরা সরাসরি কৃষকের ব্যাংক একাউন্টে দিয়েছি। ধান ক্রয়ের ক্ষেত্রে আমরা কোন সিন্ডিকেটকেই সক্রিয় হতে দেইনি। চলতি মৌসুমে জেলায় প্রায় ৫ হাজার কৃষক সরকারি খাদ্য গুদামে ধান দিয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের গোপালগঞ্জ খামারবাড়ি কার্যালয় থেকে জানাগেছে, বোরো মৌসুমে গোপালগঞ্জ জেলার ৫ উপজেলায় ৮২ হাজার ৫৮৮ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। আবাদ হয় ৮২ হাজার ৫৯৩ হেক্টরে । ১১ হেক্টরে আবাদ বৃদ্ধিপায়। উৎপাদন লক্ষমাত্রা ধরা হয় ৬ লাখ ৩৫ হাজার ৯২৭ মেট্রিক টন। আবাদ বৃদ্ধি ও বোরোর বাম্পার ফলনে এ জেলায় লক্ষ্যমাত্রা ছড়িয়ে উৎপাদিত হয় ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৭০৩ মেট্রিক টন ধান। টার্গেটের চেয়েও উৎপাদন বৃদ্ধি পায় ১০ হাজার ৭৭৬ মেট্রিক টন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের গোপালগঞ্জ খামারবাড়ির ভারপ্রাপ্ত উপ-পরিচালক সঞ্জয় কুমার কুন্ডু বলেন, আমাদের জেলায় ২ লাখ ৯৩ হাজার কৃষি খানা পরিবার রয়েছে। এরমধ্যে কত পরিবার বোরো ধান আবাদ করে, এমন নিদ্দিষ্ট কোন তথ্য আমাদের দপ্তরে নেই। তবে অনুমান করে বলা যেতে পারে প্রতি হেক্টরে ৫ জন কৃষক বোরো আবাদ করেন। সে হিসাবে এ জেলায় প্রায় ১৭ হাজার কৃষক এ ধান আবাদের সাথে জড়িত রয়েছেন। উৎপাদনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল ধান সংগ্রহ করা হয়েছে। খাদ্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে প্রায় ৫ হাজার কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনা হয়েছে। এটি বাড়াতে হবে। তাহলে ধানের আবাদ ও উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে।
বাজার মূল্য অপেক্ষা সরকার নির্ধারিত সংগ্রহ মূল্য বেশি ছিল। তাই গুদামে ধান দিতে পেরে অনেকেই খুশি। আবার গুদামে ধান দিতে না পেরে অনেকেই হতাশ।
গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার রঘুনাথপুর ইউনিয়নের চরপাড়া গ্রামের পরিমল বিশ্বাস বলেন, ৩৬ টাকা কেজি দর হিসাবে ১ হাজার ৪৪০ টাকা মন দরে গোপালগঞ্জ খাদ্য গুদামে ৩ টন ধান বিক্রি করতে পেরে আমি খুবই খুশি। সরকার এভাবে আমাদের কাছ থেকে ধান কিনলে, আমরা উপকৃত হই।
এ বছর আমি ১২ টন ধান উৎপাদন করেছি। ধান উৎপাদন খরচ, সারা বছরের সংসার খরচ বাদ দিয়ে অন্তত ৩ টন ধান রয়ে যাবে। আগামীতে ৩ টনের জায়গায় আমাদের কাছ থেকে ৬ টন ধান নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।
গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার কাঠি ইউনিয়নের খানারপাড় গ্রামের কৃষক মাজেদ সরদার বলেন, আমি ২১ টন ধান ফলিয়েছি। কিন্তু ১ কেজি ধানও সরকারের কাছে বিক্রি করতে পারেনি। তাই বাধ্য হয়ে ১ হাজার টাকা মন দরে ফরিয়াদের কাছে ধান বিক্রি করে দিয়েছি। এ কারণে আমি হতাশ। আগামীতে আমি সরকারের কাছে ধান বিক্রি করতে চাই। এজন্য গোপালগঞ্জে ধান সংগ্রহ অভিযানে বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি জানাচ্ছি।
গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুড সায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. মোমিন খান ভর্তুকি ও গুদাম বাড়ানোর তাগিদ দিয়ে বলেন, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষককে ভর্তুকি দিয়ে ধান উৎপাদন বৃদ্ধি করতে হবে। গোপালগঞ্জে প্রায় সাড়ে ৬ লাখ মেট্রিক টন ধান উৎপাদিত হয়েছে। সংগ্রহ করা হয়েছে মাত্র ১৪ হাজার ৫৮৩ মেট্রিক টন। এটি খুবই অপ্রতুল। তবে খাদ্য গুদামের ধারণ ক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি। কৃষকের কাছ থেকে বেশি বেশি করে সরকারি গুদামে ধান সংগ্রহ করতে হবে।পাশাপাশি নতুন নতুন সরকারি খাদ্য গুদাম নির্মাণ করে ধান চলের বিশাল মজুদ বাড়াতে হবে। যাতে আপৎকালীন সময়ে চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এছাড়া মধ্যস্বত্ব ভোগীদের নিয়ন্ত্রণ করে কৃষকের উৎপাদিত ধরনের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অনেকটাই সম্ভব হবে।
(টিবি/এসপি/সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬)
