সাতক্ষীরায় এবার শারদীয় দুর্গোৎসবে নতুন চমক
দেড় লক্ষাধিক দিয়াশলাই কাঠির তৈরি দুর্গা প্রতিমা
রঘুনাথ খাঁ, সাতক্ষীরা : বিভিন্ন নক্সার মাটির তৈরি দুর্গা দর্শনের একঘেয়েমী কাটাতে এবার দেড় লক্ষাধিক দিয়াশলাই কাঠি দিয়ে তৈরি করা হয়েছে দৃষ্টিনন্দন দুর্গা প্রতিমা। সাতক্ষীরা সদরের ব্রহ্মরাজপুর সার্বজনীন শ্রী শ্রী দুর্গা মন্দির কমিটি এ আয়োজন করায় শুরু থেকেই মাসব্যাপি দর্শনার্থীরা এ মন্দিরে ভিড় জমাচ্ছেন।
এদিকে মন্দির ও দর্শণার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মন্দির চত্ত্বরকে সিসি ক্যামেরার আওতায় আনার পাশাপাশি উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও ফায়ার সিভিল ডিফেন্স এর কর্মকর্তারা মন্দির এলাকা পরিদর্শন করেছেন।
আজ রবিবার দুপুরে মন্দির প্রাঙ্গণে গিয়ে দেখা গেছে,মাটি তৈরি অবয়বের উপর দেড় লক্ষাধিক দিয়াশলাই কাঠি বসানো হয়েছে। একইসাথে লাগানো হয়েছে ১০ কেজিরও বেশি রেশমী সূতা। প্রতিটি অংশে নিখুঁতভাবে কাঠি বসাতে হচ্ছে শিল্পীদের। সামান্য ভুলেও নষ্ট হতে পারে পুরো নকশা। তাই প্রতিমা তৈরিতে সময় ও শ্রম দুটিই লাগছে বেশি। আগামী সোমবার থেকে রং এর কাজ করা হবে বলে জানালেন মন্দির পরিচালনা কমিটির উপদেষ্টা কাকাই লাল সাহা।
প্রতিমা শিল্পী নবদ্বীপ সরকার বলেন, ২০২৩ সালে কোলকাতায় গিয়ে এ ধরনের কাজ দেখেছিলেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই এবার সাতক্ষীরায় দিয়াশলাই কাঠি ও রেশমি সুতা দিয়ে ব্যতিক্রমী প্রতিমা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চারজন শিল্পী দিন-রাত পরিশ্রম করে কাজ করছেন। কখনো কখনো রাত ২টা থেকে ৩টা পর্যন্ত কাজ করতে হচ্ছে। এবার শুধু সাতক্ষীরায় নয়,কুষ্টিয়া সহ৷ চারটি স্থানে দুর্গা প্রতিমা বানানোর দায়িত্ব পেয়েছেন তিনি। দিয়াশলাই এর কাঠির মাথায় থাকা বারুদের তেজস্ক্রিয়তা নষ্ট করতে এক ধরনের আঠা ব্যবহার করা হয়েছে।
ব্রহ্মবাজপুর সার্বজনীন শ্রী শ্রী দুর্গা মন্দির পরিচালনা কমিটির সহকারী কোষাধ্যক্ষ অমিত কুমার ঘোষ জানান, প্রতিমা তৈরির কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে দেড় লাখের বেশি দিয়াশলাই কাঠি। এর সঙ্গে লাগছে ১০ কেজির বেশি রেশমি সুতা। শুধু প্রতিমা তৈরির কাজেই শিল্পীদের পারিশ্রমিক নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় এক লাখ ৩০ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে এবার পূজার আয়োজনের ব্যয় দাঁড়াচ্ছে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা।
তিনি আরো জানান, জমিদার পশুপতি মিত্রের আয়োজিত এ দুর্গা পুজা ২০০ বছরের বেশী সময়৷ ধরে স্বাড়ম্বরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ব্যতিক্রমী প্রতিমা তৈরির এই আয়োজন অবশ্য ব্রহ্মরাজপুরে নতুন নয়। গত বছর ১০০ কেজি চিনিগুঁড়া ধান দিয়ে তৈরি প্রতিমা দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে দর্শনার্থীরা এসেছিলেন। সেই সাড়া থেকেই এবার আরও নতুন কিছু করার পরিকল্পনা নেয় পূজা উদযাপন কমিটি। তবে এই আয়োজনকে ঘিরে দর্শনার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছ।
ব্রহ্মরাজপুর সর্বজনীন শ্রী শ্রী দুর্গা পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি এড. গৌতম কুমার বিশ্বাস বলেন, প্রতিমাটির দাহ্যতা নিয়ে যে প্রশ্ন ওঠায় গত ১৬ সেপ্টেম্বর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অর্ণব কুমার দত্ত,সদর থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ মাহামুদুর রহমান ও ফায়ার সিভিল ডিফেন্স এর এক কর্মকর্তা বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করেছেন। প্রতিমা শিল্পী ও কমিটির সদস্যদের উপস্থিতিতে এর ট্রায়ালও করা হয়েছে।
শুধু দর্শনার্থীদের আকর্ষণ নয়, পূজাকে ঘিরে সম্প্রীতির পরিবেশ বজায় রাখার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন স্থানীয়রা। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে এই এলাকায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এবারও গ্রামের মানুষ, পূজা কমিটি ও প্রশাসনের সমন্বয়ে নিরাপদ পরিবেশে উৎসব আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে।
বাংলাদেশ সনাতন পার্টির সাতক্ষীরা জেলা শাখার সদস্য সচীব মনোদ্বীপ কুমার মণ্ডল জানান, হিন্দু সম্প্রদায়ের নয়নের মনি চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারী বিনা অপরাধের দুই বছরের বেশী সময় ধরে কারাগারে রয়েছেন। যা এবারের পুজার সার্বিক আয়োজনকে ম্লান করে দেবে।।পুজার আগেই বর্তমান সরকারের কাছে চিন্ময় প্রভুর নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করেন তিনি।
এদিকে, সাতক্ষীরা জেলাজুড়ে আসন্ন দুর্গাপূজাকে ঘিরে চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি। বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ সাতক্ষীরা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক বিশ্বনাথ ঘোষ জানান, গত বছর জেলায় ৫৮৭টি পূজা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এবার ৫৯০ টি পুজা হবে। এবার মা আসছেন ঘোড়ায়, যাবেন নৌকায়। আগামী ১০ অক্টোবর শুভ মহালয়ার মধ্য দিয়ে দেবীর মর্ত্যে আগমনের শুভ সূচনা হবে। ১৭ অক্টোবর মহাষষ্ঠী। ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীর মধ্য দিয়ে শারদীয়া দুর্গোৎসবের সমাপ্তি হবে।
(আরকে/এসপি/সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬)
