রঘুনাথ খাঁ, সাতক্ষীরা : আগামি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইসহ এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিএনপির দুই গ্রুপের সংঘর্ষে কমপক্ষে ৩০ জন আহত হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলা পরিষদ চত্ত্বর থেকে ফুলতলা মোড় পর্যন্ত কয়েকটি স্থানে এসব ঘটনা ঘটে।

আহতদের মধ্যে আবুল কালাম সবুজ,আরিফুর রহমান৷ ছোটন, ভঞ্জু, রমিজউদদীন মোড়ল, আল ইমরানসহ ১১ জনকে কালিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও বিভিন্ন ক্লিনিকে ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বিএনপি নেতা জানান, বিগত সংসদ নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী কাজী আলাউদ্দিনকে পরাজিত করাতে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে জনপ্রিয় বিএনপি নেতা ডাঃ শহীদুল আলমকে স্বতন্ত্র প্রার্থী করিয়ে ফুটবল প্রতীকে ভোট করেন নলতা ইউপি চেয়ারম্যান আরিজুল ইসলান, বিষ্ণুপুর ইউপি চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলমসহ বিএনপির একটি গ্রুপ। জামায়ত প্রার্থীর বিপরীতে দ্বিতীয় স্থান লাভ করেন ডাঃ শহীদুল আলম। তৃতীয় স্থান লাভ করেন কাজী আলাউদ্দিন। এরপর আরিজুল ইসলাম, ডাঃ শহীদুল আলম, জাহাঙ্গীর আলমসহ কয়েকজনকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। পরবর্তীতে প্রকৌশলী আয়ুব আলী মুকুল ও উপজেলা কৃষকদলের আহবায়ক রোকনুজ্জামান এর সাথে বিএনপির উপজেলা আহবায়ক এবাদুল ইসলামের কৃষ্ণনগর ইউনিয়ন বিএনপি অফিসে ককটেল হামলায় আসামী করাসহ বিভিন্ন ইস্যুতে দূরত্ব তৈরি হয়। এরই মধ্যে এবাদুল ইসলাম গোপনে নলতার এক বহিষ্কৃত নেতার সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তুলে নিজের আধিপত্য বিস্তার করতে উদ্যোগী হন। সূযোগ বুঝে কুমোরের চকের হাতছাড়া হওয়া প্রায় তিনশত বিঘা খাসজমির ঘের এর বর্তমান দখলকারি আইয়ুব হোসেন মুকুলকে বিপাকে ফেলতে এবাদুল ইসলামের সঙ্গে গোপনে সন্ধি করেন। আবার সংসদীয় নির্বাচনকে ঘিরে আভ্যন্তরীন চুক্তি না মানা নিয়ে কাজী আলাউদ্দিন ও আইয়ুব হোসেন মুকুলের সম্পর্ক ভালো যাচ্ছিলো না।

এমন এক প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগের নৈরাজ্য, অপরাজনীতি ও অগ্নিসন্ত্রাসের প্রতিবাদে মঙ্গলবার পৃথক কর্মসূচির আয়োজন করে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের দুটি পক্ষ। বিকেল ৩টার দিকে কুশুলিয়া ইউনিয়ন বিএনপির উদ্যোগে কর্মসূচি শুরু হয়। পরে বিকেল ৫টার দিকে উপজেলা কৃষকদলের আহ্বায়ক রোকনুজ্জামান রোকনের নেতৃত্বে আরেকটি বিক্ষোভ কর্মসূচির প্রস্তুতি নেওয়া হয়। পৃথক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে বিকেল থেকেই দুই পক্ষের নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কুশুলিয়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার শেখ হাসানুর রহমানের নেতৃত্বে উপজেলা বিএনপির কার্যালয়ের সামনে থেকে একটি মিছিল বের হয়। অন্যদিকে রোকনুজ্জামান রোকনের নেতৃত্বে কৃষকদলের নেতাকর্মীরা উপজেলা পরিষদ চত্বর থেকে মিছিল নিয়ে কালিগঞ্জ থানার দিকে এগিয়ে আসেন। এ সময় দুই পক্ষ মুখোমুখি হলে প্রথমে উত্তেজনা এবং পরে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষ শুরু হয়। এক পর্যায়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে এবং দুই পক্ষের নেতাকর্মীদের সরিয়ে দেয়। প্রায় ঘণ্টাব্যাপী থেমে থেমে সংঘর্ষের পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।

কৃষক দলের আহবায়ক রোকনুজ্জামান বলেন হামলায় হোগলা ওয়ার্ড কৃষকদলের সভাপতি রিজাউদ্দীন ও সাবেক সদস্য আবুল কালাম সবুজের হাত ভেঙে গেছে। এছাড়া ছাত্রদল নেতা শামিম হোসেন মুন্না, ধলবাড়িয়া ইউনিয়ন কৃষকদলের সদস্যসচিব সুব্রত কুমার খাঁ এবং উপজেলা কৃষকদলের সদস্যসচিব আরিফুল হোসেন ছোটনসহ ২০জনের বেশি নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। আহত কয়েকজনকে প্রথমে স্থানীয় একটি বেসরকারি ক্লিনিকে নেওয়া হয়। পরে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়।

অপর পক্ষের আল ইমরান হোসেন প্রথমে কালিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নেন। পরে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। এছাড়া বিপুল হোসেন ও আজমির হোসেনসহ আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তবে তাৎক্ষণিকভাবে আহত সবার পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

কুশুলিয়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার শেখ হাসানুর রহমান অভিযোগ করে বলেন, ‘আমরা শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করছিলাম। এ সময় রোকনুজ্জামান রোকন সমর্থিত লোকজন আমাদের নেতাকর্মীদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়।’ তাঁর দাবি, তাঁরা পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণভাবে মোকাবিলা করেছেন এবং সংঘর্ষ বাড়তে দেননি।

অন্যদিকে উপজেলা কৃষকদলের আহ্বায়ক রোকনুজ্জামান রোকন অভিযোগ করে বলেন, ‘পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী আমরা শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ করছিলাম। একপর্যায়ে শেখ হাসানুর রহমানের সমর্থিত লোকজন লাঠিসোঁটা নিয়ে আমাদের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালায়।’ তাঁর দাবি, এতে কৃষকদলের সদস্যসচিবসহ ৭-৮ জন রক্তাক্ত আহত হয়েছেন।

উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক ও সাবেক চেয়ারম্যান শেখ এবাদুল ইসলাম বলেন, দুই দিন আগে উপজেলা কৃষকদলের আহ্বায়ক রোকনুজ্জামান উপজেলা বিএনপির মূল ব্যানারে বিক্ষোভ মিছিল করার প্রস্তুতি নেন। তখন তাঁকে কৃষকদলের আহ্বায়ক হিসেবে পৃথক কর্মসূচি না করে মূল দলের ব্যানারে সম্মিলিতভাবে কর্মসূচি পালনের আহ্বান জানানো হয়েছিল।

তিনি আরও বলেন, মঙ্গলবার সকালে এ নিয়ে আলোচনা চলাকালে রোকনুজ্জামান সমর্থিত লোকজন ইউনিয়ন বিএনপি ও ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মনিরুল ইসলাম মনিকে মারধর করেন। এরপর উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়। তিনি বহিষ্কৃত নেতাদের সাথে কোন প্রকার সখ্যতা রাখার বিষয়টি অস্বীকার করেন।

তবে উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্যসচিব ডা. শেখ শফিকুল ইসলাম বাবু বলেন, ‘দলের মূল সংগঠনের একটি বিক্ষোভ কর্মসূচি ছিল। পাশাপাশি উপজেলা কৃষকদলের আহ্বায়ক রোকনুজ্জামানের নেতৃত্বে আরেকটি কর্মসূচি পালন করা হচ্ছিল। একপর্যায়ে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে দুই পক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে।’ তাঁর দাবি, সংঘর্ষে উভয় পক্ষের ৫-৬ জন আহত হয়েছেন।

কালিগঞ্জ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) প্রশান্ত কুমার ঘোষ বলেন, কর্মসূচিকে ঘিরে দুই পক্ষের সমর্থকরা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়লে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। সংঘর্ষ এড়াতে উভয় পক্ষকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।

কালিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ শাহীনুর রহমান জানান,পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

(আরকে/এসপি/সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২৬)