শাহ্ আলম শাহী, দিনাজপুর : এক প্রকার পালিয়ে বেড়াচ্ছেন দিনাজপুর অঞ্চলের বিএডিসি (সার) যুগ্মপরিচালক কৃষিবিদ মো. জাহাঙ্গীর আলম। অফিসে না বসে তিনি পার্শ্ববর্তী সংশ্লিষ্ট বীজ প্রসেসিং দপ্তরের অফিস রুম বা কখনো রেস্ট হাউজে সময় কাটাচ্ছেন। অন্যদিকে সারের কৃত্রিম সংকট, দামে বেশি এবং ওজনে কম নিয়ে বিপাকে পড়েছেন, এ অঞ্চলের কৃষক। 

উত্তরের শষ্যভান্ডার দিনাজপুরে এই সার কেলেংকারিতে চলতি মৌসুমে আমন ধান, আগাম আলু, ভুট্রা, পেঁয়াজ, রসুন, সব্জিসহ রবি শষ্য চাষাবাদ নিয়ে কৃষকে হিমসিম খেতে হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তর কৃত্রিম সার সংকটের বিষয়টি স্বীকার করলেও নিচ্ছেনা না কোন পদক্ষেপ।

এই সার কেলেঙ্কারিতে বিএডিসি দিনাজপুর অঞ্চলের যুগ্মপরিচালক (সার) কৃষিবিদ মো. জাহাঙ্গীর আলম এক প্রকার পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। অফিস সময়ে তিনি নিজ কার্যালয়ে না বসে পার্শ্ববর্তী বিএডিসির বীজ প্রসেসিং কার্যালয়ের অফিস রুম এবং রেস্ট হাউসে সময় কাটাচ্ছেন। জরুরি কোন কাগজ-পত্রে তার স্বাক্ষর প্রয়োজন হলে অফিস থেকে লোক গিয়ে সেখান থেকেই স্বাক্ষর নিয়ে আসছেন। এভাবে এখন চলছে বিএডিসি (সার) দপ্তরের কার্যক্রম।

এর সত্যতা নিশ্চিত করেছেন বিএডিসি দিনাজপুর অঞ্চলের বীজ প্রসেসিং দপ্তরের যুগ্মপরিচালক মুনিরুজ্জামান। তিনি বলেছেন, 'রেস্ট হাউজে নয়,আমার অফিস রুমেই বসে থাকে ঘন্টার পর ঘন্টা। অফিস ছেড়ে তিন/ চার ঘন্টা আমার অফিসে কেন-বসে থাকে আমি নিজেও জানিনা। বিরক্ত হলেও মুখে কিছু বলতে পারিনা। তিনি আসলে সম্ভবত মানুষিক ভাবে সমস্যায় আছেন। তাছাড়া একটু গায়োর প্রকৃতির মানুষ। কোন কথাও শোনেনা। নিজে যা ভালো মনে করেন, তাই করেন।'

আপনার রেস্ট হাউজে কী করেন? প্রশ্ন করলে যুগ্মপরিচালক মুনিরুজ্জামান বলেন, না রেস্ট হাউজে সব সময় থাকেন না। হয়তো মাঝে মাঝে রেস্ট ও খাওয়া-দাওয়ার জন্য হয়তো গিয়েছেন।

রেস্ট হাউজে রংপুরের এক নারীর আগমন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, 'ওই নারীকে ব্যাংকের এক ডিজিএম এর আইনজীবী ডেকেছিলেন কোন এক কাজে। ব্যাংকের ডিজিএম এবং তার আইনজীবী কোন এক মামলার জন্য আমাদের রেস্ট হাউজে উঠেছিলেন। তবে ওই নারী দেড়/দুই ঘন্টার বেশি সময় ছিলেন না। এটাই সত্য।'

শুধু সারের কৃত্রিম সংকট নয়, সম্প্রতি দিনাজপুরে বিএডিসির সরকারি গোডাউন থেকে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার বস্তা সার লোপাটের ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় দুইটি মামলা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপে সরকারি গোডাউন থেকে সার লোপাটের বিষয়টি ধরা পরার পর সংশ্লিষ্ট (নশিপুর-কাঞ্চন) গোডাউনের স্টোর কিপার আকতারুলকে আটক করা হয়। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অনেকে জড়িত তা ধামা চাপা দিতে প্রথমে বিএডিসির পক্ষ থেকে দায়সারা ভাবে (নিজেরাই চোর-পুলিশ খেলাতে) এলটি মামলা করে। পরে দূর্নীতি দমন কমিশন-দুদক আরেকটি মামলা দায়ের করে। সেই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অবৈধ সম্পদ ও টাকার পাহাড়ের খোঁজে মাঠে নেমেছে দুদক। এতে যুগ্মপরিচালক (সার) জাহাঙ্গীর আলমসহ সংশ্লিষ্ট অনেকের মাথা খারাপ হয়ে গেছে। তাই,অফিস না করে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন তারা।

অন্যদিকে বিএডিসির তালিকাভূক্ত ডিলারদের কাছে সার না মিললেও প্রায়শই তাদের গোডাউন বাসা-বাড়ি, মিল-চাতাল, গরুর খামার থেকে অবৈধ মজুত সার জব্দ হচ্ছে। বেশি টাকা দিলে খুচরা ব্যবসায়িদের কাছে যত প্রয়োজন সার মিলছে। কিন্তু বেশি টাকা দিয়ে সার ক্রয় করেও কৃষক পাচ্ছেনা, সঠিক ওজনে সার। ৫০ কেজির বস্তায় দেড় থেকে দুই কেজি সার কম থাকছে।ফলে কৃষক যেমন ঠকছেন, তেমনি ব্যাহত হচ্ছে রবি মৌসুমে চাষাবাদ।

সারের কৃত্রিম সংকট, দামে বেশি এবং ওজনে কম এর সত্যতা যাচাইয়ে সরজমিনে বিএডিসির সার গোডাউনে গিয়ে এর সত্যতা মিলেছে।দিনাজপুর শহরের পুলহাট এবং নশিপুরস্থ বিএডিসির সার গোডাউনের রক্ষক ও শ্রমিকদের সহায়তায় বস্তা ওজন করেই মিলেছে, ওজনে সার কম দেয়ার সত্যতা। বিএডিসির সার ব্যবস্থাপনায় বিদেশ থেকে আমদানিকৃত ৫০ কেজি’র এমওপি, ডিএপি ও টিএসপি বস্তায় দেড় থেকে দুই কেজি সার কম পাওয়া গেছে। কিন্তু গোডাউন রক্ষকদের অনুযোগ, জাহাজ থেকে সার লোডিং এবং স্থানে পৌঁছাতে খামাল করতে কিছু সার পড়ে যায়,নষ্ট হয়।একারণেই কম।

কৃষকের অভিযোগ, সারের কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে ডিলার ও খুচরা সার বিক্রেতারা সরকার নির্ধারিত দামরে চেয়ে বেশি দামে সার করছেন করছনে। বিশেষ করে ট্রপিল সুপার ফসফটে (টিএসপি)ডাই অ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) ও মউিরটে অব পটাশ (এমওপি) সার অনকে বশেি দামে বিক্রির অভিযোগ উঠছে।

চেহেলগাজী কৃষক কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো.নজরুল ইসলাম বলেন, 'বিড়ালের গলায় ঘন্টা বাধবে কে ? যে সরকারেই আসুক,আমাদের কৃষকদের দিকে কেউ তাকায় না, আমাদের আত্মনাত কেউ শুনেনা। আগাম সবজি লাগানোর জন্য সার আনতে গিয়ে সার পাইলাম না। বেশি কাটা দিলে আবার ঠিকই সার পাওয়া যাচ্ছে। বস্তা প্রতি দুই-তিনশত টাকা বেশি নিচ্ছে। এর প্রতিবাদ করিলে সারেই দিবে, না, করিবেন কী? হামার কৃষক সমিতি,টমিতির কোন খাওয়া নাই। বেশি টাকা দিলেই সার পাওয়া যায়।'

সারের কৃত্রিম সংকট,দামে বেশি এবং ওজনে কম নিয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষক। এতে ধান, গম, আলু, ভুট্রা, পেঁয়াজ, রসুন, সব্জিসহ রবি শষ্য চাষাবাদ নিয়ে কৃষক হিমসিম খাচ্ছেন।

বিরল উপজেলার বিজোড়া গ্রামের কৃষক আরফিনের অভিযোগ, কৃষকের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিলি খেলা হচ্ছে। কৃষি অফিসার বলছেন, সার আছে।ডিলার বলছেন সার নাই। তাহলে আমরা কোথায় যাই! এইল্যা অভিযোগ-টভিযোগ করি কোন লাভ নাই। বেশি টাকা না দিলে সারেই দিবে নাই। বস্তায় সার কম থাকিলে কী আর বেশি থাকিলে, এইল্ল্যা কেউ শুনে না। সার যে পাওয়া যাচ্ছে এটাই নাকি আমাদের ভাগ্য-এমনি কথা শুনতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। তাই, সার নিয়ে কথা বলা ছাড়ি দিছি।'

সদর উপজেলার দক্ষিণ কোতয়ালী উলিপুর এলাকার কৃষক রফিকুল ইসলাম জানালেন, হামরা প্রতিবছর আগাম আলু লাগাই। ভালো দাম পাই। এই আলু লাগাইয়া লাভের টাকা দিয়া হামার সংসার চলে। এইবার লাগামো ক্যামন করি? সারের যে দাম, বস্তায় ৩/৪: শ টাকা বেশি নেছে। বেশি না দিলে ডিলার কহেছে সার নাই। খুচরা দোকানোত বেশি টাকা দিলে সার এবেল এবেল পাওয়া যাছে। এতো টাকা দিয়া সার কিনি আবাদ করিমো ক্যামন করি? হামার ভিতি সরকারোক এনা চোক মেলিবা কহেন। হামরা বাচিলে সরকার বাচিবি ক্যামন করি-এল্ল্যা এননাও চিন্না করেনা!'

অনুসন্ধানে দেখা গেছে,বিএডিসির সার ব্যবস্থাপনায় দিনাজপুর অঞ্চলের তিন জেলায় কাগজ-কলমে ৬ শতাধিক সার ডিলার রয়েছে। তবে, বাস্তবতায় স্ব-নামে, বে-নামে গুটি কয়েকজন এই সার ডিলারশীপ নিয়ে বসে আছেন। তারা অনেকে রাতারাতি শূণ্য থেকে কোটিপতি হয়েছেন।

এ অঞ্চলে সার বন্টনের মুল ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে নিয়োজিত বিএডিসির যুগ্ম পরিচালকের এই পদটি নিয়েও রয়েছে, কারো কারো ঈর্ষণীয় লোভ/চাহিদা। তারপরও তারা সার কেলেংকারি নিয়ে মূখ খুলতে নারাজ। অন্যদিকে সার মনিটরিং এর দায়িত্বে নিয়োজিত কৃষি বিভাগও এ নিয়ে উদাস। জেলার হাট-কাজারগুলোতে নিয়মিত মনিটরিং নেই তাদের।

তবে কৃষি অধদিপ্তর সারের কোন সংকট নেই বলে দাবি করেছে। গত বছরের তুলনায় এবার এক হাজার মেট্রিক টন সার বেশি বরাদ্দ রয়েছে বলে জানিয়েছেন, দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ও জেলা সার মনিটরিং সেলের সদস্য সচিব মো.আফজাল হোসেন।

(এসএস/এসপি/সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২৬)