রিয়াজুল রিয়াজ, বিশেষ প্রতিনিধি : ফরিদপুরে পাকা প্রাচীর নির্মাণ করে সরকারি খাস জমিসহ একটি সার্বজনীন দূর্গামন্দিরের স্থায়ী দখলে নিয়েছেন দখলদার লিটন সাহা। এ নিয়ে ওই মন্দির সংলগ্ন এলাকায় হিন্দু সম্প্রদায়ের দু'পক্ষের মধ্যে চাপা ক্ষোভ ও উত্তেজনা বিরাজ করছে। যা যেকোনো সময় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নিতে পারে।

ফরিদপুর পৌরসভার ৪নং ওয়ার্ডে অবস্থিত দিগনগর সর্বজনীন দূর্গা মন্দিরটি স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের জনগণ একটানা ২৬ বছর নিয়মিত পূজা অর্চনা করে আসছিলেন। বছর দু'য়েক আগে কমিটি নিয়ে বিরোধের জেরে মন্দিরটি নিজের জায়গায় দাবি করে দখলে নেওয়ার চেষ্টা করেন স্থানীয় প্রয়াত রঞ্জিত সাহার পুত্র লিটন সাহা। এরপর কেটে গেছে দুই বছর, মন্দিরটি দখলে নিতে পক্ষ প্রতিপক্ষের মধ্যে একাধিক হামলা-মামলা, গ্রেপ্তার, বহু বিচার -শালিস, হুমকি-ধামকি'র পরও তার সমাধান হয়নি। সেই সাথে এ মন্দিরটির বিরোধ মিটিয়ে এলাকায় শান্তি ও ঐক্য ফেরাতে জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, স্থানীয় রাজনীতিবিদ, হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দ ও স্থানীয় সুশীল সমাজের নেতৃবৃন্দের আন্তরিক প্রচেষ্টা অব্যাহত চলমান রয়েছে। কিন্তু এরই মধ্য দখলদার লিটন সাহা ইট, বালু কংক্রিটের পাকা প্রাচীর তৈরি করে সরকারি খাস জমিসহ সার্বজনীন দূর্গামন্দির স্থায়ী দখল নিয়েছেন। যার মূলে মন্দিরটি কেন্দ্র গড়ে ওঠা মন্দির কমিটির সভাপতি কুমারেশ সাহা ও সাধারণ সম্পাদক আনন্দ সাহা দু'টি গ্রুপ ভাগ হওয়া। লিটন সাহা সম্প্রতি পূর্বের ন্যায় সবাই মিলে মন্দিরটিতে পূঁজা - অর্চনা করার ইচ্ছে পোষণ করলেই, শেষ পর্যন্ত সেটি আর না করে ঘটা করে প্রাচীর নির্মাণ করলেন তিনি।

এর আগে তেঁতুল তলায় বাসস্ট্যান্ডে সড়ক বিভাগের জন্য অধিগ্রহণকৃত সরকারি জমি থেকে ২ শতাংশ জমি নিজের দাবি করে স্টাম্পের মাধ্যমে দখলদার বাহিনীর নিকট বিক্রি করে দেওয়ার ঘটনায় আলোচনায় আসা লিটন সাহা একাধিক দপ্তরের সরকারি জমিসহ দখলে নিয়েছেন নিজেদের বাড়ীর পাশে স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের ২৬ বছর যাবত ব্যবহৃত একটি সার্বজনীন দূর্গামন্দির। সরকারি হালট -এর খাস জায়গায় অবস্থিত সরকারি রাস্তার সাথে লাগানো ওই মন্দিরটিকে নিজের করে নিতে তিনি প্রথমে টিনের দেয়াল তোলার চেষ্টা করেন। দূর্গা মন্দিরে নিয়মিত পূজা অর্চনা করা স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের ৩০/৩৫টি পরিবারের জনগণ আপত্তি জানালে তাদেরকে মামলার ভয় দেখানোর পাশাপাশি ভাড়াটে লোকজন দিয়ে হুমকি ধামকি ও হট্টগোল সৃষ্টি করে টিনের বেড়া দিয়ে মন্দিরটি ওই সময় দখলে নেন লিটন কুমার সাহা। মিডিয়ার সামনে তৎকালীন কোতয়ালি থানা পুলিশের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে বর্তমানে ওই টিনের বেড়া ভেঙে সেখানে পাকা ইটের দেয়াল দেওয়ার কাজ শেষ হয়েছে।

স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের নিয়মিত পুজা অর্চনার জন্য মন্দিরটি উদ্ধারে দিগ নগর সার্বজনীন দূর্গা মন্দিরের সভাপতি কুমারেশ সাহার আবেদনের ভিত্তিতে গত ৫ মার্চ ২০২৬ ইং তারিখে কানাইপুর ইউনিয়ন ভূমি সহকারি কর্মকর্তা (তহসিলদার বা ভূমি নায়েব) ফরহাদ মন্ডলকে সাথে নিয়ে উপজেলা ভুমি অফিসের কর্মকর্তাবৃন্দ (সার্ভেয়ার সহ) জায়গাটি মাপামাপি করে আসেন। কিন্তু বারবার প্রতিশ্রুতি দিলেও উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভূমি) শফিকুল ইসলাম অজানা কারণে ওই মাপের কোনো তথ্য দেননি আবেদনকারী কুমারেশ সাহাকে। এমনকি ফরিদপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মেশকাতুল জান্নাত রাবেয়াকেও ওই জরিপের তথ্য দেননি এসিল্যান্ড শফিকুল। গত ১৯ আগস্ট এ বিষয়ে তথ্য নিয়ে ইউএনও'র নিকট গেলে তিনি এ প্রতিবেদকের সামনে এসিল্যান্ডকে ফোন দিলে তিনি ওই সময় ফোন ধরেননি। পরে তিনি এসিল্যান্ডের হোয়াটসঅ্যাপ এ মেসেজ পাঠিয়ে তাঁর রেফারেন্স দিয়ে এ প্রতিবেদকের সামনে কুমারেশ সাহাদের এসিল্যান্ডের সাথে যোগাযোগ করতে বলেন ইউএনও রাবেয়া। ইউএনওর নির্দেশনা অনুযায়ী কুমারেশের লোকজন গত ২০ আগস্ট উপজেলা ভূমি অফিসে গেলে এসিন্যান্ডের কার্যালয়ের সার্ভেয়ার আবু বকর সিদ্দিক প্রথমে তাদেরকে জানান, 'ওই মাপের কোনো নথি খুঁজে পাচ্ছি না, সম্ভবত ওই জরিপের সব নথিপত্র হারিয়ে গেছে। পরে আবেদনকারীদের জেরার মূখে আবু বকর বলেন, 'এসিল্যান্ড স্যারকে জিজ্ঞেস করেন, এ বিষয়ে আমি কিছুই বলতে পারবো না'। কিন্তু যথারীতি সেদিনও এসিন্যান্ড শফিকুল ইসলামের সাথে যোগাযোগে ব্যর্থ হন আবেদনকারীরা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফরিদপুর উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভূমি) মো. শফিকুল ইসলাম মন্দিরের সভাপতির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁদের জমি মাপের বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে এসিল্যান্ড জানান, 'এগুলো এসিল্যান্ডের কাজ নয়। এগুলো ব্যক্তিগত জমিজমা সংক্রান্ত বিষয়'। এ সময় এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে এসিল্যান্ড শফিকুল আরও জানান, 'ওখানে সরকারের কোনো জমি নেই'।

কিন্তু স্থানীয় ভুমি অফিসের সরকারি নথিপত্র বলছে ভিন্ন কথা। কানাইপুর ইউনিয়ন ভুমি অফিসের তথ্যমতে ৪৩ নং নকশা অনুযারী ছোনপঁচা মৌজায় ২০১ নং দাগে লিটন সাহার পৈতৃক বাড়ীর যে জমি রয়েছে তার পরিমান ১৭.৫ শতাংশ। তথচ মন্দির ও সরকারি জায়গাসহ লিটন সাহা দখল করে রেখেছেন প্রায় ৫০ শতাংশের মতো জায়গা। স্থানীয়দের তথ্যমতে বাকী জায়গা সরকারি হালটের বা সরকারি জমি। উপরোক্ত তথ্যটি লিটনও অস্বীকার করেন নি।

এসিন্যান্ড শফিকুল ইসলাম ওইখানে সরকারি জমি নাই বলে যে রেকর্ডেড স্টেটমেন্ট উত্তরাধিকার ৭১ নিউজকে দিয়েছেন তা সরকারি নথিপত্র এবং ওই জরিপে অংশ নেওয়া স্থানীয় কানাইপুর ইউনিয়ন সহকারি ভূমি কর্মকর্তা (তহসিলদার) ফরহাদ মন্ডলের দেওয়া তথ্যে গড়মিল রয়েছে। এছাড়া, লিটন সাহা নিজেও স্বীকার করেছেন দখলকৃত জায়গার মধ্যে বেশ কিছু সরকারি জায়গা রয়েছে। তবে, তা কত শতাংশ সেটি না বললেও ১০-১৫ শতাংশের মতো হবে বলে দাবি লিটন সাহার।

এদিকে, কানাইপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের তহসিলদার ফরহাদ মন্ডল এ বিষয়ে জানান, 'এসিল্যান্ড স্যারের নির্দেশে আমি ওই জরিপের অংশ ছিলাম। গত রমজানে রোজা থেকে প্রায় সারাদিন আমরা জমিটি মাপামাপি করেছি। এসিল্যান্ড স্যার নিজেও এসেছিলেন। ওখানে লিটনের বাড়ীর ১৭.৫ শতাংশের বাইরে সরকারি জায়গাও রয়েছে। শুধু লিটন সাহা নয়, ওই এলাকায় রাস্তার পাশের অনেকের মধ্যে সরকারি যায়গা রয়েছে। সরকারি খাস জায়গা সাথে লাগানো যাদের যায়গা দিগনগর রাস্তার পাশে রয়েছে তারাই মূলত: জায়গাগুলো ভোগ দখলে রেখেছেন। আপাতত সরকারের কাজে না লাগায় জায়গাগুলো উদ্ধার করার পদক্ষেপ হয়তো নেয়নি সরকার'। লিটন সাহা মন্দিরের জায়গা ও তার বাড়ীর সামনের জায়গা সম্পর্কে তহসিলদার ফরহাদ আরও বলেন, লিটন সাহা বাড়ির বিল্ডিংটি তার জায়গার মধ্যে ই রয়েছে। তবে তার বাড়ীর ২০১ দাগের ১৭.৫ শতাংশ জায়গার বাইরের অধিকাংশই সরকারি খাস জায়গা। তিনি আরও বলেন রাস্তাটির উল্টো পাশে লিটন সাহা কিছু জায়গা ক্রয় করায় এবং রাস্তার দুই পাশে তার জায়গা থাকায় ওই অংশে থাকা খাস জমির সবটুকুই এখন লিটন সাহা ভোগ করেছেন। এমনকি লিটন সাহার দলকৃত মন্দিরটির মধ্যেও খাস জায়গা রয়েছে বলেও জানান তহসিলদার ফরহাদ।

এসব বিষয়ে লিটন সাহা উত্তরাধিকার ৭১ নিউজকে জানান, যেহেতু মন্দিরের পাশে আমার পৈতৃক সম্পত্তি ও রাস্তার ওপর পাশে আমার জমি বরাবর ৪ শতাংশ জমি কিনেছি এবং ওই রাস্তার রাস্তার দুই পাশের জমিই আমার। সুতরাং ওইখানে সরকারি জমি যা আছে সেটিও আপাতত আমার।

'সরকারের কাজে না লাগলে হয়তো পাশের জমির মালিক তা ব্যবহার করতে পারেন। কিন্তু সেক্ষেত্রেও সরকার থেকে লিজ নেওয়ার একটা পক্রিয়া আছে। তাছাড়া, ইটের প্রাচীর বা ইমারত নির্মাণ করে সরকারি জায়গা দখলেরও কোনো নিয়ম না থাকলেও, তিনি মন্দিরটিসহ সরকারি জমি স্থায়ীভাবে দখল করতে পুরোপুরি সম্প্রতি টিনের প্রাচীর ভেঙে ইটের তৈরী পাকা প্রাচীর নির্মাণ করেছেন এবং মন্দিরটি ও সরকারি খাস জায়গা বাউন্ডারি করে ঘিরে ফেলেছেন।

এদিকে, লিটন সাহার বাবা রঞ্জিত সাহার জীবদ্দশায় ও তাঁর মৃত্যুর কিছুদিন পরে সহ একটানা প্রায় ২৬ বছরের বেশি সময় ধরে এ মন্দিরটি দিগ নগর সার্বজনীন দূর্গা মন্দির হিসেবে পরিচিত ছিলো এবং ওই এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রায় ৪০টি পরিবার ওই মন্দিরে একই সাথে পূজা করে আসছিলেন। বর্তমানে লিটন সাহা ছোনপচা রঞ্জিত সাহার বাড়ী সার্বজনীন দূর্গা মন্দির নাম দিয়েছেন।

কমিটির প্রথম গোল্ডগোল হয় আগস্টের পরবতী অস্থির সময়ে। সে সময় দখলদার লিটন সাহার বড়ভাই রমেশ সাহাকে সভাপতি করার আবদার করে মন্দিরটি কুক্ষিগত করার চেষ্টা করলে বর্তমান সভাপতি রমেশ সাহা সহ স্থানীয়রা বাধা দিয়ে ভোট দিতে বলেন। কিন্তু তিনি ভোটে না গিয়ে গুন্ডা ভাড়া করে মন্দিরটি দখলে নেন।

এদিকে, গত দুর্গা পুজার সময় সরকারি অনুদান আসে মন্দিরটির পূর্বের ও পরের দুই নামেই। লিটন সাহা পারিবারিকভাবে দূর্গা পুঁজা করলেও পরের নামে তিনি টাকা তুলেছেন। তবে, মন্দিরটি পুর্বের নামে অনুদান আসলেও মন্দিরটির পুজা বঞ্চিত পূর্বের কমিটির সভাপতি সে টাকা তুলেন নাই।

বিষয়টি স্থানীয় জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন অবগত আছেন। এমনকি স্থানীয় সংসদ চৌধুরী বায়াব ইউসূফ পর্যন্ত এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে আশ্বাস দিলেও কোনো প্রকার সমাধান পাননি ২৬ বছর যাবত পুজা করে আসা দিগনগর সাহা পাড়ার স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের একাংশ।

এদিকে,মাস খানেক আগে লিটন সাহা পুর্বের ন্যায় আবারও এ মন্দিরটি সবাই মিলে ব্যবহার করবেন এবং তিনি কোনো ঝুট ঝামেলা চাননা বলে সমাধানের কথা বললেও শেষ পর্যন্ত তিনি এ পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি। কেনো গ্রহণ করেননি তাও তিনি জানাননি। পূঁজা কমিটিতে তার বড়ভাইকে ভাইটাল পোস্টে রাখা ও তরুণদের প্রাধান্য দিয়ে কমিটি করার লিটন সাহার প্রস্তাবও মেনে নিয়েছিলেন ওপর পক্ষ। তবে শেষ পর্যন্ত লিটন সাহা তার মত পাল্টে পুরোনো টিনের প্রাচীর ভেঙে নতুন পাকা দেয়াল তুলেছেন।

এদিকে, টানা ২৬ বছর পুজা করে গত বছর পুজা বঞ্চিত হওয়া স্থানীয়রা এবার আবার দুর্গা পুজা করার আশা করলেও লিটন গংদের ফাঁকিবাজি কৃতকর্মে আবারও আশাহত হয়েছেন তারা। এ নিয়ে এলাকায় দু'পক্ষের মধ্যে চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে। দুর্গা পুজাকে সামনে রেখে এ উত্তেজনা চরম ক্ষোভ বা হিংসায় রূপ নিয়েছে। সার্বজনীন এ মন্দির ও দূর্গা পুঁজা ঘিরে আবারও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে। এমতাবস্থায় এলাকায় হিন্দু-মুসলমান শাস্তিপ্রিয় জনগণ এ ব্যাপারটি গ্রহণযোগ্য সমাধান কামনা করেছেন। এ ব্যাপারটি সমাধানে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও স্থানীয় প্রশাসনের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন স্থানীয় জনসাধারণ।

(আরআর/এএস/সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২৬)