ক্ষমতার পালাবদল, স্বার্থের ধারাবাহিকতা
রাসেল আহমদ
ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী; রাষ্ট্রের স্বার্থ দীর্ঘস্থায়ী; আর ভূরাজনীতি সেই দীর্ঘস্থায়ী স্বার্থেরই হিসাব। ব্রিকসের নয়াদিল্লি সম্মেলনকে বাংলাদেশের দৃষ্টিতে পড়তে হলে এই সত্যটিই আগে বুঝতে হবে। ১৪০ দফার 'নয়াদিল্লি ঘোষণা'তে সন্ত্রাসবাদ থেকে বৈশ্বিক শাসন, অর্থনীতি থেকে জাতিসংঘ সংস্কার- অনেক কিছুই এসেছে। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য এর গভীরতর পাঠ ঘোষণাপত্রের শব্দে যতটা, তার চেয়ে বেশি রয়েছে ক্ষমতার পালাবদলের পরও কোন সম্পর্কগুলো টিকে থাকে, কোন স্বার্থগুলো অটুট থাকে এবং কোন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এখনো আন্তর্জাতিক হিসাবের অংশ হয়ে থাকেন- সেই প্রশ্নে।
ব্রিকস ঘোষণায় পহেলগামে সন্ত্রাসী হামলার নিন্দা এবং সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় কঠোর অবস্থানের কথা বলা হয়েছে। একই ঘোষণায় চীন ও রাশিয়া জাতিসংঘে ভারত ও ব্রাজিলের বৃহত্তর ভূমিকার আকাঙ্ক্ষার প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে। ভারতের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক বার্তা। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো- ক্ষমতার পরিবর্তনের পর তার পুরনো ভূরাজনৈতিক সম্পর্কগুলোর ভবিষ্যৎ কী?
এই প্রশ্নেই শেখ হাসিনার প্রসঙ্গটি স্বাভাবিকভাবে ফিরে আসে। শেখ হাসিনা এখন ক্ষমতার বাইরে। কিন্তু তাঁর দীর্ঘ শাসনামলে গড়ে ওঠা ভারত-রাশিয়া সম্পর্ক, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, অবকাঠামো ও কৌশলগত সহযোগিতার মতো বিষয়গুলো তো রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে রাতারাতি বিলীন হয়ে যায়নি।
একজন রাষ্ট্রনায়কের রাজনৈতিক অবস্থান বদলাতে পারে; কিন্তু তাঁর সময়ের রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত, আন্তর্জাতিক সমঝোতা ও কৌশলগত সম্পর্কের উত্তরাধিকার থেকে যায়। এই উত্তরাধিকারের কারণেই শেখ হাসিনা বাংলাদেশের বর্তমান ভূরাজনৈতিক আলোচনায় এখনো প্রাসঙ্গিক।
ব্রিকস সম্মেলনের সময় রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে শেখ হাসিনার প্রায় ২০ মিনিটের ফোনালাপ হয়েছে- এমন দাবি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভালও নাকি সেখানে উপস্থিত ছিলেন- এমন কথাও প্রচারিত হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত ক্রেমলিন, ভারত সরকার বা শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে এ কথোপকথনের আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ কিংবা কোনো সরকারি ট্রান্সক্রিপ্ট প্রকাশিত হয়নি। ফলে এটিকে প্রতিষ্ঠিত ঘটনা নয়, বরং আলোচিত একটি দাবি হিসেবেই দেখা উচিত। তবু এই দাবির রাজনৈতিক তাৎপর্য অস্বীকার করা যায় না। কারণ রাজনীতিতে কখনো কখনো একটি ফোনালাপের চেয়ে ফোনালাপের খবরও বড় হয়ে ওঠে। বিশেষ করে যখন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ক্ষমতার বাইরে, বিদেশে অবস্থান করছেন এবং তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে দেশে-বিদেশে আলোচনা চলছে।
শেখ হাসিনার জন্য আন্তর্জাতিক যোগাযোগের প্রশ্নটি তাই কেবল ব্যক্তিগত মর্যাদার বিষয় নয়; এটি রাজনৈতিক অস্তিত্বেরও প্রশ্ন। একজন ক্ষমতাচ্যুত নেতাকে যদি বড় শক্তিগুলো এখনো তাদের হিসাবের বাইরে না রাখে, তাহলে সেটি অন্তত এই বার্তা দেয় যে তাঁর রাজনৈতিক অধ্যায়ের ভূরাজনৈতিক উত্তরাধিকার পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। তবে এখানেই বাস্তবতার সঙ্গে আবেগের পার্থক্য করতে হবে।
কোনো বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে যোগাযোগ বাংলাদেশের আদালতের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে পারে না। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে চলমান আইনি প্রক্রিয়ার নিষ্পত্তি বাংলাদেশের আইন ও বিচারব্যবস্থার বিষয়। তাঁর দেশে ফেরার সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক পরিণতিও নির্ভর করবে দেশের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতার ওপর। আন্তর্জাতিক যোগাযোগ রাজনৈতিক বার্তা তৈরি করতে পারে; কিন্তু তা নিজে থেকে আইনি পরিণতি নির্ধারণ করে না।
তাহলে রাশিয়ার আগ্রহ কোথায়? রূপপুরে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রাশিয়ার প্রযুক্তি ও অর্থায়নে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কৌশলগত প্রকল্পগুলোর একটি। সম্প্রতি প্রকল্প এলাকায় বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের একটি পুরোনো ভবনে আগুনে অভ্যন্তরীণ সার্ভার, কম্পিউটার ও কিছু নথি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঘটনার কারণ তদন্তাধীন; কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে গুরুত্বপূর্ণ নথির ব্যাকআপ রয়েছে এবং মূল পারমাণবিক স্থাপনায় এর প্রভাব পড়েনি।
সুতরাং অগ্নিকাণ্ডকে নাশকতা বা ষড়যন্ত্র হিসেবে চিহ্নিত করার মতো প্রতিষ্ঠিত তথ্য নেই। কিন্তু এত বড় একটি আন্তর্জাতিক প্রকল্পে নিরাপত্তা, তথ্য-ব্যবস্থা, অর্থায়ন ও ভবিষ্যৎ পরিচালনা নিয়ে রাশিয়ার আগ্রহ থাকা স্বাভাবিক। মস্কোর কাছে বাংলাদেশ শুধু একটি বন্ধুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক পরিসর এবং রাশিয়ার দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পৃক্ততার ক্ষেত্র।
এই বাস্তবতাই শেখ হাসিনা প্রসঙ্গকে আরও অর্থবহ করে। কারণ রাষ্ট্রের কূটনীতি ব্যক্তির প্রতি আনুগত্যে চলে না; চলে স্বার্থের ধারাবাহিকতায়। শেখ হাসিনার সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্কের রাজনৈতিক ইতিহাস থাকলেও মস্কোর কাছে রূপপুর, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, বিনিয়োগ, ঋণ এবং ভবিষ্যৎ প্রভাবের প্রশ্নগুলো আলাদা বাস্তবতা। ফলে শেখ হাসিনার সঙ্গে যোগাযোগ থাকলে সেটিকে নিছক ব্যক্তিগত সমর্থন হিসেবে দেখার চেয়ে রাষ্ট্রীয় স্বার্থের বৃহত্তর কাঠামোর মধ্যে দেখা বেশি যুক্তিসঙ্গত।
এখানেই ‘প্র্যাগমাটিজম’ বা বাস্তববাদী রাষ্ট্রনীতির আসল অর্থ। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কোনো রাষ্ট্র একসঙ্গে বর্তমান সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে এবং ভবিষ্যতের সম্ভাব্য রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সঙ্গেও যোগাযোগের পথ খোলা রাখে। কারণ আজকের ক্ষমতাসীন ব্যক্তি আগামীকাল ক্ষমতার বাইরে যেতে পারেন; আবার আজকের ক্ষমতাচ্যুত ব্যক্তি ভবিষ্যতের রাজনীতিতে নতুন ভূমিকায় ফিরতে পারেন। রাষ্ট্র তাই ব্যক্তির ভাগ্যের ওপর তার দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থকে বাজি রাখে না।
ভারতের ক্ষেত্রেও বাস্তবতা একই। বাংলাদেশ তার প্রতিবেশী, নিরাপত্তা ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। রাশিয়ার জন্য বাংলাদেশ কৌশলগত ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। চীনের জন্য বাংলাদেশ আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য ও অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের অংশ। পশ্চিমা দেশগুলোরও রয়েছে নিজস্ব রাজনৈতিক, মানবাধিকার, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ। ফলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পালাবদলকে প্রত্যেকেই নিজেদের স্বার্থের আয়নায় দেখবে।
এই বহুমাত্রিক বাস্তবতায় শেখ হাসিনার রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা একটি ভিন্ন অর্থ পায়। তিনি বর্তমানে ক্ষমতায় নেই- এটি রাজনৈতিক বাস্তবতা। কিন্তু তাঁর আমলে তৈরি হওয়া সম্পর্ক, চুক্তি ও কৌশলগত উত্তরাধিকার এখনো বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির বহু সমীকরণে উপস্থিত। সেই কারণে তাঁকে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক বলে ধরে নেওয়া যেমন তাড়াহুড়ো হবে, তেমনি কোনো আন্তর্জাতিক যোগাযোগকে তাঁর রাজনৈতিক পুনরুত্থানের নিশ্চয়তা হিসেবে দেখাও বাস্তবসম্মত নয়।
ব্রিকস তাই শেখ হাসিনাকে কোনো আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক স্বীকৃতি দিয়েছে- এমন দাবি করার সুযোগ নেই। কিন্তু ব্রিকসকে ঘিরে তাঁর নাম আবার আন্তর্জাতিক আলোচনায় এসেছে। আর সেটিই এই মুহূর্তে লক্ষণীয়।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি 'কে জিতল' বা 'কে হারল'-এত সরল নয়। ক্ষমতার পালাবদল রাজনীতির দৃশ্যপট বদলায়; কিন্তু রাষ্ট্রের স্বার্থের নদী অনেক গভীরে প্রবাহিত হয়। সরকার বদলায়, মিত্রতার ভাষা বদলায়, কূটনৈতিক অগ্রাধিকার বদলায়- কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প, অর্থনৈতিক দায়, নিরাপত্তা-স্বার্থ ও ভূরাজনৈতিক অবস্থান এক দিনে মুছে যায় না।
এই কারণেই ব্রিকসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পাঠ বাংলাদেশের জন্য হয়তো কোনো ঘোষণার দফায় নেই। পাঠটি হলো- ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী; রাষ্ট্রের স্বার্থ দীর্ঘস্থায়ী; আর ভূরাজনীতি সেই দীর্ঘস্থায়ী স্বার্থেরই হিসাব।
শেখ হাসিনার রাজনৈতিক অধ্যায়ের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা সময়ই নির্ধারণ করবে। কিন্তু তাঁর সময়ের ভূরাজনৈতিক উত্তরাধিকার যে এখনো বাংলাদেশের রাজনীতি ও কূটনীতির আলোচনায় সক্রিয়- ব্রিকস-পরবর্তী এই বিতর্ক সেটিই নতুন করে মনে করিয়ে দিয়েছে।
ক্ষমতা চলে যায়। সম্পর্কের রূপ বদলায়। কিন্তু রাষ্ট্রের স্বার্থ তার নিজের পথ খুঁজে নেয়। আর সেই পথের বাঁকে কখনো কখনো পুরনো নেতৃত্বের ছায়াও আবার দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
লেখক: ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
