চৌধুরী আবদুল হান্নান


দান করার পর দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত ওই সম্পত্তি ভোগ করতে পারবেন-এমন বিধান রেখে বিদ‍্যমান সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের সংশোধনী পাশ হয়েছে। বর্তমানে প্রচলিত আইনে দাতার জীবনকাল পর্যন্ত সম্পত্তি ভোগের অধিকার সংরক্ষণ করে দান করার বিধান নেই। প্রস্তাবিত জীবনকালীন ভোগ করার অধিকার সংরক্ষণ পূর্বক দান হবে সম্পত্তি হস্তান্তরের একটি ব‍্যতিক্রমী ও সমাজ হিতৈষী বিধান। ব‍্যতিক্রমী এই জন‍্য যে, এখানে দাতা তার সম্পত্তি পুত্র-কন‍্যা বা উত্তরাধীকারীকে দান করে দেওয়ার পরও দানগ্রহীতা এ সম্পত্তি দাতার জীবদ্দশায় বিক্রয় বা হস্তান্তর করার আইনি ক্ষমতা পাবেন না।এখানেই নিহীত রয়েছে প্রবীণ পিতা-মাতার শেষ বয়সের রক্ষা কবজ।

আমাদের প্রবীণেরা কেমন আছেন? সন্তানস্বতঃস্ফূর্তভাবে তাদের দায়িত্ব নিতে চায় না। পরিবারে প্রবীনরা অবহেলিত, এ বিশ্বাস এখন অনেকটাই প্রতিষ্ঠিত। কিছু সম্পত্তি বিক্রি করে বাবা-মা সারা জীবনের আকাঙ্খা পূরণে পবিত্র হজ পালন করতে গেলেন, যাওয়ার আগে অবশিষ্ট সম্পত্তি সন্তানদের নামে লিখে দিলেন, যদি তাদের কিছু হয়ে যায়। বাবা-মার বিশ্বাস- শেষ বয়সে ছেলেরা তো আছেই। সন্তাদের ওপর এ বিশ্বাস দ্রুতই ফিকে হয়ে যায়।

ছেলেদের আলাদা সংসার হয়, বাবা-মা ভাগ হয়ে যায়— এক ছেলের ঘরে মা, অন‍্য ছেলের ঘরে বাবা। তাদের মনোকষ্ট বাড়ে। জীবনের বেলা শেষে তারা এক সাথে হাঁটতে চেয়েছিলেন, এক অন্নে থাকতে চেয়েছিলেন। প্রতিবেশীরা “মিমাংসা” করে দেয়— বাবা-মা কখনও ভাগ হয় না।

সিদ্ধান্ত হয়-বাবা-মা এক সাথেই খাবে। বয়স্করা ক্ষুধা সহ‍্য করতে পারে না, তাই যে ছেলের ঘরে আগে রান্না হবে, সে ঘরেই বাবা-মাকে একসঙ্গে খেতে ডাকবে। কিন্ত দেখা দিলো নতুন বিপত্তি— দুই বৌমাই চতুর, কেউ আগে রান্না ঘরে ঢুকে না।

এমন চিত্র প্রতীকী নয়, বাস্তব। বাবা-মাকে নিয়ে এমন ঠেলাঠেলির ঘটনা সমাজে ব‍্যাপক বেড়েছে।অবহেলা করা, ভরণ-পোষণ না দেওয়া, এমনকি নিজের বাড়ি থেকে বৃদ্ধ পিতা-মাতাকে বের করে দেওয়ার মতো মর্মান্তিক ঘটনাও বিরল নয়।

অমিতাভ বচ্চন ও হেমামালিনী অভিনিত ভারতীয় হিন্দি সিনেমা “Baghban” এর কাহিনী এখানে প্রসঙ্গিক, সেখানে দেখা গেছে বাবা-মার সম্পত্তির প্রতি সন্তানদের যতটা নজর, বাবা-মার প্রতি ততটাই অবজ্ঞা আর অসম্মান।

প্রবীণদের নীরব কান্না কেউ দেখে না। তবে বাবা-মার নামে যথেষ্ট সহায় সম্বল থাকলে তাদের কদর কমে না। প্রবীণদের অযত্ন অবহেলার এমন নির্মম সামাজিক ব‍্যাধি নিরসনে এবং তাদের সুরক্ষায় সরকারের সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের সংশোধনী এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এমন সুরক্ষা আইন আগে ছিল না।

সমাজে বহুদিন ধরে চলে আসা একটি গুরুতর মানবিক সমস‍্যার আইনি সমাধান করা হচ্ছে। এখন সন্তানরা আর বাবা-মার কাছ থেকে সম্পত্তি লিখে নিয়ে পরে রাস্তায় নামিয়ে দিতে পারবে না। এই পরিস্থিতি থেকে তাদের সুরক্ষা দিতেই আইনটি করা হয়েছে। আইন প্রণেতারা সমাজের এই নির্মম বাস্তবতাকে উপেক্ষা করতে পারেন না।

অন‍্যদিকে মানবিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত্তে সরকারের নেওয়া এ উদ‍্যোগের তীব্র প্রতিবাদ করেছে সংসদে বিরোধী দল, সংসদ কক্ষ ত‍্যাগের মতো ঘটনাও ঘটেছে। দেশের শীর্ষ মুফতি ও আলেমদের ফতোয়া ও বিবৃতির প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। আইনটি কোরআন সুন্নাহ বিরোধী উল্লেখ করে জামায়াতের অনেকেই বক্তব‍্য দিয়েছেন।

হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের এক শীর্ষ নেতা আরও হাস‍্যকর মন্তব‍্য করেছেন, তিনি বলেন— এ আইনের ফলে মা-বাবার সম্পদের ওপর ইতিমধ‍্যে মালিকানা পাওয়া সন্তানরা তাদের মা-বাবার দীর্ঘায়ুর জন‍্য দোয়া না করে মনে মনে মৃত‍্যু কামনা করবে।

বিষয়টি আবেগ বা ধর্মীয় অন্ধবিশ্বাস দিয়ে নয়, আইনটির প্রকৃত বিধান এবং আমাদের সামাজিক বাস্তবতার আলোকে দেখতে হবে। আইনটি কোরআন সুন্নাহ বিরোধী উল্লেখ করে অহেতুক বিতর্ক সৃষ্টি করা সমীচীন নয়।

জাতীয় সংসদে বিরোধীদলের কাজ কেবল সরকারের বিরোধীতা করা নয়, নাগরিকদের প্রত‍্যাশা তাদের গঠনমূলক অংশ গ্রহণ করতে হবে। মানব কল‍্যানমূলক কোনো উদ‍্যোগ বা বিধান ধর্মের মূলবাণীর সাথে সাংঘর্ষিক হতে পারে না।

ইসলাম ধর্মের মূলে আছে উদারতা, সমতা ও ন‍্যায়বিচার; তবে তার আক্ষরিক অনুসরণ নয় বরং ধর্মের অন্তর্নিহিত ন‍্যায়বোধ উপলব্ধি করতে হবে। এই আইনটি সব ধর্মের নাগরিকের ক্ষেত্রেই সমভাবে প্রযোজ‍্য, তবে অন‍্য কোনো ধর্মাবলম্বীদের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে বিতর্ক, সমালোচনা উঠেনি।

সামগ্রীক এ সাহসী উদ‍্যোগের জন‍্য সরকারকে ধন‍্যবাদ জানাই এবং যারা কল‍্যানমূলক যে কোনো কাজে ধর্মের দোহাই দিয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছেন, তাদের বলি— আমরা ধর্মকে সব সময় উপরে রাখবো, অকারণে ধর্মকে টেনে আনবো না।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত ডিজিএম, সোনালী ব‍্যাংক।