আ. লীগ নেতার সমিতির টাকা ফেরত পেতে পানের বরজে কাজ বন্ধ করানোর অভিযোগ বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে
রঘুনাথ খাঁ, সাতক্ষীরা : রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে পাওনাদারদের উৎসাহিত করে এক আওয়ামী লীগ নেতার মায়ের পানের বরজে কর্মরত শ্রমিকদের বিতাড়িত করে যাতায়াতের রাস্তায় কাঁটা বেঁধে পরিচর্যা ও পান সংগ্রহ বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বিএনপি নেতা ও জালালপুর ইউপি চেয়ারম্যান এম.মফিদুল হক লিটুর বিরুদ্ধে। গত ২৬ আগস্ট সাতক্ষীরার তালা উপজেলার জালালপুর গ্রামে এ ঘটনা ঘটানোর পর নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন ওই পরিবারের সদস্যরা।
তালা উপজেলার জালালপুর গ্রামের প্রয়াত সন্তোষ দাসের স্ত্রী অনিমা দাস জানান, স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকে তিনি বাড়ির পাশে নিজ নামে থাকা চার বিঘা, ছোট ছেলে অভিজিৎ দাস ও বড় ছেলে ইন্দ্রজিৎ দাসের এক বিঘা করে মোট ছয় বিঘা জমিতে পান চাষ করে আসছেন। তার বড় ছেলে জেলা পরিষদের সদস্য ছাড়াও সমবায় সমিতির নিবন্ধনভুক্ত স্থানীয় একটি সমিতি পরিচালনা করে আসছিলো। রয়েছে তার ইটের ভাটাও। আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিল সে। ছোট ছেলে পেশাগত কারণে ঢাকায় অবস্থান করে। ২০২৪ সালের ৫ আগষ্ট শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করার পর একটি মহল তার বড় ছেলেকে বিপদে ফেলতে সমিতির ঋণ গ্রহীতাদের কিস্তি পরিশোধ বন্ধ করে দিতে উৎসাহিত করে।
অপরদিকে সঞ্চয়কারিদের টাকা তুলে নেওয়ার জন্য সমিতির সভাপতি হিসেবে ইন্দ্রজিৎকে চাপ সৃষ্টি করতে উৎসাহিত করে। এমন এক পরিস্থিতিতে সমিতির ঋণ গ্রহীতারা কিস্তি দেওয়া বন্ধ করে দেয়। সঞ্চয়কারিরা পাওনা টাকার দাবিতে সমবায় অফিসে দেন দরবার করার একপর্যায়ে অফিস বন্ধ করে দেন ম্যানেজার। একপর্যায়ে শালিখা ও পাখিমারা বিলের কিছু জমি বিক্রি করে বেশ কিছু সঞ্চয়কারিদের ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ টাকা তুলে দেয় ইন্দ্রজিৎ। এরপরও বর্তমান প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক হয়রানির হাত থেকে বাঁচতে বড় ছেলে এলাকা ছাড়া। তাকে না পেয়ে সমিতির সঞ্চয়কারিদের হাতে তাকেও অপমানিত হতে হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান এম মফিদুল হক লিটুর কাছে যান তিনি ও তার পুত্রবধূ। টাকা পরিশোধের জন্য চেয়েছিলেন একটু দীর্ঘ সময়। তাতে কোন কাজ হয়নি।
অনিমা রাণী দাস আরো বলেন, গত ২৬ আগষ্ট সকালে তার ছয় বিঘা পানের বরজে কাজ করছিলেন জালালপুর গ্রামের আনন্দ দাস, হরেকৃষ্ণ দাস, বিশ্বনাথ হালদার, ধুলণ্ডা গ্রামের আনার আলী, আবুল হোসেনসহ ১২জন শ্রমিক। এ সময় জালালপুর গ্রামের আনছার কারিকরের ছেলে মহিউদ্দিন ও শাহাবুদ্দিন কারিকর, কালিপদ ঘোষের ছেলে হরিপদ ঘোষ ওরফে বাবু, রণজিৎ হালদারের স্ত্রী শিলু হালদার, নেহালপুর গ্রামের আনার গাজীর ছেলে মহসিন গাজী, জেঠুয়া গ্রামের মোসাব্বর গাজী, তার ছেলে আসাদুল গাজী, মাসুম গাজী, মনিরুল গাজীর স্ত্রী রোকেয়া বেগম ও শ্রীমন্তকাটি গ্রামের রণজিৎ কর্মকারের ছেলে দুলাল কর্মকারসহ ২০/২৫ জন তার পানের বরজে ঢুকে কর্মরত শ্রমিকদের হুমকি দিয়ে কাজ বন্ধ করে দিয়ে বরজ থেকে বের করে দেয়। একইসাথে তারা বরজে ঢোকার কয়েকটি পথে কাঁটার পালা দিয়ে যায়। চলে যাওয়ার আগে বরজে ঢুকে কাজ করলে বা পান ভাঙলে ভাল হবে না বলে তাকে সতর্ক করে যায়। এরপর থেকে কোন পরিচর্যার কাজ করাতে না পারায় বরজটি ধ্বংসের দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছে। পান বিক্রি করতে না পেরে গত এক মাসে চার লক্ষাধিক টাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এমনকি গত এক মাসে বরজের একাংশ ভাংচুর করে পান লুট করা হয়েছে। জীবন বাঁচাতে প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করতে পারেননি তিনি। পানের বরজ নষ্ট ও লুটপাট হলে তিনি ৫০ লক্ষাধিক টাকার ক্ষতিগ্রস্ত হবেন বলে দাবি করেন।
ধুলন্ডা গ্রামের আনার আলী ও আবুল হোসেন জানান, অনিমা রানী দাসের পানের বরজে তারাসহ ১২/১৪ জন সারা বছর কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছিলেন। গত ২৬ আগষ্ট আসাদুল, হরিপদ ঘোষ, মহসিন, চা ব্যবসায়ি দুলাল কর্মকার, মহিউদ্দিন, মাসুমসহ ২০/২৫ জন তাদেরকে বরজ থেকে বের করে দিয়ে আর কখনো কাজ করতে না আসার জন্য সতর্ক করে দেন। বর্তমানে কাজ হারিয়ে তারা বেকার হয়ে পড়েছেন।
গতকাল সোমবার সকালে জেঠুয়া বাজারে গেলে নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক জালালপুর গ্রামের আলেক গাজী, জেঠুয়া গ্রামের জহুরুল ইসলামসহ কয়েকজন জানান, ইন্দ্রজিৎ দাস ছিলেন উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যকরী কমিটির সদস্য। অপরদিকে জালালপুর ইউপি সদস্য এম মফিদুল হক লিটু ছিলেন সাবেক থানা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। সে হিসেবে মফিদুল হক লিটুকে ইন্দ্রজিৎ দাসের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বলা হয়। এরই জের ধরে ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পালাবদলকে ঘিরে ইন্দ্রজিৎ দাসকে কোনঠাসা করতে শুরু হয় নতুন মেরুকরণ। তারই অংশ হিসেবে জেঠুয়া বাজারে ইন্দ্রজিৎ দাসের অফিস ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ঢোকার পথ গত এক মাস আগে টাকা না পাওয়া সমিতির সঞ্চয়কারিদের উৎসাহিত করে কাটা দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়। ভাড়া নেওয়া ফলের দোকানদার হাতে পায়ে ধরে কয়েকদিন তার পণ্য বিক্রি করে নেন। ৮০ হাজার টাকার উর্দ্ধে চেয়ারম্যানের বিচার করার এক্তিয়ার না থাকায় ছেলেকে জব্দ করতে কৌশলে একই দিনে একইভাবে মা অনিমা রানী দাসের পরিচালনাধীন পানের বরজে কাজ ও পান তোলা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এ ছাড়াও ইন্দ্রজিৎ দাস যাতে আগামি ইউপি নির্বাচনে দাঁড়াতে না পারে সেজন্য বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের এক নেতা কাম জনপ্রতিনিধি তাকে গ্রেপ্তার করাতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। এমতাবস্থায় অনিমা রানী দাস ও তার পরিবারের সদস্যরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
আলেক গাজী ও জহুরুল ইসলাম আরো বলেন, হাজরাখালির সাংবাদিক ও ঠিকাদার তপন চক্রবর্তী সূযোগ বুঝে ভাটা থেকে ইট নিয়ে প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকা প্রতারণা করেছে। সমবায় সমিতির ম্যানেজার আব্দুস সামাদ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এ সব ঘটনায় ইন্দ্রজিৎ দাস আদালতে মামলা করেছেন। এমনকি আগামি ইউপি নির্বাচনকে সামনে রেখে সঞ্চয়কারিদের লেলিয়ে দেওয়া হয়েছে ইন্দ্রজিৎ দাসের বিরুদ্ধে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে জালালপুর গ্রামের হরিপদ ঘোষ বাবু মঙ্গলবার সকালে এ প্রতিবেদককে বলেন, মুনাফা ও সমিতিতে জমা রাখা মূল টাকার একটি অংশ ফেরৎ না পাওয়ায় তিনিসহ কয়েকজন ইন্দ্রজিৎ দাসের বিরুদ্ধে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের কাছে অভিযোগ করেন। চেয়ারম্যানের ডাকে সাড়া দিয়ে অনিমা দাস ও তার পুত্রবধু ঋণ পরিশোধে ভূমিকা রাখেননি। বাধ্য হয়ে চেয়ারম্যানের নির্দেশ মত থানা পুলিশ না করে তিনিসহ কয়েকজন যেয়ে পানের বরজের কাজ বন্ধ করে দিয়েছেন। একজনের ঋণ পরিশোধে মা ও ভাইএর পানের বরজ বন্ধ করে দেওয়া আইন বিরোধী কিনা এক প্রশ্নের জবাবে হরিপদ ঘোষ বলেন, ভাল মন্দ চেয়ারম্যান সাহেব দেখবেন। তার(হরিপদ) সঙ্গে কথা বলে লাভ হবে না উল্লেখ করে তিনি সমস্যা সমাধানে চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।
এ ব্যাপারে জালালপুর গ্রামের মহিউদ্দিন কারিকর সঙ্গে ফোনে কথা বলার একপর্যায়ে তিনি সাংবাদিক পরিচয় শুনে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
তবে আলম সাধু চালক আসাদুল বলেন, সমিতির সঞ্চয়কারি হিসেবে তিনি দুই লাখের বেশি টাকা পাবেন সমিতির কাছে। প্রতি লাখে তিনিসহ অন্যান্যরা প্রতি মাসে এক হাজার ৫০ টাকা সুদ পেতেন। ৭/৮ মাস আগে থেকে তারা কয়েকজন টাকা পাচ্ছেন না। সরকার পরিবর্তণের পর জমির বিক্রি করে কয়েকজন সঞ্চয়কারির বড় অংশের টাকাও পরিশোধ করেছেন সমিতির সভাপতি ইন্দ্রজিৎ দাস। টাকা না পেয়ে তারা চেয়ারম্যানের শরনাপন্ন হন এক বছর আগে। চেয়ারম্যানের কাছের লোক মামুনের মাধ্যমে সময় নিয়েও ইন্দ্রজিৎ দাস কথা না রাখায় তারই কথা মত পানের বরজে ঢোকার মুখের পথ কাটা দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তাকেসহ কয়েকজনকে কিছু টাকা পরিশোধ করলে সমিতির কিস্তির টাকা তুলতে সাহায্য করা হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, একমাত্র চেয়ারম্যানের মাধ্যমে সব সমস্যা সমাধান করা সম্ভব।
এ ব্যাপারে তালা উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এম মফিদুল হক লিটু মঙ্গলবার দুপুরে এ প্রতিবেদককে বলেন, সমিতির কয়েকজন সঞ্চয়কারি তার কাছে কিছুদিন আগে ইন্দ্রজিৎ দাসের কাছে পাওনা টাকার ব্যাপারে তার কাছে মৌখিক অভিযোগ করেন। সে অনুযায়ি ইন্দ্রজিৎ দাসের মা অনিমা রাণী দাস ও তার স্ত্রীকে ডাকা হয়। তারা সময় নিয়েও টাকা পরিশোধ করেননি।
বিষয়টি পরিষদের এক্তিয়ার বহির্ভুত হওয়া স্বত্বেও তিনি কেন পাওনাদারদের অনিমা দাসের পনের বরজে কাঁটা দিয়ে কাজ বন্ধ করে দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে আইন হাতে তুলে নেওয়ার সূযোগ করে দিলেন, এমন প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে যেয়ে তিনি বলেন, বরজে কাটা দেওয়ার ব্যাপারে তিনি কিছুই জানেন না। সামনে নির্বাচন তাই ঝামেলায় জড়াতে চান না। যারা কাঁটা দিয়েছে তাদেরকেই জিজ্ঞাসা করতে বলেন।
তালা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ আবু বক্কর ছিদ্দিক মঙ্গলবার দুপুরে এ প্রতিবেদককে মুটোফোনে জানান, বিষয়টি তার জানা নেই। লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
(আরকে/এসপি/সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২৬)
