বাগেরহাট প্রতিনিধি : সুন্দরবনে তিনটি বনদস্যুদের হাতে অপহৃত ২১ জেলেকে পাঁচ দিনেও উদ্ধার করতে পারেনি কোস্টগার্ডসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনীর সদস্যরা। মুক্তিপণের দাবিতে অপহৃত এসব জেলেরা সুন্দরবনের গহীনে কোথায়, কি অবস্থায় আছেন তাও নিশ্চিত করে জানা সম্ভব হয়নি। এই অবস্থায় আকাশে আধুনিক ড্রোন উড়িয়ে অপহৃত জেলে ও বনদস্যুদের অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা চালচ্ছে কোস্টগার্ড। তবে, সন্ধান মিলছেনা।  ঘটনার পর থেকে আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন সুন্দরবনসহ উপকূলে মাছ ধরা সাধারণ জেলেরা। উৎকণ্ঠায় রয়েছেন অপহৃতদের পরিবারের সদস্য ও মহাজনরা।  

মোংলা কোস্টগার্ড পশ্চিম জোন জানান, মুক্তিপণের দাবিতে তিনটি বনদস্যু বাহিনীর হাতে অপহৃত ২১ জেলেকে উদ্ধারে ইতিমধ্যেই অভিযান শুরু হয়েছে। সুন্দরবনের আকাশে আধুনিক ড্রোন উড়িয়ে অপহৃত এসব জেলে ও বনদ্যুদের অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা চলছে। গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক বাড়ানোর পাশিাপাশি নৌপথেও চিরুনি অভিযান পরিচালনা করছে কোস্টগার্ডের একাধিক দল। পাশাপাশি মৎস্য আহরণে নিয়োজিত জেলেদের নিরাপত্তায় টহল জোরদারের কথা জানিয়েছে নৌপুলিশ ও সুন্দরবন বিভাগও।

গত শুক্র ও শনিবার (২৫ ও ২৬ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাতে বাগেরহাটের পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জের নারকেলবাড়িয়া, আমরাড়িয়া, ভদ্রা এবং ভাঙ্গা এলাকা থেকে বনদস্যু মজনু, করিম শরীফ ও বড় জাহাঙ্গীর বাহিনীর সদ্যসরা অস্ত্রেও মুখে মাছ ধরা অবস্থায় ২১ জেলেকে অপহরণ করে গহীন অরণ্যে নিয়ে যায়। এসময় জেলেদের একটি ট্রলার, পাঁচটি মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন মালামালও লুটে নেয় বনদস্যুরা।

সুন্দরবনে দুটি দিনে মুক্তিপণের দাবিতে অপহৃত এসব জেলেদের পরিবারের কোনো সদস্য বা তাদের মহাজনরা বনদস্যুদের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না। কোনো ভাবে তা প্রকাশ পেলে সুন্দবনসহ উপকূলে মাছ ধরাসহ তাদের জীবনের জন্য বড় ধরণের হুমকি আসতে পারে, এমন শঙ্কায় তারা মিডিয়ায় কথা বলতে নারাজ। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে অপহৃত জেলেদের একাধিক মহাজন জানান, তারা অপহৃত এসব জেলেদের মুক্ত করতে বনদস্যুদের সাথে মোবাইল ফোনে গোপনে যোগাযোগ করছেন। মুক্তিপণ হিসেবে বনদস্যুরা কি পরিমান টাকা দাবি করা হয়েছে নিরাপত্তাজনিত কারণে তাও বলতে রাজি হননি তারা। এখন বনদ্যুদের সাথে মুক্তিপণ নিয়ে দর কষাকষি চলছে।

কাঙ্খিত মুক্তিপণ পেলেই অপহৃত এসব জেলেদের ছেড়ে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে বনদস্যুরা। দ্রুত মুক্তিপণের টাকা পরিশোধের জন্য মহাজনদের চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে বনদ্যুদের পক্ষ থেকেও। এই অবস্থার মধ্যে দুই দিনে ২১ জেলেকে অপহরণের পর থেকে সুন্দরবনসহ উপকূলে মাছ ধরা সাধারণ জেলেরাও নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েছেন। বনদস্যু আতঙ্কে অনেকই সুন্দরবনে যেতে মাছ ধরতে ভয় পাচ্ছেন। এসব জেলেরা সুন্দরবনকে সম্পূর্ণ দস্যুমুক্ত ও নিরাপদে মাছ ধরার নিশ্চয়তা চান তারা।

সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মো. শরিফুল ইসলাম জানন, বুববার বিকাল পর্যন্ত অপহৃত ২১ জেলের এখনো কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। কোস্টগার্ডসহ নৌপুলিশ উদ্ধার অভিযান চলছে। সুন্দরবনে অবস্থানরত জেলেদের রাতে দলবদ্ধ ভাবে এবং সংশ্লিষ্ট বন অফিসের সামনে থাকতে বলা হয়েছে। এছাড়া সকল সুন্দরবনের স্টেশন ও টহল ফাঁড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও বনরক্ষীদের জেলেদের নিরাপত্তায় টহল বৃদ্ধির নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

মোংলা কোস্টগার্ড পশ্চিম জোনের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমা-ার মাহাবুব হোসেন জানান, সরকারের নির্দেশনায় সুন্দরবনকে বনদস্যুমুক্ত করতে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছে কোস্টগার্ড। তারই আলোকে অপহৃত ২১ জেলে উদ্ধারে অভিযান চলমান রয়েছে। বনদস্যুদের অবস্থান শনাক্তে আধুনিক ড্রোন ব্যবহার করা হচ্ছে। একই সাথে গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক বাড়ানোর পাশিাপাশি নৌপথেও চিরুনি অভিযান চলছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে এসব জেলেদের উদ্ধার করা সম্ভব হবে বলে আশা করছি। সুন্দরবনের সকল বনদস্যু বাহিনীকে আত্মসমর্পণের আহবান জানানো হয়েছে। আত্মসমর্পণকারীদের স্বাভাবিক জীবনের নিশ্চয়তার পাশপাশি পূনর্বাসনেরও ব্যবস্থা করা হবে। অন্যথায় বনদস্যুদের কঠিন পরিনতি ভোগ করতে হবে বলেও জানান এই কোস্টগার্ড কর্মকর্তা।

(এস/এসপি/সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২৬)