রঘুনাথ খাঁ, সাতক্ষীরা : আগামী ১০ অক্টোবর মহালয়ার মধ্য দিয়ে দেবী ঘোড়ায় চড়ে দুর্গা স্বপরিবারে আসছেন মর্ত্যলোকে। এজন্য মণ্ডপে মণ্ডপে দেবীকে সাজাতে ব্যস্ত সময় পার করছেন শিল্পীরা। প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে আলোকসজ্জা নিয়ে ব্যস্ত ডেকরেটর মালিকরা।

এবার ৭০ বছরের চিরাচরিত মাটির প্রতিমা তৈরি না করে দর্শণার্থীদের মন ভরাতে সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার বড়দল ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী বুড়িয়া সার্বজনীন মণ্ডপে দুর্গা প্রতিমা তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছে ৩৫ হাজার মুক্তা। এক কথায় মুক্তায় সেজেছে দুর্গা।

প্রতিমার শরীরে মাটির প্রলেপ, তার ওপর রঙের নিখুঁত আঁচড়। এরপর একে একে বসানো হচ্ছে হাজার হাজার মুক্তা। আলো পড়তেই প্রতিমার শরীর জুড়ে ফুটে উঠছে ঝিকিমিকি আভা। পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হতে এখনও বাকি, অথচ ব্যতিক্রমী এই প্রতিমা দেখতে এরই মধ্যে ভিড় করছেন স্থানীয়রা। শারদীয় দুর্গোৎসবকে ঘিরে এমনই নান্দনিক আয়োজন চলছে বুড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে অবস্থিত মন্দিরটিতে।

মঙ্লবার সরেজমিনে যেয়ে দেখা গেছে, মুক্তা বসানোর কাজ শেষ হয়েছে। প্রতিমাকে আরো আকর্ষণীয় করতে রং তুলির শেষ টান বাকী। ১৩টি প্রতিমার সাজসজ্জায় ব্যবহার করা হয়েছে প্রায় ৩৫ হাজার মুক্তা। এজন্য ব্যয় হয়েছে সাড়ে চার লাখ টাকা। প্যান্ডেল তৈরিতে ব্যস্ত ডেকরেটর শ্রমিকরা।

আয়োজকদের মধ্যে বুড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক উত্তম মণ্ডল জানান, এবারের আয়োজনের মূল আকর্ষণই হচ্ছে মুক্তার কারুকার্য। প্রচলিত সাজসজ্জার বাইরে গিয়ে ভিন্ন নকশায় তৈরি করা হচ্ছে দেবদেবীর ১৩টি প্রতিমা। প্রতিমার শরীর, অলংকারসহ বিভিন্ন অংশে মুক্তার ব্যবহার করা হয়েছে। পূজা শুরুর আগেই দূর-দূরান্ত থেকে অনেকে মণ্ডপে এসে প্রতিমা তৈরির কাজ দেখছেন। এবারের পূজা সর্বধর্মের মিলন মেলায় পরিণত হবে।

দক্ষিণ বড়দল গ্রামের নির্মল মণ্ডলের ছেলে প্রতিমাশিল্পী প্রকাশ মণ্ডল গত ৫ জুলাই শুরু করেন এই প্রতিমা তৈরির কাজ। প্রায় আড়াই মাস ধরে চারজন শিল্পী ধাপে ধাপে কাঠামো তৈরি, মাটির কাজ, অবয়ব, রঙ, সাজসজ্জা ও মুক্তার কারুকার্য ফুটিয়ে তোলার কাজ করছেন।

প্রকাশ মণ্ডল বলেন, প্রতিবছরই নতুন কিছু করার চেষ্টা করি। এবার দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমায় দেখা কয়েকটি মূর্তির নকশা ও নিজের পরিকল্পনা মিলিয়ে প্রতিমার নকশা করেছি। মুক্তার কাজ খুব সূক্ষ্ম হওয়ায় সময় ও শ্রম দুটোই বেশি লেগেছে। চারজন শিল্পীর ৫২ দিন সময় লেগেছে। ১৩টি প্রতিমায় প্রায় ৩৫ হাজার মুক্তা ব্যবহার করা হয়েছে। বর্তমানে প্রায় ৯৭ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। আশা করছি, এক সপ্তাহের মধ্যেই বাকি কাজ শেষ হবে।

তিনি বলেন, দর্শনার্থীদের নতুন কিছু দেখানোর বিষয়টি মাথায় রেখেই এবারের প্রতিমার নকশা করা হয়েছে। শেষ মুহূর্তের সাজসজ্জা সম্পন্ন হলে প্রতিমার সৌন্দর্য আরও ফুটে উঠবে।

বৃদ্ধ কৃষ্ণপদ মণ্ডল বলেন, ৭০ বছর আগে ওয়াল্ড ভিশনের স্কুলেই স্থানীয় নারায়ন সরকার, কমলেশ সরকারসহ কয়েকজন মিলে দুর্গা পুজা শুরু করেন। জায়গার সঙ্কট মেটাতে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান সহযোগিতার হাত বাড়ান। কপোতাক্ষ নদের তীরে বুড়িয়া মন্দির মুক্তা দিয়ে তৈরি দুর্গা এবার দর্শনার্থীদের বিশেষ আকর্ষণ।

বুড়িয়া সার্বজনীন দুর্গা মন্দির পরিচালনা কমিটির সভাপতি অর্ধেন্দু মণ্ডল বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এই মন্দিরে শারদীয় দুর্গোৎসব হয়ে আসছে। প্রতিবারই ঐতিহ্য ধরে রেখে নতুন কিছু করার চেষ্টা করি। এবার মুক্তার কারুকার্যের মাধ্যমে প্রতিমায় ভিন্নতা আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দর্শনার্থীরা যেন মণ্ডপে এসে নতুনত্ব অনুভব করেন, সেটিই আমাদের মূল লক্ষ্য।

তিনি বলেন, দর্শনার্থীর সংখ্যা বাড়তে পারে বিবেচনায় শুরু থেকেই নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মণ্ডপে সিসি ক্যামেরার পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবকেরাও সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করবেন।

মন্দির পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক প্রবীর মণ্ডল বলেন, প্রতিমা তৈরির কাজ দেখতে পূজার আগেই অনেকে মণ্ডপে আসছেন। এবারের আয়োজন নিয়ে মানুষের আগ্রহে আমরা আনন্দিত। পূজার পাঁচ দিন যাতে সুশৃঙ্খল ও উৎসবমুখর পরিবেশে কাটে, সে জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

আয়োজকেরা জানান, ১৭ অক্টোবর শনিবার ষষ্ঠীর বোধনের মধ্য দিয়ে পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। ২১ অক্টোবর বুধবার বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের দুর্গোৎসব। অষ্টমীতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং নবমীতে ধর্মীয় যাত্রাপালার আয়োজন থাকবে।

বড়দল ইউনিয়নে বিজয়া দশমীর দিন থাকছে আরও একটি বিশেষ আয়োজন। বিভিন্ন মণ্ডপের প্রতিমা একত্র করে ঐতিহ্যবাহী বুড়িয়া আড়ং মেলার মাধ্যমে বিসর্জন দেওয়া হবে।

আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, বড়দল বাজার, মধ্যম বড়দল, দক্ষিণ বড়দল, বিষ্ণুপুর, ফাকরাবাদ পূর্বপাড়া, কইসিটি ও বুড়িয়াসহ আশপাশের প্রায় ১০টি মণ্ডপের প্রতিমা এ আয়োজনে অংশ নেবে।

স্থানীয় বাসিন্দা লিটন মণ্ডল বলেন, বুড়িয়া আড়ংকে ঘিরে প্রতি বছরই মানুষের মধ্যে আলাদা উৎসাহ থাকে। এবার মুক্তার কারুকাজের প্রতিমা সেই আকর্ষণ আরও বাড়িয়েছে। পূজার পাশাপাশি দশমীর আয়োজনও দেখতে অনেক মানুষ আসবেন বলে আশা করছি।

উৎসবকে কেন্দ্র করে মণ্ডপের নিরাপত্তায় সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় একটি দল প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পূজার সময় প্রশাসনের পক্ষ থেকেও প্রয়োজনীয় নিরাপত্তার ব্যবস্থা থাকবে।

স্থানীয় বাসিন্দা এস এম শরিফুল ইসলাম বলেন, বড়দল ইউনিয়নে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ পাশাপাশি বসবাস করছেন। মসজিদ, মন্দির, ইসকন মন্দির ও গির্জা—সবই এখানে সহাবস্থানের সুন্দর চিত্র তুলে ধরে। একে অপরের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে সহযোগিতা করার যে সংস্কৃতি রয়েছে, দুর্গোৎসবেও তার প্রতিফলন দেখা যাবে।

আশাশুনী থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহেদুর রহমান জানান, পূজা চলাকালিন ও প্রতিমা বিসর্জন শেষে যে কোন পরিস্থিতি মোকাবেলায় পুলিশ সতর্ক নজর রাখবে।

(আরকে/এসপি/অক্টোবর ০৭, ২০২৬)