নুরুন্নবী চেয়ারম্যান মার্কেটে উচ্ছেদ ঘিরে মুখোমুখি মালিকপক্ষ-সিডিএ
জে.জাহেদ, চট্টগ্রাম : চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার পুরাতন ব্রিজঘাট এলাকায় দখল উচ্ছেদে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) একাধিক অভিযান হয়েছে। উচ্ছেদ হয়েছে ব্রিজঘাট কাঁচাবাজারসহ সড়কের পাশে গড়ে ওঠা বহু স্থাপনা। কিন্তু এসব অভিযানের ধারাবাহিকতায় এবার নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে মইজ্জারটেক মোড়ে অবস্থিত নুরুন্নবী চেয়ারম্যান মার্কেটের ৩.৫০ শতক জমি নিয়ে। সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন—এতদিনের উচ্ছেদ অভিযানে যে জমিকে সিডিএ নিজেদের বলে দাবি করেনি, এখন সেটি হঠাৎ সিডিএর সম্পত্তি হিসেবে চিহ্নিত হলো কীভাবে?
বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের মে মাসে ব্রিজঘাট কাঁচাবাজার ও আশপাশের বিপুলসংখ্যক স্থাপনায় উচ্ছেদ অভিযান চালায় সিডিএ। একই মাসে ব্রিজঘাট বাজার থেকে মইজ্জারটেক পর্যন্ত আবারও অভিযান চালানো হয়। পরবর্তী সময়ে ২০২৩ সালের আগস্টেও পুরাতন ব্রিজঘাটের কয়লার মাঠ ও সড়কের পাশের স্থাপনায় অভিযান চলে।
২০২৪ সালেও পুরাতন ব্রিজঘাট থেকে মইজ্জারটেক পর্যন্ত এলাকায় ফের উচ্ছেদ অভিযান হয়। এরপর ২০২৫ সালের মে মাসে ব্রিজঘাট, সৈন্যরটেক, খুদ্যেরটেক, আজিমপাড়া ও মইজ্জারটেক এলাকায় বড় পরিসরে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে সিডিএ।
জানা গেছে, গত কয়েক বছরে একই করিডোরে একাধিকবার উচ্ছেদ অভিযান চালিয়েছে সিডিএ। কিন্তু এসব অভিযানের কোনো পর্যায়ে মইজ্জারটেক মোড়ে অবস্থিত নুরুন্নবী চেয়ারম্যান মার্কেটের ৩.৫০ শতক জমি সিডিএর বলে দাবি করা হয়েছিল—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। সাম্প্রতিক সময়ে এ জমির সীমানা নিয়ে নতুন করে আপত্তি ওঠায় তৈরি হয়েছে জটিলতা।
২০২৩ সালের ২০ এপ্রিল ব্রিজঘাট বাজারের জমি নিয়ে সিডিএ ও জেলা প্রশাসনের ভিন্ন বক্তব্য সামনে আসে। সিডিএ দাবি করেছিল, বাজারের জায়গাটি তাদের অধিগ্রহণকৃত জমি এবং ভবিষ্যতে রাস্তা সম্প্রসারণের জন্য সংরক্ষিত। বিপরীতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, জমিটি রি-জুম করে খাস করা হয়েছে এবং নিয়ম মেনে বাজার ইজারা দেওয়া হয়েছে। এর কয়েক সপ্তাহ পরই ব্রিজঘাট কাঁচাবাজারে বড় ধরনের উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়।
অপরদিকে, গত ৭ অক্টোবর সিডিএ চেয়ারম্যানের কাছে দেওয়া লিখিত আবেদনে নুরুন্নবী চেয়ারম্যান এর বড় সন্তান মো. মিরাজুন্নবী দাবি করেন, কর্ণফুলীর চরপাথরঘাটা মৌজার বি.এস ৭৬৫ নম্বর নামজারি খতিয়ানের বি.এস ১৪২৫ দাগের অংশে ৩.৫০ শতক জমিতে তাঁদের মার্কেটের তিনতলা ভবন রয়েছে।
আবেদনে বলা হয়, বি.এস ১৪২৫ দাগের মোট ৬ শতক জমি তৃতীয় কর্ণফুলী সেতু নির্মাণ প্রকল্পে এল.এ মামলা নম্বর ১৫/৩০৫-২০০৬ মূলে অধিগ্রহণ করা হয়। আবেদনকারীর দাবি, অধিগ্রহণের পর ৩.৫০ শতক জমি অবশিষ্ট থাকে এবং ওই অংশের ভবনে তারা দীর্ঘদিন ধরে ভোগদখলে রয়েছেন।
আবেদনকারীর আরও দাবি করেন, ২০০৮ সালে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পত্রের মাধ্যমে অধিগ্রহণকৃত অংশ বাদ দিয়ে অবশিষ্ট ৩.৫০ শতক জমির সীমানা নির্ধারণ ও চিহ্নিত করা হয়েছিল। এ-সংক্রান্ত নথি, দলিল, নামজারি খতিয়ান ও ভবন নির্মাণের অনুমোদনের কপিও আবেদনের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছে।
অন্যদিকে ব্রিজঘাট থেকে ডিসি রোড পর্যন্ত সংযোগ সড়ক নির্মাণ প্রকল্প সম্পর্কে সিডিএর নথিতে বলা হয়েছে, এল.এ মামলা নং-১২/৬৭-৬৮ এবং ১৫৪/৬৭-৬৮ মূলে চরপাথরঘাটা মৌজার আর.এস ৩৩৫ ও ৩৫৩ দাগের অন্তর্গত বি.এস ৩ নম্বর খতিয়ানভুক্ত বি.এস দাগ নং-৬৬ ও ৮৪ চউক কর্তৃক অধিগ্রহণ করা হয়।
নথিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, অধিগৃহীত জমিতে রাস্তা নির্মাণ করে অবশিষ্ট জমি ভবিষ্যতে রাস্তা সম্প্রসারণের জন্য সংরক্ষণ করা হচ্ছে। এল.এ মামলা ও বি.এস খতিয়ান অনুযায়ী ওই জমি চউকের দখলীয় ও মালিকানাধীন। তবে সিডিএর এ দাবির সঙ্গে নুরুন্নবী চেয়ারম্যান মার্কেটের ৩.৫০ শতক জমির সুনির্দিষ্ট অবস্থান ও সীমানার সম্পর্ক কী—সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
বড় ও স্থায়ী স্থাপনা উচ্ছেদের ক্ষেত্রে জমির মালিকানা, অধিগ্রহণের নথি, দাগ-খতিয়ান এবং সীমানা সুনির্দিষ্টভাবে যাচাই করা জরুরি। বিশেষ করে কোনো ব্যক্তি যদি দলিল, খতিয়ান ও পূর্বের সীমানা নির্ধারণের নথির ভিত্তিতে মালিকানা দাবি করেন, তাহলে সীমানা নিয়ে বিরোধ থাকা অবস্থায় স্থাপনা ভেঙে ফেললে তা নিয়ে আইনগত প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
তবে কোনো নির্দিষ্ট উচ্ছেদ আইনসম্মত না বেআইনি—এমন সিদ্ধান্ত দিতে হলে সংশ্লিষ্ট নোটিশ, আদেশ, অধিগ্রহণ নথি ও জমির প্রকৃত সীমানা সরেজমিন যাচাই করা প্রয়োজন। এ কারণেই আবেদনকারীর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, আগে সীমানা নির্ধারণ করা হোক, তারপর প্রয়োজন হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
বিষয়টি নিয়ে সিডিএর প্রকল্প কর্মকর্তা (পিডি) মোহাম্মদ হাসান বলেন, “মইজ্জারটেক মোড় হতে ব্রিজঘাট বাজারে আসতেই মোড়ের মুখের দুপাশে দেড়শ ফুট জমি সিডিএর। তারপরেও কেউ যদি পরিমাপ করে দেখতে চায়, সার্ভেয়ার দিতে পারে। আমরা পুনরায় পরিমাপ করে ব্যক্তিমালিকাধীন জমিতে কখনো অভিযান করে গুঁড়িয়ে দেব না।”
তিনি বলেন, “আমরা নিশ্চিত হয়েই অভিযান করব। কাউকে ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য সিডিএ অভিযান করবে না।”
ফলে এখন আলোচনার কেন্দ্রে একটাই প্রশ্ন—বছরের পর বছর ব্রিজঘাট এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান চালানোর পর মইজ্জারটেকের নুরুন্নবী চেয়ারম্যান মার্কেটের জমি নিয়ে নতুন করে যে দাবি উঠেছে, তা কি পুরোনো অধিগ্রহণের নথিতে স্পষ্ট, নাকি সীমানা পুনঃপরিমাপেই বেরিয়ে আসবে প্রকৃত অবস্থান?
সংশ্লিষ্টদের মতে, এল.এ মামলা, বি.এস খতিয়ান, দাগ নম্বর এবং ২০০৮ সালের সীমানা নির্ধারণের নথি একসঙ্গে যাচাই করে সরেজমিনে পরিমাপ করা হলে এ বিরোধের সুরাহা হতে পারে। একই সঙ্গে উচ্ছেদের আগে সংশ্লিষ্ট পক্ষকে যথাযথ প্রক্রিয়ার মধ্যে রাখার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
এ ছাড়া কর্ণফুলী উপজেলার শিকলবাহা ও চরপাথরঘাটা ইউনিয়নের একাধিক স্থানীয় বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মইজ্জ্যারটেক মোড়ের মুখের ওই জমিতে যুগ যুগ ধরে মার্কেট নির্মাণ করে ভোগদখল করে আসছেন নুরুন্নবী চেয়ারম্যান।
স্থানীয়দের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে জায়গাটি নুরুন্নবী চেয়ারম্যানের সম্পত্তি হিসেবেই তারা জেনে আসছেন। তবে সুনির্দিষ্ট পরিমাপ ও সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র যাচাই-বাছাই না করে সেখানে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলে ভবিষ্যতে মালিকানা ও সীমানা নিয়ে আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
(জেজে/এসপি/অক্টোবর ০৮, ২০২৬)
