বাগেরহাট প্রতিনিধি : বাগেরহাটে মধ্যরাতে হাসপাতালে দায়িত্বরত এক নারী চিকিৎসককে হেনস্তা করার অভিযোগ উঠেছে। রবিবার দিনগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে ২৫০ শয্যা বাগেরহাট  জেলা হাসপাতালের জরুরি বিভাগে হাসপাতালের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. সাকিয়া হক হেনস্তা শিকার হন। মধ্যরাতে স্থানীয় সাবেক এক শ্রমিক দল নেতার লোকজনে রোগীকে ক্যানুলা পরানোকে  কেন্দ্র করে ওই নারী চিকিৎসকে তাঁর কক্ষে ঢুকে গালাগাল ও হেনস্তা করেন। ঘটনার পর নিরাপত্তাহীনতার কথা জানিয়ে রাতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট করেন ডায়ানা অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত ডা. সাকিয়া হক। সেখানে তিনি লিখেন, ‘বাগেরহাটে শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক শানু (নাকি হারুন জানিনা) এসে শুধু গায়ে হাত দেয়া বাকি রাখছে নাইট ডিউটিতে। আমি একা রুমে। ৮-১০ জন সাঙ্গোপাঙ্গ এসে মারমুখি, কারণ একটাই- আমাদের ওয়ার্ড বয় ক্যানুলা মিস করছে।’

হাসপাতালের রেজিস্টার অনুযায়ী, ওই রোগীর নাম শানু। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অসুস্থতা নিয়ে আসা ওই রোগী ছিলেন বাগেরহাট জেলা শ্রমিক দলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক আবু হানিফ হানু। ২০১৯ সালে বাগেরহাট জেলা শ্রমিকদলের সভাপতি সরদার লিয়াকত আলীর কমিটি বিলুপ্ত করে নতুন একটি কমিটি দেয় কেন্দ্রীয় শ্রমিকদল। সেই কমিটিতে আবু হানিফ হানু ছিলেন সাংগঠনিক সম্পাদক। ওই কমিটির স্থায়ীত্ব ছিল মাত্র পাঁচ দিন। সেই কমিটিতে আবু হানিফ হানু ছিলেন সাংগঠনিক সম্পাদক। এরপর থেকে জেলা শ্রমিকদলের নতুন করে কোন কমিটি দেয়নি কেন্দ্র। এখন কমিটি বিহীন রয়েছে জেলা শ্রমিকদল।

ডা. সাকিয়া হক বলেন, গতকাল রবিববার দুপুর আড়াইটা থেকে সোমবার সকাল সাড়ে ৮টা পর্যন্ত হাসপাতালের জরুরি বিভাগে আমার ডিউটি ছিল। ওই সময়ে ২৫০ শয্যার হাসপাতালটিতে আমিই একমাত্র চিকিৎসক ছিলাম। রাত প্রায় সাড়ে ১২টার দিকে বুকে ও পেটে ব্যাথা নিয়ে এক রোগী হাসপাতালের জরুরী বিভাগে আসেন। প্রথমে তাঁর ইসিজি (ইলেকট্রোকার্ডিওগ্রাম) করা হয়। পরীক্ষা ও রক্তচাপসহ অন্যান্য শারীরিক লক্ষণ পর্যবেক্ষণে তাৎক্ষণিকভাবে হৃদযন্ত্রের কোনো সমস্যা পাওয়া যায়নি। পরে গ্যাসের সমস্যার জন্য ইনজেকশন দেওয়ার পরামর্শ দেন। ইনজেকশন দেওয়ার জন্য রোগীর শরীরে ক্যানুলা পরাতে গিয়ে প্রথমবার ব্যর্থ হন সংশ্লিষ্ট ইন্টার্ন চিকিৎসক।

দ্বিতীয়বারও একজন ওয়ার্ড বয় চেষ্টা করেন। এতে রোগীর স্বজনরা মারমুখি হয়ে ওঠেন। দায়িত্বরতরা শিশু বিভাগের নার্সদের ডাকতে যান। কারণ তারা বেশ অভিজ্ঞ ক্যানুলা পরানোর বিষয়ে। তবে এরমাঝেই রোগীর সঙ্গে আসা ব্যক্তিরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। তাঁরা আমার কক্ষে ঢুকে গালাগাল শুরু করেন এবং বারবার মারতে তেড়ে আসেন। রোগীর সঙ্গে আসা লোকজন বেশি আক্রমণাত্মক ছিলেন। তাঁরা আমার কক্ষে ঢুকে গালাগাল করেন। বারবার তেড়ে আসেন। তাঁরা গায়ে হাত দেননি, তবে পরিস্থিতি এমন ছিল যে, তাঁরা গায়ে হাত দিতেন কি না, তা বলা কঠিন। চিৎকার-চেঁচামেচির শব্দ শুনে হাসপাতালের কর্মী ও অন্য রোগীর স্বজনেরা এগিয়ে আসেন। পরে হাসপাতালের কর্মীরা তাঁদের কক্ষ থেকে সরিয়ে দেন।

ঘটনার বর্ণনা দিয়ে রাত সোয়া ১টার দিকে ওই চিকিৎসক তাঁর ফেসবুকে একটি ভিডিও পোস্ট করেন। যেখানে তিনি ব্যক্তিটি কোন দলের উদ্দ্যেশে অভিযোগ নয় বলে ব্যাখ্যা করেছেন। একই সঙ্গে কাজের পরিবেশ ও পেশাগত নিরাপত্তা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন।

ডা. সাকিয়া আরও বলেন, রোগীকে ইনজেকশন দিয়ে ২০ মিনিট পর্যবেক্ষনে রাখতে বলা হয়েছিল। ক্যানুলা দেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক সময় মিস হতে পারে। সেখানে অনেক মানুষের ভিড়েরও বাড়তি চাপ তৈরি করে। রোগীর সঙ্গে আসাদের কথা ছিল, ডাক্তারকেই ক্যানুলা পরাতে হবে। বাস্তবতা হলো একজন চিকিৎসকের পক্ষে সব কিছু করা সম্ভাব না। তাছাড়া এখানে দায়িত্বে থাকা নার্স, ওয়ার্ড বয়রাও অনেক অভিজ্ঞ। কিন্তু যাই হোক তারা চিকিৎসকের কক্ষে ঢুকে গালাগাল ও মারতে তেড়ে আসতে পারেন না। বিষয়টি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন বর্লেও জানান।

বাগেরহাট জেলা শ্রমিকদলের সাবেক সভাপতি সরদার লিয়াকত আলী বলেন, তুচ্ছ ঘটনায় চিকিৎসকের সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনা সত্যিই দু:খজনক ব্যাপার। আমি এই ঘটনার নিন্দা জানাই।
হাসপাতালের তত্ত্ববাধায়ক ডা. অসীম কুমার সমদ্দার বলেন, এই ঘটনায় আমরা মর্মাহত। কোন হাসপাতালেই এই পরিবেশ মেনে নেওয়া যায় না। হাসপাতালে পাঁচশতর উপরে রোগী ভর্তি। কিন্তু কর্মী আছে পদের ৩ভাগের এক ভাগ। তাঁর মাঝেও সবাই সেবা দিতে চেষ্টা করছেন। এমন ঘটনা দু:খজনক। তবে দুপুর পর্যন্ত হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানায়নি। তত্ত্ববাধায়ক আগামী মিটিং-এ বিষয়টি জানানো হবে।

এদিকে এ বিষয়ে অভিযুক্ত ওই ব্যক্তি বা তাঁর স্বজনদের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।

বাগেরহাট সদর মডেল থানার ওসি মো. সামসুল আরেফিন বলেন, ‘এখনো কোন অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

(এস/এসপি/অক্টোবর ১২, ২০২৬)