রিয়াজুল রিয়াজ, বিশেষ প্রতিনিধি : গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচির আওতায় রুপা আক্তার নামের এক প্রসূতি মায়ের গর্ভবতী ভাতার আট কিস্তি গিয়েছে তার পাশের ওয়ার্ডের মেম্বার মো. নান্নু মোল্লার ব্যক্তিগত বিকাশ নম্বরে।

ফরিদপুর সদরের কৃষ্ণনগর ইউনিয়ন এমন ঘটনা ঘটেছে। তবে, অভিযুক্ত নান্নু মেম্বার এর দায় চাপিয়েছেন কৃষ্ণনগর ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার (UDC) - এর উদ্যোক্তা (Entrepreneur) ফারুকের ওপর।

এ বিষয়ে অভিযোগের সূত্র ধরে উত্তরাধিকার ৭১ নিউজের এক অনুসন্ধানে জানা যায়, ফরিদপুর সদরের কৃষ্ণনগর ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডের কাঁচারদিয়া গ্রামের শাহজাহান শেখ- এর মেয়ে ও আসলাম শেখ-এর স্ত্রী রুপা আক্তারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর গর্ভবতী ভাতার আবেদন মনজুর করেন ফরিদপুর জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর। আবেদনের সময় রুপা আক্তার তাঁর নিজস্ব মোবাইল ব্যাংকিং এর একাউন্ট প্রদান করলেও রুপার একাউন্টে গর্ভবতী ভাতার প্রথম আট কিস্তির পেমেন্ট আসেনি। এসেছে মাত্র শেষের তিন কিস্তি। বঞ্চিত আট কিস্তির সরকারি প্রেমেন্ট সফলভাবে ঢুকেছে একই ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ড মেম্বার মো. নান্নু মোল্লার ব্যবহৃত ব্যক্তিগত বিকাশ একাউন্টে।

এর আগে, রুপার সাথে আবেদন করা অনেকেই একই ভাতা তাদের মোবাইল ব্যাংকিং একাউন্টে নিয়মিত টাকা পেয়েছেন। এতেই সন্দেহ হয় প্রসূতি মা রুপা আক্তারের। দীর্ঘ আট কিস্তি পর হঠাৎ তাঁর একাউন্টে টাকা ঢুকলে সন্দেহ আরও বাড়ে। শেষের তিন কিস্তি ভাতা পাওয়ার পর তার আগের আট কিস্তির টাকা কেনো তিনি পাননি সেটার জানার চেষ্টা করেন ওই প্রসূতি মা রুপা আক্তার। পরে তাঁর স্বামী ও কয়েকজন স্বজনের সহযোগিতায় রুপা আক্তারকে দেওয়া সরকারি ভাতার পেমেন্ট ডিটেইলস তুলে দেখা যায় যে, আগের আট কিস্তি কৃষ্ণনগর ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ড মেম্বার ও ইউপি প্যানেল চেয়ারম্যান মো. নান্নু মোল্লার ব্যবহৃত ব্যক্তিগত বিকাশ নম্বরে ঢুকেছে। এ বিষয়ে নান্নু মেম্বারকে জিজ্ঞেসা করলে তিনি টাকা ফেরত দেওয়ার কথা বলে তাদের তাদের ব্যাপারটা চেপে যাওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করেন। এবং এ বিষয়ে কাউকে কিছু না জানানোর জন্য হুমকি ধামকি দিয়ে যাচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। নান্নু মেম্বার এলাকায় প্রভাবশালী হওয়ায় তার কথার বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই ওই পরিবারের। যেকোনো সময় হতে পারে এ বিষয়ে গোপন সমঝোতাও। রুপা আক্তারের থেকে ব্যাক ডেটে সই করে নিতে পারেন আবেদনও তেমন আশংকা প্রকাশ করেছেন অনেকেই।

এদিকে, জনগণের জন্য দেওয়া সরকারের কোনো ভাতা স্থানীয় সরকারের কোনো ইউপি মেম্বারের মোবাইল ব্যাংকিং একাউন্টে ঢোকার সুযোগ আছে কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে ফরিদপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মেশকাতুল জান্নাত রাবেয়া উত্তরাধিকার ৭১ নিউজকে জানান, 'জনগণের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি কোনো ভাতা তাঁর নিজস্ব একাউন্ট ছাড়া অন্য কারোর ব্যবহৃত একাউন্টে ঢোকার সুযোগ নাই। আপনার কথা সত্য হয়ে থাকলে এটা স্পট দূর্নীতি ও শাস্তি যোগ্য অপরাধ'।

ইউএনও কথার মিল পাওয়া যায় এ বিষয়ে সরকারি নিয়ম কানুনেও। বাংলাদেশ সরকারের বিধি মোতাবেক- গর্ভবতী ভাতা বা মাতৃত্বকালীন ভাতার (মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচি) ক্ষেত্রে অন্য কারো বা কোনো মেম্বারের বিকাশ নম্বর ব্যবহারের কোনো সুযোগ নেই। মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর ও সমাজসেবা অধিদপ্তরের নিয়ম অনুযায়ী:

১। নিজ নামে সিম ও অ্যাকাউন্ট: ভাতাভোগী গর্ভবতী মায়ের নিজের জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) দিয়ে নিবন্ধিত সিম এবং সেই সিমের মাধ্যমেই নিজস্ব বিকাশ, নগদ বা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থাকতে হবে।

২। ভাতা না ঢোকার ঝুঁকি: অন্য কারো (যেমন- মেম্বার, স্বামী বা অন্য আত্মীয়) বিকাশ নম্বর বা অন্য কারো নামে নিবন্ধিত সিম ব্যবহার করলে ভাতার টাকা অ্যাকাউন্টে ঢুকবে না এবং টাকা 'বাউন্স ব্যাক' বা ফেরত চলে যাবে।

৩। বর্তমান নিয়ম: সরকারি নিয়ম কঠোর করা হয়েছে, তাই আগের মতো অন্য কারো নম্বর দিয়ে ভাতা তোলার সুযোগ এখন আর নেই।

এ বিষয়ে ফরিদপুর জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক মোহাম্মদ এহিয়াতুজ্জামান উত্তরাধিকার ৭১ নিউজকে জানান, 'জনগণের জন্য বরাদ্দকৃত কোনো ভাতা ওই ভাতাভোগী ছাড়া কোনো মেম্বারের বিকাশ একাউন্টে ঢোকার বিন্দুমাত্র নিয়ম নেই। ঢুকে থাকতে তা হবে এ সম্পর্কিত সরকারি বিধিমালার লংঘন। বিষয়টি যেহেতু মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের আপনি তাদের সাথে এ ব্যাপারে কথা বলতে পারেন'।

এ বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘক্ষণ কথা হয় ফরিদপুর মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মাশউদা হোসেনের সাথে। তিনি এ বিষয়ে উত্তরাধিকার ৭১ নিউজকে জানান, 'ভাতাভোগী গর্ভবতী মায়ের নিজের জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) দিয়ে নিবন্ধিত সিম এবং সেই সিমের মাধ্যমেই নিজস্ব বিকাশ, নগদ বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টেই শুধুমাত্র আমাদের ভাতা যাবে। অন্য কারোর সিমের একাউন্টেেই এটি যাওয়ার সুযোগ নাই। কোনো মেম্বারের নম্বরে তো নয়ই। যদি ঢুকে থাকে তাহলে তা 'বাউন্স ব্যাক' করে ফেরত চলে আসবে। কিছুতেই পেমেন্ট সফল হবে না। অথচ রুপা আক্তারের গর্ভবতী ভাতার মোট আট কিস্তি নান্নু মেম্বারের ব্যবহৃত ব্যক্তিগত মোবাইলের বিকাশ নম্বর (০১৭১২-----৮৫) এ পেমেন্ট সফল হওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। যা যথাক্রমে ১০-১২-২০২৫ ইং তারিখে নভেম্বর'২৫ এর, ১৬-০২-২০২৬ ইং তারিখে জানুয়ারি '২৬ এর, ১৫-০৩-২০২৬ ইং তারিখে ফেব্রুয়ারি'২৬ এর, ১৩-০৪-২০২৬ইং তারিখে ডিসেম্বর'২৫ এর, ১৯-০৪-২০২৬ইং তারিখে মার্চ'২৬ এর, ২০-০৪-২০২৬ ইং তারিখে এপ্রিল'২৬ এর, ১০-০৬-২০২৬ইং তারিখে মে'২৬ এর এবং ১৬-০৮-২০২৬ইং তারিখে জুন'২৬ এর টাকা নান্নু মেম্বারের ব্যক্তিগত বিকাশ নম্বরটিতে ঢুকেছে এবং প্রেমেন্ট সফল হয়েছে।

এছাড়া, আসল ভাতাভোগী রূপা আক্তারের দেওয়া নিজস্ব ব্যাংক এশিয়ার এজেন্ট ব্যাংকিং নম্বর (১০৮৩৪-----৭৩০৫)-এ ঢুকেছে যথাক্রমে- ১৫-০৮-২০২৬ইং তারিখে জুলাই'২৬ এর, ১৬-০৮-২০২৬ইং তারিখে আগস্ট'২৬ এর এবং ১১-০৯-২০২৬ ইং তারিখে সেপ্টেম্বর'২৬ এর টাকার প্রেমেন্ট সফল হয়েছে।

কৃষ্ণনগর ইউনিয়ন পরিষদে রুপা আক্তার আবেদনটি করার পর এটি ডাটাএন্টির দায়িত্বে ছিলেন ইউনিয়ন পরিষদের তথ্য সেন্টারের বা ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার (UDC) - এর উদ্যোক্তা (Entrepreneur) ফারুক। অনেকের ধারণা প্রভাবশালী নান্নু মেম্বারের নির্দেশে উদ্যোক্তা ফারুক রুপা আক্তারের পদত্ত একাউন্টের স্থলে নান্নু মেম্বারের ব্যবহৃত ব্যক্তিগত বিকাশ একাউন্ট নম্বর বসিয়ে দিয়েছেন। এ বিষয়ে উদ্যোক্তা ফারুকের কোনো বক্তব্য না পেলেও মুখ খুলেছেন নান্নু মেম্বার।

নান্নু মেম্বার উত্তরাধিকার ৭১ নিউজকে জানান, ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার (UDC) - এর উদ্যোক্তা (Entrepreneur) ফারুক এর ভুলের কারণেই এমনটি হয়েছে। আমি দুইমাস পরেই তা জানতে পেরে তা ঠিক করে দিয়েছি। যদিও সরকারি পেমেন্ট স্লিপে দুই মাস নয় বরং আট কিস্তি নান্নু মেম্বারের ব্যক্তিগত বিকাশ একাউন্টে ডোকার স্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে।

এদিকে, ফরিদপুর মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মাশউদা হোসেন তার বক্তব্য উত্তরাধিকার ৭১ নিউজের কাছে দাবি করে বলেছেন, আমাদের এ প্রজেক্টে কয়েকটি ভুল হলেও তা এক/দুই মাসের মধ্যেই সংশোধন হয়েছে। এটি আমরা ওডিট করে সব ঠিকঠাক করেছি। বেশিরভাগ ভাতাভোগীর টাকা অন্য একাউন্টে গেলে বাউন্স ব্যাক করেছে। তাঁর কথা যদি সঠিক হয়, তবে- নান্নু মেম্বারের বিকাশ একাউন্টে তার আট কিস্তি কেমনে 'পেমেন্ট সফল' হলো সে প্রশ্নের কোনো জবাব দিতে পারেন নাই মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের জেলা প্রধান (উপ-পরিচালক) মাশউদা হোসেন।

উল্লেখ করা যেতে পারে, 'কোনো ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) সদস্য (মেম্বার) যদি কোনো গর্ভবতী মহিলার মাতৃত্বকালীন বা প্রেগন্যান্ট ভাতা (মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচি) আত্মসাৎ করেন বা দুর্নীতি করেন, তবে বাংলাদেশ আইন অনুযায়ী তিনি পদ হারানোসহ ফৌজদারি অপরাধের মুখোমুখি হবেন। সরকারি অর্থ আত্মসাৎ এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের জন্য তাঁর বিরুদ্ধে স্থানীয় সরকার আইন এবং দণ্ডবিধি অনুযায়ী কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে।

আইন অনুযায়ী এই অপরাধের প্রধান শাস্তির নিয়ম ও পদক্ষেপগুলোর মধ্যে -
সাময়িক বরখাস্ত এবং চূড়ান্ত অপসারণ (পদচ্যুতি) সহ স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন, ২০০৯ এর ৩৪ ধারা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়ে থাকে।

এছাড়া, ভাতার অর্থ আত্মসাৎ বা অসদাচরণের অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ওই মেম্বারকে সাময়িক বরখাস্ত করতে পারে। পরবর্তী শুনানির পর অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনা করে তাঁকে মেম্বার পদ থেকে চূড়ান্তভাবে অপসারণ (পদচ্যুত) করার কথাও উল্লেখ রয়েছে। এছাড়া, ফৌজদারি মামলা ও কারাদণ্ড সরকারি অর্থ বা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ভাতা আত্মসাৎ করা একটি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ। বাংলাদেশের দণ্ডবিধি (Penal Code, 1860)-এর ৪০৬ (অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ) এবং ৪২০ (প্রতারণা) ধারা অথবা দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের আওতায় মামলা দায়ের করা যাবে। এ অপরাধ প্রমাণিত হলে মেম্বারের বিভিন্ন মেয়াদে জেল (কারাদণ্ড) এবং অর্থদণ্ড (জরিমানা) হতে পারে। এছাড়া আত্মসাৎকৃত টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দিতে হবে।

নির্বাচনে অংশ নেওয়ার যোগ্যতা হারানো আইনি প্রক্রিয়ায় বলা হয়েছে ওই মেম্বার যদি কোনো ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে ন্যূনতম ২ বছর বা তার বেশি মেয়াদের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন, তবে তিনি স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন, ২০০৯-এর ২৬ ধারা অনুযায়ী পরবর্তী ৫ বছরের জন্য যেকোনো নির্বাচনে অংশগ্রহণের যোগ্যতা হারাবেন।

ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে যদি কোনো মেম্বার সত্যিই কোনো গর্ভবতী মহিলার ভাতা আটকে রাখেন বা অসদুপায়ে তুলে নেন, তবে ভুক্তভোগী পরিবার বসে না থেকে সরাসরি লিখিত অভিযোগ করতে পারেন- সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী অফিসার (UNO)-এর কাছে বা উপজেলা বা জেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা কিংবা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা-এর কার্যালয়ে অথবা, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অথবা জেলা প্রশাসক (DC)-এর বরাবর।

রুপা আক্তারের গর্ভবতী ভাতার বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন কৃষ্ণনগর ইউনিয়ন বিএনপি'র একাধিক শীর্ষ ও মধ্যম শ্রেনীর বর্তমান ও সাবেক নেতৃবৃন্দসহ ওই ইউনিয়নের একাধিক ইউপি সদস্য। এছাড়া, নান্নু মেম্বার ভুক্তভোগী পরিবারের সাথে সমাধানের চেষ্টা করলেও এ নিয়ে অধিকতর তদন্ত দাবি জানিয়েছেন তারা।

(আরআর/এএস/অক্টোবর ১২, ২০২৬)