পিএম সৈকত, কুড়িগ্রাম : কুড়িগ্রামে মাদকাশক্ত ছেলের ছুরিকাঘাতে প্রাণ গেল এক মায়ের। আজ বুধবার ভোরের দিকে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার বেলগাছা ইউনিয়নের পলাশবাড়ি এলাকায় এই মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে। ঘটনার পর পালিয়ে যায় ঘাতক পুত্র। পরে দুপুর ১২টার দিকে সদর উপজেলার হলোখানা ইউনিয়নের হরিকেশ বাউদিয়াছড়া থেকে ঘাতক পূত্রকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এ ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

পুলিশ ও প্রতিবেশীরা জানান, ওই এলাকার সরদার আলীর দুই পূত্র সন্তানের মধ্যে মুক্তাকিন আলম শোভন (৩৪) ছোট সন্তান। দীর্ঘদিন ধরে সে মাদকে আসক্ত ও মানসিক রোগী। চিকিৎসার জন্য তাকে সিরাজগঞ্জ মাদকাশক্তি পরামর্শ ও পূণর্বাসন রিহ্যাব সেন্টারে ভর্তি করা হয়। গত আড়াই মাস পূর্বে তাকে বাড়িতে আনা হয়। কিছুদিন ভালো থাকার পর আবারও অস্বাভাবিক ও হিংস্র আচরণ শুরু করে। এজন্য আবারও সিরাজগঞ্জ রিহ্যাব সেন্টারে যোগাযোগ করা হলে তারা ঘটনার দিন ভোররাত ৪টার দিকে বাসার সামনে আসে। বাড়িতে রিহ্যাবের লোকজনের উপস্থিতি টের পেয়ে উত্তেজিত হয়ে পরে শোভন। মা পারুল বেগম ছেলেকে শান্ত করতে গেলে সে চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করে। এরপর হঠাৎ করেই সঙ্গে রাখা ছুঁড়ি নিয়ে মায়ের বুকের উপর উপর্যুপরি আঘাত করে।

এসময় বাবা সরদার আলী স্ত্রীকে বাঁচাতে ছেলেকে লাঠি দিয়ে আঘাত করেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে বাবাকেও ছুঁরিকাঘাত করে সে। ঘটনার পর পরই পালিয়ে যায় শোভন। পরে রিহ্যাবের লোকজন ও প্রতিবেশীরা গুরুতর আহত পারুল বেগম ও সরদার আলীকে অটোতে করে কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক পারুল বেগমকে মৃত ঘোষণা করেন। গুরুতর আহত সরদার আলীকে প্রাথমিক চিকিৎসার পর অবস্থার অবনতি হলে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করা হয়। এ ঘটনার পর কুড়িগ্রাম সদর থানার অফিসার ইনচার্জ মো. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে একদল পুলিশ বিভিন্নজনের তথ্যের ভিত্তিতে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করে মাধ্যমে দুপুর ১২টার দিকে সদর উপজেলার হলোখানা ইউনিয়নের হরিকেশ বাউদিয়াছড়া থেকে ঘাতক পূত্র শোভনকে গ্রেফতার করে থানা হেফাজতে নিয়ে আসে।

প্রতিবেশী রুহুল আমিন, মমিনুল ইসলাম মঞ্জু ও আনোয়ার হোসেন জানান, শোভন মাদকাশক্ত ও মানসিক রোগী ছিল। সিরাজগঞ্জ মাদকাশক্তি পরামর্শ ও পূণর্বাসন কেন্দ্রে রাখার পর কিছুটা সুস্থ্য হলেও পুরোপুরি সুস্থ্য হয়নি। সন্তানকে দেখার জন্য রিহ্যাব থেকে তাকে বাসায় আনা হয়েছিল। সেই প্রিয় সন্তানের হাতে প্রাণ দিতে হল মাকে। ঘটনাটি খুবই মন্তান্তিক।

ওই এলাকার সাবেক মেম্বার আব্দুল মোত্তালিব জানান, শোভনের হিংস্র আচরণের কারণে তার বড় ভাই বাড়ি ছেড়ে আলাদাভাবে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকে। এলাকার লোকজনও আতংকিত ছিল। ছেলে মায়ের সাথে এমন আচরণ করবে ভাবাই যায় না।

সিরাজগঞ্জ মাদকাশক্তি পরামর্শ ও পূণর্বাসন রিহ্যাব সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক শাহ সুলতান আহমেদ জানান, আমাদেরকে অনুরোধ করার পর সিরাজগঞ্জ থেকে আমরা ভোর ৪টার দিকে সরদার আলী ভাইয়ের কুড়িগ্রামের বাসায় প্রবেশ করি। সে সময় বন্ধ রুমের ভিতর গান শুনছিল শোভন। আমাদের ৪জনের দল ফজরের নামাজের পর ড্রইং রুমে বসি। আমাদের উপস্থিতি টের পেয়ে ৬টার দিকে দরজা খুলে বাইরে বাথরুম ব্যবহার করে বাড়ি থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করে সে। ওর মা পারুল বেগম ছুটে গিয়ে ছেলেকে আটকানোর চেষ্টা করে। আমরা ড্রইং রুম থেকে বারান্দায় আসি। এসময় শোভন দ্রুত একটি টিপতালা দিয়ে বারান্দার দরজা লক করে দেয়। পরে ওর মায়ের সাথে কথা কাটাকাটির এক পর‌্যায়ে পকেট থেকে বড় একটি ছুরি বের করে মায়ের বুকের উপর উপর্যুপরি আঘাত করে। ঘটনা দেখে শোভনের বাবা লাঠি দিয়ে তার মাথায় আঘাত করতে থাকেন, এতে ক্ষিপ্ত হয়ে বাবাকেও ছুরিকাঘাত করে সে। আমরা দরজা লক থাকার কারণে কিছু করতে পারিনি।

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে কুড়িগ্রাম সদর থানার অফিসার ইনচার্জ কামাল হোসেন জানান, ছুরিকাঘাতের পর ঘাতক ছেলে পালিয়ে যায়। পরে বিভিন্নজনের তথ্যের ভিত্তিতে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করে তাকে সদর উপজেলার হলোখানা ইউনিয়নের হরিকেশ বাউদিয়াছড়া এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়। নিহত মায়ের লাশ উদ্ধার করে কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে।

(পিএস/এসপি/অক্টোবর ১৪, ২০২৬)